অর্ধভাগীর ভাগাভাগি (রম্য); মূল: শায়ের খান
অর্ধভাগীর ভাগাভাগি (রম্য)
শায়ের খান
প্যাথলজি ল্যাবরেটরি লাটে ওঠায় লাট বাহাদুর ফুয়াদ ভাইও লাটে উঠি উঠি করছেন। ফুয়াদ ভাইয়ের কথা বলছি। আমার কাজিন। ঐ যে ইন্দিরা রোডে থাকে। থাকে একাই। একটা বাসা ভাড়া করে থাকে আর ব্যবসা করে। প্যাথলজি ল্যাবরেটরি ছিল তার। কিন্তু ক্রমাগত যখন তার ভুল ডায়াগনোসিসে রোগীরা পর্যুদস্ত, তখন ঘটনা ঘটল অন্যরকম। চতুর্থবার যখন ফুয়াদ ভাই ডায়রিয়ার রোগীকে জন্ডিসের রোগী বলে রায় দিলেন আর তৃতীয়বারের মত লিভার সেরোসিসের রক্তে টাইফয়েডের জার্ম খুঁজে পেলেন, ক্ষেপে গেল পুলিশ। ষষ্ঠবার পর্যন্ত সহ্য করেছিল তারা, কিন্তু সপ্তমবারে সপ্তমে চড়ে গেল ওদের মেজাজ। এসে লটকে দিয়ে গেল তারা ইয়া বড় এক তালা ল্যাবরেটরির দরজায়। ফুয়াদ ভাইয়ের ইনকাম বন্ধ হয়ে গেল পুরোপুরি। আর ইনকাম বন্ধ হওয়ায় তার কাম ইন শুরু হল আমাদের বাসায়। ইনকাম থাকলে বড় একটা আসেন না উনি এদিকটায়। ফুয়াদ ভাইয়ের ইনকাম বন্ধ হলেই এবাসায় তার কাম ইন এর শুরু। ওনার ঘন ঘন আসা-যাওয়ায় ব্যাপারটা স্পষ্ট হতে শুরু করে আমাদের কাছে। একদিন লাঞ্চের সময় ঘটাঙ করে কাকা সেই নিদারুণ প্রশ্নবাণটি হেনে বসেন ফুয়াদ ভাইয়ের প্রতি।
‘কিরে, ব্যবসা লাটে উঠল কেন হঠাৎ?’
বডি শেক করে থেমে স্বাভাবিক হয়ে যান ফুয়াদ ভাই।
‘না মানে ভুল রিপোর্টে পুলিশ কেস খেয়ে গেছি।’
‘কেন? যন্ত্রপাতি নষ্ট নাকি তোর প্যাথলজির? ভুল রিপোর্ট আসবে কেন?
‘কিসের যন্ত্রপাতি? কাকীমা খেঁকিয়ে ওঠেন এবার। ‘যন্ত্রপাতি কি কিনেছে নাকি ও কখনো? শো পিস হিসেবে কলেজের বায়োলজি ল্যাবরেটরির রিজেক্টেড মাইক্রোস্কোপটা নামে মাত্র কিনে এনে বসিয়ে রেখেছে। আসলে অন্য বড় ডায়াগনোসিস সেন্টারের দালালী করে ও।’
‘হোয়াট?’ চমকে ওঠেন কাকা একথায়।
কাকীমা চালিয়ে যান, ‘কতবার বলেছি যে এ হচ্ছে গিয়ে মানুষের জান নিয়ে ব্যবসা। হেলাফেলা করিস না কিন্তু। এখন হল তো? বুঝলে তো ঠেলা শেষমেশ?
‘আমি বুঝি না,’ বলেন কাকা। হাউ ডু ইউ ডেয়ার টু প্লে সাচ গেমস উইথ পিপল। ইউ পিপল শুড বি পানিশড ওয়েল।’
কিছু বলেন না ফুয়াদ ভাই। শুধু মাথা নিচু করে একমনে ভাত মেখে খেতে থাকেন। তৃতীয়বার পরীক্ষায় ফেল মারার পর মানুষের এহেন অনুভূতিহীন আচরণের উদ্ভব ঘটে।
লাঞ্চের পর আমার ঘরে আধশোয়া অবস্থায় একমনে সিগ্রেটের ধোঁয়ার রিঙ বানাতে থাকেন উনি একের পর এক। তার মনের জরুরী অবস্থা বুঝে নিতে আমার কষ্ট হয় না। যখন দেখি মৃদু শব্দে উনি তার উৎপাদিত রিঙ-এর সংখ্যা গণনা করে চলেছেন। হতাশার সাগরে নিমজ্জিত হলেই উনি এহেন ধোঁয়াটে গণনা শুরু করেন। এ তত্ত্ব জানা আমার।
চৌত্রিশতম রিঙ-এ গিয়ে আচমকা ফুয়াদ ভাইয়ের মুখের কোণে এক অদ্ভুত সুখকর কুটিল হাসি ফুটে ওঠে।
তার হাসিতে নড়েচড়ে বসি। কুটিল হোক আর জটিল হোক-হাসিতো। জরুরী অবস্থায় এই মুহূর্তে তার হাসিটাই জরুরী।
‘কিছু সমাধান পেলে কি?’ শবাসন থেকে পদ্মাসনে বসি। কিছু বলেন না ফুয়াদ ভাই। শুধু মিটি মিটি হেসে সিডি প্লেয়ারের রিমোটটাতে চাপ দেন। পল ইয়ং-এর ‘লাভ অব দ্য কমন পিপল’ গানটি বাজতে থাকে।
ধীরে ধীরে শুরু করেন ফুয়াদ ভাই. ‘বুঝলি। আইডিয়া এসেছে একটা মাথায়।’
‘কেমন তরো?’
‘প্যাথলজি আর করব না ভাবছি।’
‘প্যাথলজি করবেনাতো, করবেটা কি?’
ঈঅজ করব।’
ঈ-অ-জ?’ বুঝতে পারি না ওনার ঈঅজ -সাজিটা।
‘বুঝলি না? ওই যে, পুরনো ভাঙা গাড়ি কমদামে কিনে এনে, ধোলাইখাল থেকে পার্টস বদলে ডেন্ট-পেইন্ট করে,’ বলেই থেমে যান উনি। বুঝতে কষ্ট হয় না আমার।
‘সে না হয় বুঝলাম,’ বলি আমি। ‘এ ব্যবসা তো তুমি একসময় করতে। গাড়ির ব্যবসা। কিন্তু এক্ষেত্রে তো টাকা লাগবে মেলা।’
‘ওখানেই তো খেল,’ বলে চোখে মুখে খেল খেলান উনি।
‘শোন পাগলা, প্রথমে করব কি, পেপারে বিজ্ঞাপন দেব-ফিন্যান্সার চাই। ফিফটি ফিফটি লাভের অফার দেব প্রথমে। পার্টির ফিন্যান্স, আমার টেকনিক। ব্যস। আর তার পর পরই একসময় সুযোগ বুঝে-’ বলেই বাঁ চোখটাকে একটু ছোট করেন আর ডান হাতটা কচু কাটা করার ভঙ্গিমা করে বলেন-‘কাট?’
‘মানে?’ লাফ দিয়ে উঠি আমি। ‘কাট কেন? কাটানোর প্রশ্ন আসছে কেন এখানে? পার্টনারশিপে ব্যবসা করবে, সে তো ভাল কথা। এখানে আবার-।’
‘আরে রাখ তোর নীতিকথা,’ বলে পাঞ্জা ছড়িয়ে দেন উনি আমার দিকে। ‘এদেশে যারা বড়লোক হয়েছে, তারা একজন আরেকজনকে কেটে কেটেই বড়লোক হয়েছে। তা আমার ক্ষেত্রে কেন তার অন্যথা হবে? আমি কেন কাটতে যাব না?’ বলেই উঠে পড়েন উনি। আর অতঃপর কাগজ কলম নিয়ে বসে পড়েন। বুঝতে পারি, বিজ্ঞাপনের ড্রাফটটা তৈরি করছেন।
রাগ হয়ে যায় ওনার ওপর বেশ। প্রত্যেকটা কাজে তার এহেন বদচিন্তা। ব্যবসা মানেই উনি বোঝেন লোক ঠকানো। আরে বাবা কত করে বোঝালাম যে ব্যবসা সৎভাবে করেও লাভ করা যায়, তাতে কিসের কি? লাভ হল না কোন-ই তাতে। লাভের লোভে উনি সবসময়ই লোভী।
‘শোন,’ বিজ্ঞাপন লিখতে লিখতে বলেন উনি, ‘আদম ধরার ব্যাপারে তোর আমাকে হেল্প করতে হবে কিন্তু।’
‘আদম?’
‘হ্যাঁ। ফিন্যান্সার। ওদের আমি আদম নামেই ডাকি।’
‘তা শুধু আদম কেন?’ দম নিয়ে বলি আমি। ‘হাওয়াও তো হতে পারে। মেয়ে ফিন্যান্সারও তো আসতে পারে।’
‘সবাই-ই আদম। আরে বোকা, আদম বলতে কি আমি ম্যাসকুলিন জেন্ডার বুঝিয়েছি? আদম বলতে বুঝিয়েছি-বোকা ফিন্যান্সার। যারা বোকা, তারাই আদম। দেখিসনা যারা আদম ব্যবসায়রী খপ্পরে পড়ে, তারা সবাই ই বোকা?’
ছিহ্ ছিহ্। মাথা হেঁট হয়ে আসে আমার। একজন লোক, যার কিনা টাকা আছে, অথচ ব্যবসায়িক জ্ঞান নেই, সে একজন জ্ঞানসম্পন্ন লোকের কাছে এলো শেয়ারে টাকা খাটাতে- সে কিনা বোকা হয়ে গেল?
‘কি ভাবছিস?’ গম্ভীর আদেশমূলক গলা ফুয়াদ ভাইয়ের।
‘হেলপ করতে রাজী আছিস আমায়?’
‘হু আছি।,’ বলে রাগটাকে সংবরণ করি।
আমার এই কাজিনগুলোর অনেক অন্যায় কাজে সায় দিতে যদিও আমার নীতিতে বাধে, তারপরও কেন জানি তাদের এই অত্যন্ত আকর্ষণীয় কু-প্রবৃত্তির মায়াজালে জড়িয়ে যাই আমি। এদের এই আকর্ষণ ক্রমশঃ কর্ষণ করে গুঁড়ো করে ফেলে আমার সুপ্রবৃত্তিকে, আর অতঃপর তার উপর বিছিয়ে দেয় কু-প্রবৃত্তির মায়াজাল। সে জাল ছেঁড়ে সাধ্য কার?
২.
শুক্রবারের দৈনিকগুলোতে যখন নিচের বিজ্ঞাপনটি প্রকাশ হল, তখন আমার আনন্দ আর ধরে না।
ফিন্যান্সার চাই
অন্তত: পাঁচ লক্ষ টাকা খাটাতে সক্ষম ফিন্যান্সার চাই। ব্যবসায়িক শর্তাবলী আলোচনা সাপেক্ষ।
যোগাযোগ: ০১৯১৩৮৪২৩২।
ই-মেইল: নযধষড়থভঁধফ@ুধযড়ড়.পড়স
সকাল থেকে আমি আর ফুয়াদ ভাই বসে থাকি ফোন নিয়ে ফুয়াদ ভাইয়ের ফ্ল্যাটে।
‘শোন,’ তর্জনী তোলেন উনি। ‘কথাবার্তায় যদি চালাক চতুর মনে হয়, তবে নিষেধ করে দিবি আদমকে। বলবি আমাদের ফিন্যান্সার পেয়ে গেছি আমরা। আর যদি বুঝিস যে লাট্টু মার্কা গোবর গণেশ, তবে সম্মান দেখাবি ভীষণ। এক্ষুণি যোগাযোগ করতে বলবি আমাদের সাথে। ফোন রাখার সময় সালাম দিবি। খবরদার কার্টিসির যেন একটুও এদিক-ওদিক না হয়।’ বলে বেরিয়ে যান শপিংমলের উদ্দেশ্যে। আর আমি বসে থাকি ফোনের আশায় একটা রিডার ডাইজেস্ট নিয়ে। ঠিক দশ মিনিট পর প্রথম রিংটা বেজে ওঠে। চমকে উঠে রিসিভ করি।
‘হ্যালো,’ বলি আমি।
‘হ্যাল লো-,’ খঙড আবেদনময়ী এক সুললিত মেয়ে কণ্ঠ ওদিকে। ‘এটা কি ০১৯১৩৮৪২৩২?’
‘হ্যাঁ হ্যাঁ,’ খুশিতে ডগমগ আমি।
‘ফুয়াদ আছে?’
‘না, উনি একটু বাইরে গেছেন।’
‘আমি হচ্ছি গিয়ে-,’
‘বলা লাগবে না, বুঝেছি বুঝেছি। আজ সকালের ব্যাপারটাইতো?’
‘হ্যাঁ, ঠিক তাই,’ একটু লজ্জা পায় যেন মেয়েটি।
‘আপনি কে বলছেন প্লিজ-।’
‘ইয়ে আমি ওনার কাজিন। আপনি আমার সাথে আলাপ করতে পারেন। আমাকে সবকিছু বলে গেছেন উনি। আসলে এককথায় ফুয়াদ ভাইয়ের ব্যাপারটা হচ্ছে, পুরো টাকা-টা আপনাকে দিতে হবে-।’
‘মানে?’ চমকে ওঠে যেন সুইট ভয়েসটি।
‘হ্যাঁ ঠিক তাই। পুরোটা আপনাকে ফিন্যান্স করতে হবে। এক পয়সাও দিতে পারবেন না উনি। শেয়ার করার ক্ষমতা হারিয়েছেন। আপনি যদি পুরোটা দিতে পারেন তবে ব্যবসা হতে পারে, নয়তো নয়।’
‘ব্যবসা?’ আঁতকে ওঠে মিষ্টি মেয়ে।
‘হ্যাঁ ব্যবসা-ই তো। লাভের ব্যবসা। লাভের ফিফটি ফিফটি পার্টনার। ব্যবসা ছাড়া কি লাভ হয়, অথবা লাভ ছাড়া ব্যবসা?’
‘কি?’ কাঁদো কাঁদো ঠেকে যেন মেয়ের গলাটা।
সুইট থেকে সুইট এ্যান্ড সাওয়ারে টার্ন করে ভয়েস।
খঙঠঊ-কে ও ব্যবসার চোখে দেখে?’
‘বাহ, লাভ ছাড়া কি ব্যবসা হয় নাকি? খঙঠঊ আপনি ঠিকই পাবেন, তবে খর্চা পুরোটা আপনারই দিতে হবে।’
‘একথা বলেছে ও?’ ভেজা গলায় শুধোয় মেয়ে। সুইট অ্যান্ড সাওয়ার ভয়েস গ্রেভি হয়ে ওঠে যেন। বলে, ‘আর কি কেউ ফোন করেছে আজ?’
‘করেনি এখনো, তবে করবে অনেকেই। আজ তো ফোন আসারই দিন। নিদেনপক্ষে বিশ পঁচিশটা ফোন তো আসবেই। যদিও সবার সাথে লাভ নিয়েই কথা হবে, তবে সবার সাথে ওনার একই শর্ত। খর্চাটা ওই পক্ষের। খঙঠঊ ফিফটি-ফিফটি।’
‘ঠিক আছে,’ কাঁদো কাঁদো গলায় বলে মেয়ে। ‘ওই ঈঐঊঅঞ -টা এলে বলে দেবেন আমাকে যাতে আর ফোন না করে। বলবেন মোনালিসা ফোন করেছিল। বলে দেবেন-‘হ্যাপি বার্থ ডে টু হিম,’ বলেই কাঁদতে কাঁদতে কুটুশ করে ফোন রেখে দেয়।
হ্যাপি বার্থ ডে টু হিম? হতভম্বের মত বসে থাকি আমি। জন্মদিন কি আজ ফুয়াদ ভাইয়ের? সব্বোনাশ! শপিং সেরে ফিরে এসে সব শোনেন ফুয়াদ ভাই। আর তার পরপরই মাথায় হাত দিয়ে বসে পড়েন। প্রায় কাঁদো কাঁদো গলায় চেচিয়ে ওঠেন, ‘করেছিস কি হারামজাদা। সর্বনাশ করে দিয়েছিস আমার। আমি ভুলেই গিয়েছিলাম যে আজ আমার বার্থ ডে। ওকে নিয়ে আজ আমার ঞঙচকঅচও রেস্টেুরেন্টে ইঠঋঋঊঞ খাওয়ার কথা ছিল। তারপর হাইওয়ে রাইড। তা তুই কি বলেছিস?’
‘ইয়ে, আমি বলেছি যে, খর্চা-টা ওর দিতে হবে পুরোপুরি। তোমার পকেট ফাঁকা। একটা পয়সাও খর্চা করতে পারবে না তুমি। তবে লাভ-এর ব্যাপারে ঠকাবে না-এটাও বলেছি।’
‘আর আর কি বলেছিস?’ কেঁদেই ফেলেন উনি।
‘আর বলেছি যে, বিশ পঁচিশটা ফোন আসবে আজ। সবাই লাভ-এর ব্যাপারেই কথা বলবে। তবে যে পুরো খর্চা টা দিতে পারবে, তার সাথেই লাভ-এর ব্যবসা করবে তুমি।’
‘ওহ নো।’ উঠে দাঁড়িয়ে পড়েন উনি। আর অতঃপর স্বগতোক্তির মত বলেন, ‘আবার এটা বুঝিয়ে শুনিয়ে ঠাণ্ডা করতে দুইদিন চওততঅ ঐটঞ, একদিন এিউ আর তিনদিন কঋঈ অেউ-িএর মামলা।’
উঠে দাঁড়াই আমি এবার। ধীরে ধীরে গিয়ে হাত রাখি বিধ্বস্ত ফুয়াদ ভাইয়ের পিঠে। বলি, ‘কই, আজ যে তোমার বার্থ ডে ছিল সে কথা তো বলনি? ম্যানি ম্যানি হ্যাপি রিটার্নস অব দ্য ডে-!’
‘ম্যানি ম্যানি রিটার্নস-?’ চমকে ওঠেন ফুয়াদ ভাই। থমকে থেমে চোখের পাতা ফেলি কয়েকটি। কি বলা যেতে পারে এর উত্তরে-ভাবতে থাকি অনবরত।
৩.
পরদিন দুপুরে হাজির হই ফুয়াদ ভাইয়ের ফ্ল্যাটে। ঢুকেই চমকানোর পালা আমার। দেখি বিছানায় পদ্মাসনে বসে আছে এক মধ্যবয়সী ভদ্রলোক। আর তার সামনে চেয়ার পেতে বসে বসে হাত কচলাচ্ছেন ফুয়াদ ভাই। লোকটির আয়েশি উদ্ধত ভঙিমা গুরুজনদের কথা মনে করিয়ে দেয়। ভাবখানা এমন- এ বিছানা এ ঘর, এসবই আমার। ফুয়াদ তো কেবল উসিলা মাত্র। তৈলাজ চুলের ব্যাক ব্রাশ আর সস্তা প্রসাধনীর লাবন্য ফিসফিসিয়ে বলে দেয়- গ্রাম থেকে এসেছেন উনি। মুখমন্ডলের প্রশ্নবোধক সুইচটা অন করি। বুঝতে পারেন ফুয়াদ ভাই। বলেন, ‘পরিচয় করিয়ে দেই, ইনি হচ্ছেন আমার গেস্ট আর ও হচ্ছে আমার কাজিন।’
‘কি নাম?’ মসৃণ কৃষ্ণকায় গালে হাত ঘষে বালিশে হেলান দেন অতিথি।
‘জ্বী ইয়ে, কল্লোল।’ বিনয়ে আইসক্রীমের মত গলে পড়ি আমি।
‘ও একজন লেখক,’ যোগ করেন ফুয়াদ ভাই। ‘বেশ জনপ্রিয়।’
‘জ-ন-প্রি-য়? নাম তো শুনিনি কোনদিন।’ মুখ বেঁকান ভদ্রলোক।
‘ইয়ে মানে, নাম শোনা যায় না খুব একটা, তবে জনপ্রিয় বটে। মানে, জনে জনে ওর প্রিয়তা। অর্থাৎ কিনা জনগণের কাছে ও প্রিয় নয় হয়ত, তবে জনগণ ওর কাছে বেশ প্রিয়। জনগণকে ভালবাসে ও। সেজন্যই ওদের জন্য কষ্ট করে লেখে। জনগণের আপত্তিকে অগ্রাহ্য করে ওদের জন্যই কষ্ট করে লিখে চলেছে ও। ওয়ান সাইডেড লাভ। হৃদয়ে রয়েছে ওর জনের জন্য প্রচণ্ড ‘জন’প্রিয়তা। লেখকের ‘নাম’সহ প্রশংসার নামতা পড়েন ফুয়াদ ভাই। আর অতঃপর চোখের ইশারায় বাইরে ডেকে নিয়ে আসেন আমায়। ফিসফিসিয়ে বলেন, ‘আদম! খবরদার। খুব সাবধান। সৌজন্যের একটুও এদিক-ওদিক হয় না যেন। আর ভাবটা দেখাবি যেন আমরা অভাবী না। মানে ভাব থাকবে ওর সাথে পুরোপুরি-ই, তবে সেটা কেবলই সদ্ভাব। অভাবীর সাথে কে আর ব্যবসায়িক ভাব করতে চায় বল? তার ওপর ও এসেছে গ্রাম থেকে। সাহস যোগাতে হবে না ওকে? একবার গ্যাঁড়াকলে ঢুকে নিক না বাপধন। তখন আমাদের অভাব নয়, ভাব-ই ওকে ভাবিয়ে তুলবে বেশ,’ কথা শেষ হলে আবার রুমে ঢুকি দুজনে।
‘ইয়ে,’ কোমরে নাইনটি ডিগ্রী কোণ এঁকে বোকাটার সামনে ঝোঁকেন ফুয়াদ ভাই, বলছিলাম যে চা-টা খেয়ে চলুন একটু বাইরে থেকে ঘুরে আসি। ঢাকা শহরটা পুরোপুরি দেখা হয়নি বোধহয় আপনার।’
‘তা হয়নি হয়ত,’ একটু লজ্জা পান যেন শ্রদ্ধেয় হাদারাম। ঢাকার কথায় লজ্জাটা একটু ঢাকা দিতে চেষ্টা করেন যেন। বলেন, ‘ ঢাকা এসেছিলাম লাস্ট এইটি নাইনে।’ খুশি হয়ে ওঠেন ফুয়াদ ভাই একথায়। ভাবখানা এমন যে এ লোকটিকেই খুঁজছিলেন উনি এতদিন।
বিকেলে চা খেয়ে বেরুই আমরা। হেঁটে হেঁটে ঢাকার বিভিন্ন বিষয়ের সাথে পরিচিত করাতে থাকেন ফুয়াদ ভাই তার নতুন ব্যবসায়িক পার্টনারকে। আর মুখ হা করে সবকিছু গিলতে থাকেন ভদ্রলোক। আর একসময় হঠাৎ যেন বেশ বিষণœ হয়ে পড়েন। তার এই বিষণœতার কারণ ঠিক বুঝে উঠতে পারি না আমরা। এতে অস্থির হয়ে উঠি আমরা দুজনেই। ওনাকে বিষণœ হতে দেখলেই একধরনের অস্থিরতা পেয়ে বসে আমাদের।
‘ইনভেস্টমেন্টের আগে কোনভাবেই বিষণœ হতে দেয়া যাবে না ওকে।’ ফিসফিসিয়ে বলেন ফুয়াদ ভাই। ‘উৎফুল্ল রাখতে হবে। ইনভেস্টমেন্টের পর ও জাহান্নামে যাক, তাতে কিছু আসবে- যাবে না আমাদের। বরঞ্চ ওখানে গেলেই সুবিধা হবে আমাদের এখন,’ বলেই ঘোরেন উনি কেলাসটার দিকে। ‘কোন অসুবিধা হচ্ছে কি আপনার? পায়ে ব্যথা করছে? ক্যাচ নেব?’
‘তৃষ্ণা পেয়েছে কি?’ যোগ করি আমি, ‘একটা কোলা খান?’
‘কিংবা মিলক শেক?’ ঝঘঅকণ ভাবে বলেন ফুয়াদ ভাই।
‘না না’ গম্ভীর বিষণœ কণ্ঠ ওনার। ‘আমি সে ধরনের কিছু ভাবছি না। আমি ভাবছি আমাদের ব্যবসার শর্ত নিয়ে। মানে বলছিলাম যে, কোন মাজারে গিয়ে যদি প্রতিজ্ঞা করে আসতাম আমরা, আমাদের ফিফটি ফিফটি পার্টনারশিপের ব্যাপারটা।’
‘আরে মাজার কেন আবার এর মধ্যে? শুকনো হাসি হাসেন ফুয়াদ ভাই। মাজারের কথায় মুখ শুকিয়ে আসে যেন ওনার। ‘এ ব্যাপারে তো দলিল-ই থাকবে আমাদের।’
‘তবুও’ যুক্তি দাঁড় করাতে চান ভদ্রলোক। ‘ব্যবসা হচ্ছে সততার ব্যাপার। এখানে একটা প্রতিজ্ঞা টতিজ্ঞা জাতীয় কিছা থাকা উচিত। বিশেষ করে কোন মাজারকে সাক্ষী রেখে।’
ভীত সন্ত্রস্ত হয়ে পড়েন ফুয়াদ ভাই এ কথায়।
আধ্যাত্মিক রি-অ্যাকশনে আবার ওনার ভয় বেশ।
নিচুমুখে চিন্তা করেন কিছুক্ষণ। আর অতঃপর বলেন, ‘ঠিক আছে, তাই-ই সই। আমরা তিন নেতার মাজারে গিয়ে প্রতিজ্ঞা করে আসি চলুন।’ পীরের মাজার এড়িয়ে যান ফুয়াদ ভাই। আধ্যাত্মিক মাজার এড়িয়ে ব্যাপারটিকে রাজনৈতিক মাজারের দিকে ঠেলে দেন। এতে রিস্ক কম হবে বোধহয় ওনার। তার মানে দুরভিসন্ধিটা রয়েই গেছে ওনার মধ্যে।
তিনজনে এগোই তিন নেতার মাজারের দিকে। মাজারে গিয়ে প্রতিজ্ঞা সারেন দু’পার্টনার। তিন নেতার প্রতি শ্রদ্ধা জানিয়ে দু’জনে উচ্চে:স্বরে একথা ঘোষণা দেন যে-তারা তাদের লাভের আধাআধি শেয়ার করবে সবসময়। আমি জীবিত সাক্ষী হয়ে একটু দূরে দাঁড়িয়ে নিরবে শ্রবণ করি ওনাদের প্রমিজিং চিৎকার। আর অতঃপর বেরিয়ে আসি তিনজন মাজার থেকে। তারপর তিনজনে মিলে অভিসার হলের ম্যাটিনি শোটা ধরি। অতঃপর রাতের খাবারটা সারি ঈৃৃুঋৗও-এর বুফে দিয়ে। ভদ্রলোক ফুয়াদ ভাইয়ের রুমেই উঠেছেন। তাই রাতে বিদায় নিয়ে চলে আসি আমি বাসায়।
৪.
পরদিন ভোর সাতটায় ফুয়াদ ভাইয়ের টেলিফোনে ঘুম ভাঙে আমার। টেলিফোনে উদভ্রান্তের মত চিৎকার করছেন উনি। ‘শিগগির আয় কল্লোল, শিগগির চলে আয়। সর্বনাশ হয়ে গেছে আমার রে। সব নিয়ে গেছে বদমাশটা, সব নিয়ে চলে গেছে।’
‘অ্যাঁ?’ আঁতকে উঠি আমি। ‘বলো কি? সব চুরি করে নিয়ে পালিয়ে গেছে? ঐ কেলাসটা?’
‘সব নেয়নি। জিনিসপত্র কিছুই নেয়নি, কাঁদতে কাঁদতে বলেন উনি। ‘গতকাল আমি আমার ব্যাঙ্ক ঝেড়ে ঝুড়ে চল্লিশ হাজার টাকা তুলেছিলাম। এ টাকাটা তুলেছিলাম এ জন্যই যে, ও দেখুক- আমি অভাবী পার্টনার না। ত্রিশ-চল্লিশ হাজার টাকা আমার পকেটেই থাকে সবসময়। রাতে কেবিনেটে টাকাগুলো রেখে ঘুমিয়েছি। সকালে উঠে দেখি বদমাশটা নেই। ভাবলাম বাথরুমে গেছে হয়ত। কিন্তু বাথরুমের দরজা হা করা। কেমন যেন সন্দেহ হল। উঠে কেবিনেটে উঁকি দিয়ে দেখি একটি টাকাও নেই। বাইরের দরজাটাও হা করা। আমার এখন কি হবে রে-; বলে হাঁক ছেড়ে কান্না জুড়ে দেন উনি।
‘সব্বোনাশ!’ বলি আমি। ‘ওয়েট, আসছি আমি।’
‘আয়, কিন্তু মামা-মামীকে জানানোর দরকার নেই এখন। মোনালিসাও যাতে না জানে দেখিস। তটস্থ শোনায় ওনার কণ্ঠস্বরটা।
‘ঠিক আছে, ঠিক আছে,’ সান্ত¡না দেই ওনাকে। আর অতঃপর কোনভাবে হাতমুখ ধুয়ে রওনা দেই কপর্দকহীন ফুয়াদ ভাইয়ের বাসাভিমুখে।
৫.
সময় পেরিয়ে গেছে প্রায় মাসখানেক। হঠাৎ কুরিয়ার সার্ভিসের লোক একটা ছোট্ট প্যাকেট নিয়ে আসে ফুয়াদ ভাইয়ের নামে।
প্যাকেটের ভেতর পঁচিশ হাজার টাকার প্রাইজবন্ড আর ছোট্ট একটি চিঠি। আশ্চর্য হয়ে চিঠিটি পড়তে থাকি আমি। চিঠিটা এরকম।
ফুয়াদ ভাই,
সালাম নিবেন। মাজারের ফিফটি ফিফটি শর্তটা পূরণ করতেই পঁচিশ হাজার টাকার প্রাইজবন্ড পাঠালাম। কেননা, আমার লাভ হয়েছে পঞ্চাশ হাজার টাকা। আপনি আমাকে মাজারে নিয়ে গিয়ে বিপদেই ফেলেছেন। কেননা আপনি এমন এক মাজারে নিয়ে গেছেন আমাকে যেখানে আমার এক প্রিয় নেতাও শায়িত শেরেবাংলা এ কে ফজলুল হক। ওনাকে শ্রদ্ধা করেই শর্তটা পূরণ করলাম। ওনার জন্যই আমাকে ফেরত দিতে হল টাকাটা। উনি আমার প্রিয় নেতা এ জন্যই যে উনি যৌবনে ঘুসি মেরে নারিকেল ছিলতে পারতেন- আর নারিকেল হচ্ছে আমার প্রিয় ফ্রুট। দোয়া করবেন।
গুড বাই।
ইতি
আপনার একান্ত বিশ্বস্ত
কাজী দাউদ ইব্রাহীম
পালিকা বাজার, কোলকাতা।
ব্রাজিল যাত্রা, মূল: গোলাম মোস্তাকীম
ব্রাজিল যাত্রা
গোলাম মোস্তাকীম
http://www.DeshiBoi.com
প্রায় এক মাস আগে ব্রাজিল যাত্রার সুযোগটি আমাদের মন্ত্রণালয়ে এসেছিল। পাঠিয়েছিলেন ঈঋঈ (ঈড়সসড়হ ভঁহফ ভড়ৎ পড়সসড়ফরঃরবং)-এর ব্যবস্থাপনা পরিচালক অঁধন অষর গপযঁসড়. আমাদের মন্ত্রণালয়ের সিনিয়র সহকারী সচিব মোঃ দেলোয়ার হোসেন আমাকে বললেন, ‘আগে মন্ত্রণালয়ের অতিরিক্ত সচিব এই প্রোগ্রাম-এ গিয়েছিলেন। কাজেই আপনি ব্রাজিল যাবেন।’ আমি মনে মনে পুলকিত বোধ করলেও ঠিক উৎসাহিত বোধ করতে পারিনি। কারণ এ পর্যন্ত আমার বিদেশযাত্রা ভাগ্য তেমন ভাল নয়। তারপরেও আশা থেকে যায় মনের ভেতরে। সংশ্লিষ্ট নথির উপ-সচিব অমিতাভ চক্রবর্তী কানাডায় আছেন।

সিনিয়র সহকারি সচিব নথিতে সাধারণভাবে বিষয়টি উল্লেখ করে আমার কাছে পেশ করলেন। আমি স্বাক্ষর করে সচিব বরাবর পাঠিয়ে দিলাম। মনে আশা ছিল সচিব মহোদয় আমাকে মনোনয়ন দেবেন। পরদিন নথিটি আমার কাছে ফেরত আসল। আলোচনা প্রয়োজন। পরদিন নথিটি নিয়ে আমি সচিব মহোদয়ের কাছে গেলাম এবং বললাম আগে অতিরিক্ত সচিব এই প্রোগ্রামে গিয়েছেন। তার সঙ্গে আলাপ সেরে আমি সিনিয়র সহকারি সচিবকে ডাকলাম এবং সচিবের মনোনয়ন উল্লেখ করে সারসংক্ষেপ দিতে বললাম।

দুই-তিন দিন পর অমিতাভ চক্রবর্তী আমার কাছে এসে বললেন, ‘স্যার, সচিব স্যার ব্রাজিল যাচ্ছেন না। তিনি ব্রসেলস যাচ্ছেন। আপনি ব্রাজিল যাচ্ছেন। আপনি অমত করবেন না। আমি বললাম, গত চার বছরে আমি মাত্র একবার বিদেশ গিয়েছি। না করার প্রশ্নই আসে না।’
তারপর শুরু হলো আমার ব্রাজিল যাত্রার পালা। প্রথমে ভিসার জন্য আমার পাসপোর্ট দিল্লীতে পাঠালাম আমার বন্ধু ওয়াসী আহমেদের কাছে। আমার ভিসা দিল্লী থেকে নিতে হবে।
সোমবার আমি ফোন করে জানতে পারলাম যে, ওয়াসী আমার পাসপোর্ট পেয়ে গেছে এবং মঙ্গলবার সকাল ১১টায় ওয়াসী আমাকে ফোন করে জানিয়ে দিল যে, নতুন দিল্লীর ব্রাজিল দূতাবাস দু’ঘণ্টার মধ্যে আমার ভিসা দিয়ে দিয়েছে। বুধবার সকাল ১১টার মধ্যে আমি পাসপোর্ট পেয়ে গেলাম। বৃহস্পতিবার আমার থাই ভিসা হয়ে গেল। তারপর ঝামেলায় পড়লাম।
২৯ এপ্রিল আমি জর্মন দূতাবাসে ভিসার জন্য আমার পাসপোর্ট জমা দিলাম। ৩০ এপ্রিল সকালে আমি জর্মন দূতাবাসের ভিসা অফিসারের সঙ্গে তিন বার ফোনে কথা বললাম, ফ্যাক্স করে ৪টি কাগজ পাঠালাম। ফল শূন্য। আমাকে শুধু বিমানবন্দর ব্যবহার করার ভিসা দেয়া হয়েছে।
২ মে ছিল বৌদ্ধ পূর্ণিমা, সরকারি ছুটির দিন। ৩ মে আমি পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ে গেলাম শুধুমাত্র এই কথাটি বলার জন্য আমাকে শুধুমাত্র ধরৎঢ়ড়ৎঃ ঃৎধহংরঃ দেয়া হয়েছে। আমি একজন মহাপরিচালক (ইউরোপ)-এর কাছে গেলাম। তিনি একটি সভায় যাবেন বলে আমাকে সংশ্লিষ্ট পরিচালকের কাছে পাঠিয়ে দিলেন। আমি তাকে বললাম, ‘আগামীকাল আমি ব্রাজিল যাচ্ছি। আমার ভিসার ংঃধঃঁং পযধহমব হবে না আমি জানি, সময়ও নেই। তবে জর্মন দূতাবাসের জানা উচিত তারা আমার সঙ্গে অনুচিত আচরণ করেছেন।’
পরিচালক মহোদয় জর্মন দূতাবাসের মহিলা ভিসা অফিসারকে যা বললেন এবং যেভাবে বললেন তাতে আমি সন্তুষ্ট। আমার কাজ না হলেও আমার কাজ হয়েছে বলে আমার মনে হলো।
৪-০৫-২০০৭
আজ সকালেই আমার ঘুম ভেঙ্গে গেল। গত বছর ফেব্রুয়ারি মাসের ১২ তারিখ আমি ইরান গিয়েছিলাম। তারপর আজ ব্রাজিলের উদ্দেশ্যে রওয়ানা হচ্ছি। ভাল লাগছে এই ভেবে যে, ফিরে আসার পর আমার হাতে হয়তো প্রায় পঞ্চাশ হাজারের মত টাকা থাকবে। মোট ৪টি দেশ দেখা হবে। সংযুক্ত আরব আমীরশাহী, জর্মনী, ফ্রান্স হয়ে আমাকে ব্রাজিলিয়া, ব্রাজিল যেতে হবে। জর্মনী ও ফ্রান্সে আমি বিমানবন্দরের বাইরে যেতে পারব না। তারপরও আমার কাছে অনেক কিছু।
সকাল সাতটার মধ্যে আমাদের প্রটোাকল অফিসার এসে গেলেন। আমার ড্রাইভার জনাব মোঃ বেলায়েত এবং জীবনবীমা কর্পোরেশনের ড্রাইভার মোঃ খোরশেদ আলমকে দেখলাম। প্রটোকল অফিসার সকাল ৭:২০ মিনিটে আমার পাসপোর্ট ও টিকেট নিয়ে চলে গেলেন। আমি, কাঁকন, ধ্রুব আর অভ্র সকাল পৌনে আটটায় রওয়ানা দিলাম বিমানবন্দরের দিকে। সকাল সাড়ে আটটার মধ্যে ভিআইপি লাউঞ্জে পৌঁছে সকাল ৯:২৫ মিনিটে বিমানে উঠলাম।
৯:৫৫ মিনিটে বিমান চলতে শুরু করল। জানালার পাশে আমি সিট পেয়েছিলাম। তাই বিমান উঠা-নামার সময় নিচের অনেক দৃশ্য দেখতে পেলাম।
দুপুর সাড়ে বারটার সময় আমি আবুধাবী বিমান বন্দরে নামলাম। কিছুদূর হাঁটার পর দেখা গেল ইতিহাদ বিমান-এর এক মহিলা কর্মী আমার নামের একটি প্লাকার্ড ধরে দাঁড়িয়ে আছেন। সামনে গিয়ে নিজের পরিচয় দিলাম। এমন সময় এক বাঙালি ভদ্রলোক এসে তার পরিচয় দিলেন। তিনি আবুধাবীতে বাংলাদেশ দূতাবাসের প্রটোকল অফিসার। ভদ্রলোক আমাকে নিয়ে ঘন্টাখানেকের মধ্যে জবমবহপু হোটেলে পৌঁছলেন এবং আমার কাছ থেকে বিদায় নিয়ে চলে গেলেন। তার নাম দেওয়ান রানা। বাড়ি মৌলভীবাজার।
বিকেল তিনটায় দুবাই থেকে আমাদের কমার্শিয়াল কাউন্সেলর জনাব মাহমুদুর রহমান আমাকে ফোন করে জানালেন যে, তিনি শহীদ বখতিয়ার আলমকে নিয়ে বিকেল পাঁচটায় আমার হোটেলে আসবেন। আমার রুম নম্বর ১২১২।
পৌনে ছটার দিকে বখতিয়ার সাহেব ও মাহমুদ সাহেব আসলেন। আমরা দুবাই-এর দিকে যাত্রা শুরু করলাম। দূরত্ব ১৫০ কিলোমিটার। পথে ইবনে বতুতার সফর নিয়ে যে যাদুঘরের মত করা হয়েছে তা দেখলাম। যাদুঘরের চারদিকে অনেক দোকান। তারপর দেখলাম জুমাইয়া সমুদ্র সৈকত। বালুর ওপর চাদর বিছিয়ে অনেকে শুয়ে আছেন।
রাত এগারটার সময় মাহমুদ সাহেবের বাসায় পরিচয় হলো তার স্ত্রী এবং কন্যা অদ্রিকার সঙ্গে। তারপর খাওয়া-দাওয়া। বিরাট আয়োজন। আমি বখতিয়ারকে বলেছিলাম- হোটেলেই খাব। কাউকে কষ্ট দেয়ার পক্ষপাতী ছিলাম না। কিন্তু বখতিয়ার যেভাবে বলল তারপর আর না করতে পারলাম না। রান্না ছিল চমৎকার। কিন্তু ক্লান্তির কারণে খেতে পারলাম না।
বখতিয়ার এবং মাহমুদ দু’জনেই তাদের কিছু পেশাগত অসুবিধার কথা আমাকে বললেন। বখতিয়ার জানাল, আগামী ১ জুলাই থেকে বাংলাদেশের বৈদেশিক মিশনের কর্মকর্তারা ২০% বেশি বেতন পাবেন।
রাত দুটোর সময় হোটেলে ফিরে এলাম। আমাদের সঙ্গে আমজাদ বলে এক ভদ্রলোক এসেছিলেন।
৫-০৫-২০০৭
সকালেই ঘুম থেকে উঠে পড়ি। ইত্তেহাদের সৌজন্যে জবমবহপু হোটেলে থাকা-খাওয়া ফ্রি। সকাল নটার মধ্যে ১৫ তলা থেকে নাস্তা করে আসলাম। তারপর সোয়া দশটায় আমি নিচে নেমে এসে চাবি জমা দিয়ে আমার পাসপোর্ট নিলাম। সকাল এগারটার সময় গাড়িতে করে আবুধাবী বিমানবন্দরের দিকে যাত্রা শুরু হলো। সকাল থেকে কেউ আমার কাছে আসেননি বা কেউ আমাকে ফোনও করেননি। আমি আসতে নিষেধ করেছিলাম। কিন্তু কেউ কেন ফোন করলেন না তা বুঝতে পারলাম না।
দুপুর একটায় আমার প্লেন ছেড়ে দিল- এবারো ইতিহাদের বিমান। বিকেল পৌনে পাঁচটার সময় আমরা ফ্রাঙ্কফুর্ট বিমানবন্দরে নামলাম। একঘন্টা লাইনে দাঁড়িয়ে থাকার পর জানতে পারলাম যে, আমার এই চধংংঢ়ড়ৎঃ পড়হঃৎড়ষ -এ কিছু করার নেই। আমি নেমেছিলাম ২ নম্বর টার্মিনাল-এ। আমাকে ১ নম্বর টার্মিনালে যেতে হবে। প্রথমে কোন কিছু ঠিক পেলাম না। ঠঅজওএ অরৎষরহবং -এর খবর কেউ জানে না। তারপর একজন আমাকে পথ বাতলে দিলেন। আমি ঝযঁঃষব ঃৎধরহ ১ নম্বর টার্মিনালে গেলাম। সেখানে কয়েকজনকে জিজ্ঞাসা করে কোন সদুত্তর পেলাম না। তারপর একজন মহিলা জানিয়ে দিলেন আমাকে ৪৪নং গেটে যেতে হবে। তখন মাত্র ছটা বাজে। আমার প্লেন সাও পওলোর উদ্দেশে ছাড়বে রাত দশটায়। এখনও চার ঘন্টা আছে হাতে।
যখন বিমান ফ্রাঙ্কফুর্ট বিমানবন্দরে নামছিল আমি জানালা দিয়ে বাইরের দিকে তাকিয়েছিলাম। ঘর-বাড়ি দেখলাম। নদী দেখলাম এবং দেখলাম ঘন বন। মনে হলো গভীর বন কেটে এই বিমানবন্দর তৈরি করা হয়েছে।
আমার হাতে অনেক সময়। কিন্তু বাইরে যাওয়ার উপায় নেই। কাজেই আমি ভেতরে ঘুরাঘুরি শুরু করলাম। কত কথা
মনে হচ্ছিল। যতদূর মনে পড়ে জর্মনীর কথা প্রথম শুনি হ্যামিলনের বংশীবাদক নামক গল্পটি পড়ে। তারপর সৈয়দ মুজতবা আলীর বই পড়ে জর্মনী সম্পর্কে নিজের মনের ভেতর একটি গভীর আগ্রহের সৃষ্টি হলো। ১৯৬৭ সালে বৃত্তির টাকা দিয়ে আমি কিছু বই কিনেছিলাম। তার মধ্যে একটি বই ছিলঃ ঞযব জরহব ধহফ ঋধষষ ড়ভ ঃযব ঞযরৎফ জবরপয লেখক উইলিয়াম শাইয়ার। তারপর গ্যাটে এবং শিলারের কথা বলতে পারি।
চারঘন্টা কাটাতে বেশ কষ্ট হচ্ছিল। আমি দোতলায় ৪৪ নম্বর গেট বের করে ফেললাম। উঁঃু ঋৎবব ংযড়ঢ় গুলোতে হাঁটাহাঁটি শুরু করলাম। চকোলেট কিনব বলে ঠিক করলাম। কিন্তু এক বয়স্কা মহিলার আচরণে সেই আশা ত্যাগ করলাম। ভাবলাম ফেরার পথে প্যারিসের বিমানবন্দর থেকে এসব কিনব।
রাত আটটার পর আমি বোর্ডিং পাস নিলাম। রাত সোয়া ন’টায় বোর্ডিং পাস নিয়ে ৪৪নম্বর গেটের ভেতরে বসলাম। একে একে যাত্রীরা আসতে শুরু করলেন। ব্রাজিলীয়দের বেশ মজার এবং আমুদে লোক মনে হলো। বেশ ঠাট্টা-মস্করা-গল্প-গুজব চলল। রাত দশটায় আমাদের বিমান চলতে শুরু করল। যাত্রার সময় ১৩ ঘন্টা। রাতের খাবার খেয়ে ঘুমিয়ে পড়লাম।
৬-০৫-২০০৭
ভোর সাড়ে পাঁচটায় আমাদের বিমান সাও পওলো বিমানবন্দরে নামলো। তখন ভোরের আলো দেখা দেয়নি। চধংংঢ়ড়ৎঃ পড়হঃৎড়ষ -এর কাজ সেরে আমি হেঁটে এক নম্বর টার্মিনালে চলে আসলাম।
সকাল ন’টায় আমার যাবার বিমান ব্রাজিলিয়ার উদ্দেশ্যে যাত্রা শুরু করল। বিমান দু’জায়গায় অবতরণ করে দুপুর দু’টায় ব্রাজিলিয়ায় পৌঁছল। মাঝখানের শহর দু’টির নাম মনে পড়ছে না।
বিমানে এক যুবকের সঙ্গে পরিচয় হলো। সে মোটামুটি ইংরেজি বলতে পারে। কাজের জন্য কিছু দিন মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে ছিল। আমাদের দেশের খাবার পছন্দ।
ব্রাজিলিয়া বিমানবন্দর থেকে বাইরে এসে দেখলাম আমার জন্য দু’জন যুবক-যুবতী দাঁড়িয়ে আছে। দশ মিনিট অপেক্ষা করে তারা একটি মাইক্রোবাসে তুলে দিল। প্রায় আধঘন্টা পর আমরা পৌছালাম। হোটেলের আনুষ্ঠানিকতা সেরে রুমে চলে আসলাম। রুম নম্বর ২০১২। হাতমুখ ধুয়ে ঘুমিয়ে পড়লাম। সুন্দর শহর। তবে আমাদের হোটেল শহরের বাইরে। রাত ন’টায় আমি ঘুম থেকে জেগে উঠি।
০৭-০৫-২০০৭
সকালেই আমার ঘুম ভেঙ্গে গেল। সুন্দর সকাল। আনুষ্ঠানিক কাজ সেরে হোটেলের খাবার ঘরে যাই নাস্তার জন্য। নাস্তা সেরে পৌনে ন’টার মধ্যে কনফারেন্স হলে চলে আসি। দুনিয়ার প্রায় ১০০টি দেশ থেকে প্রতিনিধিরা এসেছে। তবে এর মধ্যে আফ্রিকার প্রতিনিধির সংখ্যা আমার কাছে বেশি মনে হল।
সকাল সাড়ে ন’টার দিকে সম্মেলন শুরু হলো। অনেক কথাবার্তা হলো। ঊসনহধঢ়ধ বলে একটি কৃষি গবেষণা প্রতিষ্ঠান নিয়ে বেশি কথাবার্তা হলো। ব্রাজিলীয় অর্থনীতিতে কৃষির অবদান ও প্রভাব নিয়ে অনেক বক্তৃতা হলো।
দুপুর পৌনে একটার পর আমাদেরকে ঊসনহধঢ়ধ -র প্রধান কার্যালয়ে নিয়ে যাওয়া হলো। বিস্তৃত প্রান্তর। সব দালানকোঠা একতলা। আমাদের জয়দেবপুরের কৃষি গবেষণা সংক্রান্ত বহুতল ভবনের কথা মনে হলো। পরে ভাবলাম ব্রাজিলে জমির অভাব নেই বলে একতলা ভবন করা হয়েছে।
বাংলাদেশের এক ভদ্রলোকের সঙ্গে পরিচয় হলো। নাম ড. শহীদুর রশীদ। বাড়ি চট্টগ্রাম। তিনি ওহঃবৎহধঃরড়হধষ ঋড়ড়ফ জবংবধৎপয ওহংঃরঃঁঃব -এ গবেষণা কর্মকর্তা হিসেবে কাজ করেন। তার বর্তমান কর্মস্থল ইথিওপিয়া।
আমরা সন্ধ্যা ছ’টার পর হোটেলে ফিরে এলাম। ঘএঙ ও ঈরারষ ংড়পরবঃু -এর কর্মকর্তাদের সঙ্গে এক মতবিনিময় সভা ছিল। কিন্তু ক্লান্তির কারণে যোগদান করা থেকে বিরত থাকলাম। পরে সন্ধ্যা সাড়ে সাতটায় সংবর্ধনায় যোগদান করলাম। রাতে হালকা কিছু খেয়ে ঘুমিয়ে পড়লাম।
০৮-০৫-২০০৭
আজ বাইরে কোন কর্মসূচি ছিল না। সারাদিন বক্তৃতা শুনতে হলো। দু’জন ভারতীয় ডায়াসে বসলেন। একজন কমল মালহোত্রা, পাঞ্জাবের অধিবাসী। অন্যজন লক্ষ্মীপুরী। তার বাড়ি ভারতের কোথায় তা আমার জানা হয়নি। বক্তারা একের পর এক বক্তৃতা দিয়ে চললেন। অধিকাংশ বক্তৃতা ইংরেজিতে হলো। ফরাসী বা পর্তুগীজে বক্তৃতা হলে তার ইংরেজি অনুবাদ শুনলাম। আজ প্রায় সন্ধ্যা ছটা পর্যন্ত সভা চলল। বেশ ক্লান্তই মনে হচ্ছিল নিজেকে। কিন্তু একটা ব্যাপার ভেবে ভাল লাগছিল যে, অতিরিক্ত সচিব হিসেবে আমার প্রথম বিদেশ যাত্রা একটি আন্তর্জাতিক সম্মেলনে হলো এবং ঘটনাস্থল ব্রাজিল। অনেক পথ পেরিয়ে আমাকে ব্রাজিলে আসতে হয়েছে। আমি সব সময়ই ভেবেছি যে, সরকারি কাজে আমি প্রায় ৫০/৬০টি দেশে যাব। মনে হচ্ছে আমি ঠিকই ভাবতাম। বিদেশে আসলে প্রথম সুবিধা হলো নতুন দেশ দেখা যায়। অনেক কিছু শেখা যায়। অনেক নতুন মানুষের সঙ্গে পরিচয় হয়। অভাবনীয় প্রাকৃতিক দৃশ্য দেখা যায়। আর নিজেকে আন্তর্জাতিক প্রেক্ষিতে রেখে তুলনা করা যায়।
আজ সন্ধ্যা সাতটায় সংবর্ধনা ছিল। ঢালাও মদ্যপানের ব্যবস্থা ছিল। কাঁকন, ধ্রুব আর অভ্রর কথা ভেবে আমি শুধুমাত্র নির্মল পানীয় খেলাম। মাঝে মাঝে কিছু খাবারের ব্যবস্থা ছিল। তবে তা প্রয়োজনের তুলনায় খুবই অপ্রতুল। আমার বা পাশে জিম্বাবুয়ের এক মহিলা বসেছেন এবং ডানপাশে নেপালের এক ভদ্রলোক। তিনি যুগ্মসচিব। টঘউচ র সঙ্গেও তার যোগাযোগ আছে। বা পাশের মহিলা সমানে ঘাড় গুঁজে নোট নিয়ে যাচ্ছেন। আমার বিশ্ববিদ্যালয় জীবনের কথা খুব মনে পড়ছে। তখনও দেখতাম অনেকে ঘাড় গুঁজে নোট করে যাচ্ছে।
দু’জন থাই ভদ্রলোক সমানে মদ্যপান করে যাচ্ছেন। এক ভদ্রলোক আমাকে ফৎরহশং ড়ভভবৎ করলেন। আমি সবিনয়ে প্রত্যাখ্যান করলাম। রাত ন’টার পর আমি আমার রুমে চলে আসলাম।
গত ৪ তারিখে বিমানে উঠার পর থেকেই কাঁকন, ধ্রুব আর অভ্রর কথা খুব মনে হচ্ছিল। যখনই ভাল কিছু খাই তখনই তাদের কথা মনে পড়ে। ভাল দৃশ্য মনে হলেই তাদের কথা মনে হয়। তাছাড়া এখন পর্যন্ত আমি ঢাকার সঙ্গে কোন যোগাযোগ করতে পারিনি। একদিন চলে গেলেই মনে হয় আমি তো এখন দেশে ফেরার দিকে এগিয়ে যাচ্ছি। আমি জানি না।
৯-০৫-২০০৭
আজ দুপুরে ঢাকায় ই-মেইল করলাম। এক থাই ভদ্রলোকের ই-মেইল ব্যবহার করে আমি ঢাকায় ই-মেইল করলাম। মনে একটু শান্তি পাচ্ছি। দেখি মুন্না কত তাড়াতাড়ি আমার ই-মেইলের উত্তর দেয়।
টাকা-পয়সা সব পেয়ে গেলাম। ফিলিপিনো মহিলাটি যে এত অদক্ষ তা আমি ভাবতে পারিনি। আমার মনে হয় সে ইংরেজি কিছুই বুঝে না। তাকে আমি বেশ ভাল করে বুঝিয়েছিলাম যে, টিকিট বাবদ আমার পাওনা ৪,৯৩০ ডলার।
সে আমার জন্য মাত্র ৪,৫৭৫ ডলারের চেক তৈরি করে রেখেছে। সঙ্গের ভদ্রলোককে আমি বুঝাতে সক্ষম হলাম যে, আমার আরো পাঁচশত ডলারের মত পাওনা আছে। তারা আমাকে বাকি টাকা দিয়ে দিল। চেকের বাইরে সব অর্থ দেয়া হলো ব্রাজিলিয়ান রিয়ালে। এসব আবার আমাকে ডলারে পরিণত করতে হবে।
আজ সারাদিন বক্তৃতা শুনে কাটাতে হলো। মনে হলো সেই বিশ্ববিদ্যালয় জীবনে ফিরে গেছি। অনেক কথাই আমার মনে হচ্ছে। তবে বিশেষ করে কাঁকন, ধ্রুব আর অভ্রর কথা মনে হচ্ছে। সব সময় বাড়ির কথা, ঢাকার কথা মনে হয়। মনে হয় আমি বুড়ো হয়ে গেছি।
আমাদের সকল প্রতিনিধিদের তিন ভাগ করে দেয়া হলো। প্রথম দল ঝঁঢ়ঢ়ষু ংরফব সম্পর্কে সুপারিশ করবে। দ্বিতীয় দল সুপারিশ করবে ঠধষঁব পযধরহ সম্পর্কে। আমি তৃতীয় দলে ছিলাম। আমাদের কাজে ছিল অর্থায়ন সম্পর্কে মন্তব্য করা। আমি আমার মন্তব্যে আমাদের দেশের কৃষকরা কেন ন্যায্য মূল্য পায় না তা বললাম। আমি বললাম মধ্যস্বত্বভোগীদের হটিয়ে দিতে হবে। কারণ পণ্যের লাভের অধিকাংশ তারাই খেয়ে ফেলে।
আজ বিকেল সাড়ে চারটার মধ্যে আমাদের কাজ শেষ হয়ে গেল। আমি হোটেলে চলে আসি। শুয়ে-বসে সন্ধ্যা পার করে দেই। এখানে টিভি দেখা ছাড়া অন্যকোন কাজ নেই। শহর থেকে ২০ কিলোমিটার দূরে এই হোটেল। হোটেলের পাশে কৃত্রিম লেক। তবে দেখতে লাগে ছোটখাটো নদীর মত। আমার হোটেলের বারান্দা থেকে ব্রাজিলের প্রেসিডেন্ট সিলভা ডি লুসার সরকারি বাসভবন দেখা যায়। এ সংবাদ প্রথমদিনই হোটেলের এক পোর্টার আমাকে দিয়েছিল। আমি কোন উৎসাহবোধ করিনি।
১০-০৫-২০০৭
আজ আমাদের সম্মেলন আনুষ্ঠানিকভাবে শেষ হলো। আগামীকাল ভোর সাড়ে পাঁচটায় আমরা তিনশো মাইল দূরে একটি কারখানা দেখতে যাব যেখানে আগ থেকে চিনি আর ইথানল তৈরি করা হয়। ফিরতে রাত এগারটা হয়ে যাবে।
আজ সকাল সাড়ে ন’টায় সম্মেলন শুরু হলো। ডায়াসে ৭/৮ জন বসলো। ভারতের দু’জন আছেন এবং বাংলাদেশের কেউ নেই। বিষয়টি ভেবে আমার বেশ খারাপই লাগছিল। ভারতীয় দু’জনের একজন ভদ্রলোক, অন্যজন ভদ্রমহিলা। আমার দু’জনকেই গবফরড়পধৎব মনে হলো। গতকাল অপরাহ্ণে আমরা যে আলাপ-আলোচনা এবং সুপারিশ করেছিলাম তার উপর ভিত্তি করেই আলোচনা চূড়ান্ত করা হলো। এর মধ্যে দু’-একজন নতুন কিছু বললেন। কেউ কেউ বললেন যা আলোচনা এবং সুপারিশ হয়েছিল তা প্রতিবেদনে প্রতিফলিত হয়নি। সম্মেলনের চেয়ার অঁধন অষর গপযঁসড় সবকিছু প্রতিবেদনে প্রতিফলিত করার প্রতিশ্রুতি দিলেন। তিনি যে বক্তব্য রাখলেন তা আমার মনপুত হলো। তাকে আমার সহনশীল এবং প্রাজ্ঞ মনে হলো। যখন আমার বলার পালা এলো, আমি বললাম, আমরা যারা উন্নয়নশীল দেশে বসবাস করি তাদের দুর্ভাগ্য হলোঃ আমরা যা উৎপাদন করি তার তেমন কোন মূল্য নেই আন্তর্জাতিক বাজারে। দেশের ভেতরে অনেক সমস্যা রয়েছে। যারা উৎপাদন করে অর্থাৎ কৃষকদের কোন সামাজিক মর্যাদা নেই। আমরা যে জাতি হিসেবে কত অকৃতজ্ঞ তা প্রকাশ করি একটি গালির মাধ্যমেঃ ‘চাষার বাচ্চা’। যারা আমাদের জন্য লজ্জা নিবারণের কাপড় তৈরি করে তাদেরও আমরা গালি দেই ‘জোলার বাচ্চা’ বলে। আন্তর্জাতিক ক্ষেত্রে আমাদের পণ্য বিপণনের জন্য আমরা যে সব বাঁধার সম্মুখীন হই তার বিস্তারিত আলোচনা অনেকেই করেছেন। কাজেই দেশের ভেতরে এবং বাইরে আমাদের প্রয়োজনীয় ও প্রায়োগিক সংস্কার করতে হবে। আমার বক্তব্য শেষে প্রচুর হাততালি পেলাম। আমার ভাল লাগল।
১১-০৫-২০০৭
ভোর চারটায় হোটেলের পোর্টার আমাকে ঘুম থেকে জাগালেন। আমরা ভোর পাঁচটায় রওয়ানা দেব সেই দূরের শহরের কারখানা দেখতে যেখানে আখ থেকে চিনি আর ইথানল তৈরি করা হয়। আমাদের বাস ঠিক সময়ে চলতে শুরু করল। ২০ মিনিটেই আমরা শহরের বাইরে চলে গেলাম। রাস্তার দু’পাশে দিগন্ত বিস্তৃত প্রাকৃতিক দৃশ্যাবলী দেখতে দেখতে গেলাম। আমার পাশে বসেছিলেন এক ব্রাজিলীয় ভদ্রলোক। তিনি ঊসনহধঢ়ধ য় কাজ করেন। অনেক চটপটে এবং খোলা মনের মানুষ। তার সঙ্গে ব্রাজিলের বিভিন্ন বিষয় এবং আন্তর্জাতিক অনেক ব্যাপার নিয়ে আলাপ-আলোচনা হলো। তিনি তার জীবনের নানা অভিজ্ঞতার কথা আমাকে বললেন। তার জীবনের শুরুতে তিনি কিভাবে গবেষণার কাজে উৎসাহিত হলেন, কিভাবে তিনি গবেষণায় সফলতা লাভ করলেন সবকিছুই আমাকে বিস্তারিত বললেন। এক সময় তিনি আমার অনুমতি নিয়ে অন্য এক যাত্রীর কাছে চলে গেলেন। আমি জানালা দিয়ে বাইরের দৃশ্যের প্রতি মনোযোগ দিলাম। আমাদের বাস মাইলের পর মাইল চলে যাচ্ছে। কিন্তু কোন ঘর-বাড়ি দেখা যাচ্ছে না। মাঝে মাঝে ৪০/৫০ পর দু’টো একটা খামার বাড়ি দেখা যায়। বিশাল বিশাল গোচারণ ভূমিতে গবাদিপশু চড়ে বেড়াচ্ছে। কিন্তু কোন লোকজন নেই। আমার মনে হলো কেউ হয়তো সকালের দিকে ওইসব গবাদিপশু রেখে গিয়েছে এবং সন্ধ্যার আগে হয়তোবা গোশালায় নিয়ে যাবে।
মাঝে মাঝে আমাদের বাস গভীর বনের ভেতর দিয়ে যাচ্ছে। রাস্তার দু’পাশে গভীর বন। নাম নাজানা কত রকমের গাছ যে দেখছি তার কোন ইয়ত্তা নেই। বন এত গভীর যে, সেখানে সূর্যের আলো প্রবেশ করতে পারে না। দু’টো একটা গাড়ি মাঝে মাঝে আমাদের পাশ দিয়ে উল্টোদিকে চলে যাচ্ছে। অনেকক্ষণ পর দেখলাম একটি উপশহর। সেখানে দেখলাম ছোট ছোট দোকান-পাট। সবচেয়ে অবাক হলাম কোন শিশুকে দেখা যায় না। তাহলে এই বিশাল দেশে কি অদূর ভবিষ্যতে বিদেশ থেকে কর্মঠ কর্মীবাহিনী আনতে হবে। স্বাভাবিকভাবেই আমার নিজের দেশের কথা মনে হলো। আমরা যদি আমাদের দেশের দক্ষ শ্রমিকদের পর্তুগীজ ভাষা শিখিয়ে এদেশে পাঠাতে পারি তাহলে সেটা একটা কাজের কাজ হবে। আমি যখনই বিদেশে গিয়েছি তখনই সেখানে আমাদের দেশের দক্ষ-অদক্ষ শ্রমিক পাঠানোর বিষয়টি ভেবেছি।
আমাদের বাস সামনে এগিয়ে চলেছে। দু’পাশে নয়নাভিরাম দৃশ্য। এসব দেখছি আর দেশের কথা ভাবছি। সৈয়দ মুজতবা আলীর কথা আমার খুব মনে হচ্ছে। সৈয়দ মুজতবা আলী সম্পর্কে একবার এক বিদেশী বলেছিলেন, এই ভদ্রলোক দেশ-বিদেশ ঘুরে বেড়ান সব সময় নিজের দেশকে হৃদয়ে রেখে। পুরীর সমুদ্র সৈকত দেখার সঙ্গে সঙ্গেই আমাদের দেশের কক্সবাজারের কথা মনে হয় এবং এই ভেবে আনন্দিত এবং পুলকিত হই যে, আমাদের কক্সবাজার সমুদ্র সৈকত সত্যিই তুলনাহীন। সকাল ১১টার দিকে আমরা আমাদের গন্তব্যস্থলে পৌঁছলাম। সেখানে সকলকে উষ্ণ সংবর্ধনা দেয়া হলো। আমরা সবাই একটা করে কোম্পানীর মনোগ্রাম অংকিত ক্যাপ পেলাম। আমরা সবাই আনন্দিত ও সম্মানিত বোধ করলাম। তারপর শুরু হলো বক্তৃতার পালা এবং সঙ্গে সঙ্গে আমাদের হালকা পানীয় দিয়ে আপ্যায়ন করা হলো। কয়েকজন বক্তা ব্রাজিলের বর্তমান এবং আগের অর্থনৈতিক অবস্থা তুলনা করে বক্তব্য পেশ করলেন। আখ থেকে কিভাবে চিনি এবং ইথানল তৈরি করা হয় তা আমাদের সামনে বিশদভাবে বর্ণনা করা হলো। ব্রাজিল যে একটা বিশ্ব অর্থনৈতিক শক্তিতে পরিণত হচ্ছে তার উপর বিশেষ জোর দেয়া হলো। তারপর আমাদের কারখানা দেখানো হলো। আমরা বিশেষ পোশাক পরলাম। সবকিছু ঘুরে ঘুরে দেখলাম। কোম্পানি হতে গাইডের ব্যবস্থা করা হয়েছিল। আমরা সবকিছুই উপভোগ করলাম। সর্বশেষ দেখলাম নিয়ন্ত্রণ কক্ষ। কম্পিউটারের মাধ্যমে সবকিছু নিয়ন্ত্রণ করা হচ্ছে।
দুপুরে আমাদের জন্য খাবারের আয়োজন ছিল। একটা বিষয় আমার মনোযোগ আকর্ষন করল। কারখানার ভিতর কর্মকর্তা-কর্মচারীদের আবাসনের ব্যবস্থা করা হয়েছে। কর্মকর্তা-কর্মচারীদের জন্য বিনোদন এবং তাঁদের সন্তানদের শিক্ষা, চিকিৎসা ও বিনোদনের বিশেষ ব্যবস্থা করা হয়েছে। কারণ লোকালয় থেকে বেশ দূরে এই কারখানা অবস্থিত।
বিকেল তিনটার সময় আমাদের বিদায়ের সময় এসে গেল। আমরা সবাই আমাদের বাসে করে আখ খেতে চলে গেলাম। সেখানে ট্রাক্টরের মাধ্যমে কিভাবে আখ কাটা হচ্ছে এবং তা কারখানায় পাঠানোর জন্য কি কি করা হচ্ছে তা আমরা দেখলাম। সবই যন্ত্রের মাধ্যমে করা হচ্ছে। খেতের কাজ দেখে আমরা ব্রাজিলিয়ার দিকে যাত্রা শুরু করলাম।
এবার আমার পাশে বসেছিলেন এক ব্রাজিলীয় যুবক। তাঁর বয়স ৩২। তিনি কাছেই উপশহরে যাচ্ছেন। সেখানে তিনি পরিবারের সংগে বসবাস করেন। কথায় কথায় তিনি জানালেন যে, তাঁর এক বান্ধবী ছিল। পাঁচ বছর তাঁরা বেশ ঘনিষ্ঠ ছিলেন। কিন্তু সম্প্রতি তাঁদের মধ্যে আর কোন সম্পর্ক নেই। সময় কাটে না বলে ভদ্রলোক সন্ধ্যায় এমবিএ পড়া শুরু করেছেন।
রাত এগারটায় আমাদের বাস হোটেলে পৌঁছল। ব্রাজিলিয়াতে আমাদের শেষ রাত। আগামীকাল সাও পাওলো হয়ে আমি প্যারিস চলে যাব। সেখান থেকে আবু ধাবী হয়ে বাংলাদেশ।
আজ বিকেলেই আমি ব্রাজিলিয়া ছেড়ে চলে যাবো। আমাকে ব্রাজিলিয়া বিমান বন্দর থেকে বিকেল পাঁচটার বিমান ধরতে হবে। সকালে আমি নাস্তা করতে খাবার ঘরে গেলাম। দেখলাম আমার পূর্ব পরিচিত রুশ ভদ্রলোককে। তিনি ১১টার বিমানে চলে যাবেন। তাঁর সঙ্গে একদিন আমি দীর্ঘ সময় নিয়ে রুশ সাহিত্য, বলশেভিক বিপ্লব এবং আরও অনেক বিষয় নিয়ে আলাপ করেছিলাম। রুশ লেখক পুশকিন, সেরমন্তফ, গোগল, টলস্টয়, ডষ্টয়েভস্কি, তুর্গেনভ, চেখভ, গোর্কি, আলেক্সেই টলস্টয়, মিখাইল শলোকভ এবং শের্গেই ইয়েসনিন নিয়ে আলাপ করেছিলাম। বাংলাদেশের একজন আমলার মুখে এইসব রুশ লেখকের নাম শুনে তিনি বোধহয় একটু অবাকই হয়েছিলেন। আমি তাঁকে বলেছিলাম যে, আমি কখনই রাশিয়ায় যাইনি। তবে ইয়ালটায় চেখভের বাড়ি এবং ইয়াসনায়া পলিয়ানায় টলস্টয়ের বাড়ি দেখার বাসনা আমার আছে। আমি তাঁকে বলেছিলাম, সমসাময়িক টলস্টয় এবং ডস্টয়েভস্কি একে অপরের সঙ্গে কখনই দেখা করেননি। তিনি আশা প্রকাশ করেছিলেন আমি হয়তোবা ভবিষ্যতে রাশিয়া ভ্রমণ করার সুযোগ পেতে পারি।
আমি হোটেলের বিল মিটিয়ে দিয়ে আমার রুমে চলে আসলাম। গোছগাছ করে আমি দুপুর একটায় হোটেলের বাসে ব্রাজিলিয়া বিমান বন্দরে চলে আসলাম। আমার কাছে শ’ পাঁচেক-এর মত ব্রাজিলিয় রিয়াল ছিল। তা আমি ডলারে ভাঙিয়ে নিলাম। তারপর আমি বিমান বন্দরে বিমানের জন্য লাউঞ্জে বসে অপেক্ষা করতে লাগলাম। আমার মত অনেকেই লাউঞ্জে বসে আছেন। কারও সঙ্গে আমার তেমন আলাপ হলো না। আমি চারদিক খেয়াল করছিলাম। আশেপাশে অনেক দোকানপাট দেখলাম। সবই মনোহারী দ্রব্যাদিতে পরিপূর্ণ। আমি একটি বইয়ের দোকানে দেখলাম এবং বইপত্র নাড়াচাড়া করলাম। অধিকাংশই পর্তুগীজ ভাষায় ছাপা। শুধুমাত্র লেখকের নাম বুঝতে পারলাম।
রাত ন’টার মধ্যে আমি সাও পাওলো বিমান বন্দরে পৌঁছে গেলাম। আমাকে ওখান থেকে প্যারিসের চার্লস দ্য গল বিমান বন্দরে যেতে হবে। বিমান ছাড়ার সময় রাত দশটা। হঠাৎ করে ঘোষণা দেয়া হলো যান্ত্রিক ত্রুটির কারণে বিমান ছাড়তে দেরি হবে। তবে তাঁরা কোন সময় উল্লেখ করলেন না। আমি প্রমাদ গুনলাম। কারণ আমার শেনজেন ভিসার মেয়াদ মাত্র একদিন আছে। অর্থাৎ আগামীকাল অর্থাৎ ১৩-০৫-২০০৭ তারিখের মধ্যে প্যারিস ছাড়তে হবে। আমি মনে মনে অস্বস্তিবোধ করছিলাম। আমার মতই অন্যান্য যাত্রীর মধ্যে উৎকক্তা ছড়িয়ে পড়ল। তবে দেখলাম কয়েকটি শিশু বেশ নির্বিকার। তারা দিব্যি হেসেখেলে ছুটোছুটি করে বেড়াচ্ছে।
রাত এগারটায় হঠাৎ করে ঘোষণা দেয়া হলো বিমান আজ রাতে প্যারিস যাচ্ছে না। আমাদের হোটেলে নিয়ে যাওয়া হবে। যাত্রীদের মধ্যে প্রথমে গুঞ্জন এবং পরে হৈ চৈ আর চিৎকার-চেঁচামেচি শুরু হলো। সবাই বিমান না ছাড়ার কারণ জানতে চান। বিমান বন্দর কর্তৃপক্ষ এবং বিমান কর্তৃপক্ষের কর্মকর্তাদের যাত্রীসাধারণ ঘিরে ধরলেন। অনেককেই মারমুখী মনে হলো। এখানে বেশিরভাগ লোকজনই পর্তুগীজ ভাষায় কথা বলেন এবং যাত্রীদের মধ্যে অধিকাংশই পর্তুগীজ বলতে পারেন না। সে এক এলাহি কাণ্ড।
রাত একটায় আমরা একটি পাঁচতারকায় পৌঁছলাম। হোটেলে রুম নেয়ার জন্য আমরা সবাই কাউন্টারের সামনে লাইন ধরে দাঁড়ালাম। আমার দেখে ভাল লাগল যে, এই মাঝরাতেও বেশ শৃঙ্খলার সাথে রুম বুকিংয়ের কাজ সারলেন। আমি আটতলায় রুম পেলাম। রাত আড়াইটায় আমরা রাতের খাবার খেলাম। হোটেল থেকে আমাদের জানানো হলো যে, আগামীকাল সকাল দশটায় প্যারিসে যাওয়ার জন্য বিমানের ব্যবস্থা করা হয়েছিল। পরে বুঝতে পারলাম এসবই ছিল মিথ্যা আশ্বাস। রাত তিনটার সময় আমি আমার রুমে পৌঁছে জানালার পর্দা সরিয়ে রাতের সাওপাত্তলোকে দেখার চেষ্টা করলাম। চতুর্দিক আলোয় আলোকময়। সব আকাশচুম্বী ভবন অথবা হোটেল। আমাদের হোটেলের সামনেই একটি জলাধার দেখলাম। উপর থেকে পানির রং কেমন যেন লাল মনে হলো।
রাত শেষ হলো আধো ঘুম আর আধো জাগরণে। সকাল সাড়ে আটটায় হোটেলের নিচতলায় খাবারের ঘরে গেলাম নাস্তা করতে। হরেক রকমের খাবার মজুদ আছে। কিন্তু আমার জন্য অধিকাংশ খাবারই উপযোগী নয়। খেতে খেতে গুনলাম আমার যাত্রার সময় পরিবর্তন হয়েছে এবং সময় দুপুর ১২টা। একজন যাত্রী মন্তব্য করলেন দুপুরের খাবার হতে বঞ্চিত করার জন্য এই সময় নির্ধারণ করা হয়েছে। আমি আমার ভিসার মেয়াদের কথাই ভাবছিলাম। আজ ১৩ মে রাত বারোটা পর্যন্ত আমার ভিসার মেয়াদ আছে। আমার কপালে যে কি লেখা আছে তা ভাবতে ভাবতে আমার রুমে আসলাম।
রুমে সাও পাওলোর উপর একটি সুন্দর বড় বাঁধাই করা বই দেখে তা দেখতে শুরু করলাম। বইটি পর্তুগীজ এবং ইংরেজি ভাষায় লেখা। সাও পাওলোর গত পাঁচশত বছরের ইতিহাস তুলে ধরা হয়েছে। বইতে অনেক ছবি আছে। আমি তাই মনোযোগ দিয়ে দেখতে শুরু করলাম। আর দেশের কথা ভাবছিলাম। কাঁকন, ধ্রুব আর অভ্রর কথা ভাবছিলাম। ছবিগুলোর মধ্যে দেখলাম সাও- পওলোর মেয়রের ছবিই বেশি। তারপর দেখলাম যে সাও পাওলোর মেয়রের কার্যালয় থেকে বইটি ছাপানো হয়েছে। আমার চট করে ইংরেজি প্রবাদ বাক্যটির কথা মনে পড়ে গেলঃ ঐব যিড় ঢ়ধুং ঃযব ঢ়রঢ়বৎ পধষংং ঃযব ঃঁহব.
দুপুরের খাবার না খেয়ে আমরা আবার সাও পাওলোর বিমান বন্দরের দিকে যাত্রা শুরু করলাম। বিমান বন্দরে আমি এবার সত্যিকার ঝামেলায় পড়লাম। আগেই লিখেছি যে আমার ভিসার মেয়াদ ছিল ১৩ মে পর্যন্ত। বিমানে উঠার আগে আমার পাসপোর্ট পরীক্ষা করে কর্তব্যরত কর্মকর্তা আমাকে বললেন, মহোদয়, আপনার ভিসা আছে আজ পর্যন্ত। আপনি আগামীকাল শার্ল দ্য গ্যল বিমান বন্দরে পৌঁছেন। ততক্ষণে আপনার ভিসার মেয়াদ শেষ হয়ে যাবে। আপনি কি করে যাবেন? আমি অত্যন্ত দৃঢ়তার সঙ্গে বললাম, ‘আমি তার জন্য মোটেই দায়ী নই। এরজন্য দায়ী আপনাদের ব্রাজিলীয় বিমান সংস্থা এবং আমাদের দেশের জর্মন দূতাবাস। আমাকে অবশ্যই যেতে দিতে হবে। তারপরেও আমাকে এক ঘন্টা বসিয়ে রাখা হলো। কর্মকর্তা প্যারিস বিমান বন্দর কর্তৃপক্ষের সঙ্গে টেলিফোনে কথা বলে আমাকে বিমানে উঠার অনুমতি দিলেন। আমি হাঁফ ছেড়ে বাঁচলাম।
আমাদের বিমান সন্ধ্যা ছ’টায় ছেড়ে দিল। ১১ ঘন্টার বিমান যাত্রা। আমি পরদিন অর্থাৎ ১৪ মে স্থানীয় সময় সকাল আটটায় প্যারিসের শার্ল দ্য প্যল বিমান বন্দরে অবতরণ করলাম। আমি এবার ইতিহাদ বিমান সংস্থার কর্মকর্তার সঙ্গে যোগাযোগ করে জানতে পারলাম নতুন সময়সূচি অনুযায়ী আমার বিমান ছাড়বে রাত দশটায়। তার মানে হলো আমাকে প্রায় ১৪ ঘন্টা বিমান বন্দরে বসে থাকতে হবে। বাইরে যাওয়ার কোন উপায় নেই।
বিমান বন্দরে এক মহিলা কর্মকর্তার সঙ্গে আমার পরিচয় হলো। তাঁর নাম সাব্রিনা। ফরাসী ভাষায় আমি তাঁর সঙ্গে আলাপ জুড়ে দিলাম। তিনি পাপুয়া নিউগিনি থেকে এসে ফ্রান্সে বসবাস শুরু করেছেন। তার স্বামীও এই বিমান বন্দরে কাজ করেন। তাদের দু’টি কন্যা রয়েছে। তারা ফরাসী স্কুলে পড়াশুনা করে। মহিলা আমাকে তার প্যারিস আগমনের সময় জীবনের বিস্তৃত কাহিনী বললেন। একজন নতুন আগন্তুক হিসেবে প্রাথমিকভাবে তিনি কী কী সমস্যার সম্মুখীন হয়েছিলেন তা আমাকে বললেন। সর্বত্রই নতুন অভিবাসীদের এই কাহিনী।
দুপুরে বিমান কর্তৃপক্ষ আমাকে ২০ ইউরোর একটি কুপন দিল। আমি তা দিয়ে দুপুরের খাবার সারলাম। শার্ল দ্য প্যল বিমান বন্দরটি ঘুরে ঘুরে দেখলাম। বিরাট বিমান বন্দর। সারা দুনিয়া থেকে যাত্রীরা এখানে আসছেন। জাপানী এবং চৈনিক পর্যটকের সংখ্যাই আমার কাছে বেশি মনে হলো।
প্যারিস থেকে আবুধাবীতে একরাত অবস্থান করে ঢাকায় পৌঁছলাম। কাঁকন, ধ্রুব এবং অভ্র ঢাকা বিমান বন্দরে আমার জন্য অপেক্ষা করছিল।তারিখটা ছিল ১৫ মে, ২০০৭ সাল।
মাশুরির অলৌকিক দ্বীপ- লাংকাউই, মূল: বরেন চক্রবর্তী
মাশুরির অলৌকিক দ্বীপ- লাংকাউই
বরেন চক্রবর্তী
http://www.DeshiBoi.com
মালয়েশিয়ান এয়ারলাইনের এমএইচ১৪৪৬ ফ্লাইটটি লাংকাউই মাটি ছুঁলো ঠিক বিকেল চারটায়। কুয়ালালামপুর থেকে এক ঘন্টার বিমান যাত্রায় পৌঁছে গেলাম লাংকাউই। প্লেন থেকে নেমেই গা ছম ছম করা অনুভূতি। অন্য বিমান বন্দরগুলো থেকে এই এয়ারপোর্ট যেন ঠিক একেবারেই আলাদা। এয়ারপোর্টের চারপাশে তাকিয়ে যে জৌলুস চোখে পড়ে তা নেই এখানে। অরণ্য, পর্বত আর সাগরের মাঝখানে অবলীলায় নেমে গেলাম আমরা প্রায় তিনশ’ ট্যুরিস্ট। আমি যদি দৃষ্টিপাতের লেখক যাযাবরের মতো বাংলা লিখতে পারতাম তবে লাংকাউই বিমান বন্দরটিকে উইলিংডন এয়ারপোর্টের সাথে তুলনা করতে পারতাম। কিন্তু আমার বাংলা লেখার গাঁথুনি অতো শক্ত নয়। তাই অমন করে বর্ণনা করা আমার পক্ষে কখনো সম্ভব নয়। যাযাবর (বিনয় মুখোপাধ্যায়) তার দৃষ্টিপাতে লিখেছেন উইলিংডন এয়ারপোর্টটি বৃহৎ নয়। কিন্তু গুরুত্বে প্রধান, সংবাদপত্রে এর বহুল উল্লেখ। একথাটা লাংকাউই এয়ারপোর্টের জন্যও সমানভাবে প্রযোজ্য। ছোট্ট একটা দ্বীপের সাদামাটা একটা এয়ারপোর্ট। কিন্তু লাংকাউইয়ের গুণগান সকলের মুখে মুখে। লাংকাউই শুধু এশিয়ার নয় পৃথিবীর একটি গুরুত্বপূর্ণ ট্যুরিস্ট স্পট। এখানে কোন ইমিগ্রেশন নেই কারণ আমরা একই দেশে ভ্রমণ করছি এক জায়গা থেকে অন্য জায়গায়। ছোট্ট এয়ারপোর্টের মূল ভবনে এসে এবার ভালো করে আমাদের সহযাত্রীদের মুখগুলোর দিকে একবার তাকালাম। প্রায় সবার চেহারাই ইউরোপীয় ধাঁচের। হাতে গোনা কয়েকজন চায়নিজ। অর্থাৎ বুঝাই গেল আমরা সবাই ট্যুরিস্ট। নিছক ভ্রমণের অভিপ্রায়েই আমরা সবাই এখানে এসেছি। ভ্রমণ ছাড়া অন্য কোন কাজে মানুষ লাংকাউই আসবেই বা কেন? ডিপারচার অর্থাৎ নির্গমন গেটের দিকে চাইতেই দেখলাম একজন নারীর বিশাল পোট্রেট সামনের দেয়ালে। বুঝতে চেষ্টা করলাম এই রমণীটি কে। জাতীয় পর্যায়ে কোন বিখ্যাত নারী ছাড়া এখানে কোন পোট্রেট থাকার কথা নয়। ছবিটির সামনে এগিয়ে গেলাম আমি আর আমার মেয়ে অনি। অন্য ট্যুরিস্টরা যে যার মতো বেরিয়ে যাচ্ছে। আমাদের কোন তাড়া নেই। আর অজানাকে জানার জন্যই এই দ্বীপে এসেছি, যে দ্বীপটিকে তাবৎ চরাচর থেকে আলাদা বলেই অনুমান হয়। আমি আর অনি বেশ কিছুক্ষণ পোট্রেটটির নিচে এবং আশেপাশে মেয়েটির নাম অথবা পরিচিতি খোঁজার চেষ্টা করলাম। কিন্তু কোথাও তার পরিচয় লেখা নেই। লোকালয় থেকে তেপান্তরে এসে হঠাৎ কোন নারীকে চেনাও প্রায় অসাধ্য। ব্যাংকক শহরে যদি আপনি ট্যাক্সিতে এক চক্কর দেন তবে দেখবেন প্রতিটি হাইরাইজ ভবনে রাজা-রানীর যুগল কিংবা একক পোট্রেট লাগানো আছে। রাজকীয় ঢং-এর পোট্রেট। দেখলেই বুঝা যায় এটি রানী কিংবা রাজকুমারী। কিন্তু যে পোট্রেটটির সামনে আমরা দাঁড়ালাম তাকে অতি সাধারণ নারী বলে অনুমান হয়। একে রাজকুমারী ভাবার কোন অবকাশ নেই। ব্যর্থ হয়ে ট্যাক্সি স্ট্যান্ডে এলাম। কাউকে জিজ্ঞেস করতে পারতাম মেয়েটির পরিচয়। কিন্তু শুরুতেই এতো অনুসন্ধিৎসা দৃষ্টিকটু বলে মনে হলো। যখন ট্যাক্সির জন্য অপেক্ষা করছি তখন সুদি বললো ঐ মেয়েটির আরো। বেশ ক’টি ছবি আছে আশেপাশে। অনি বললো, মেয়েটি নিশ্চয়ই এই দ্বীপের কোন নামকরা হিরোইন অথবা মডেল। তাই তার ছবি সব জায়গায় ডিসপ্লে করা হয়েছে। তবে আমার মনে খটকা লেগেই থাকলো। কারণ মেয়েটির বেশভূষা মোটেই মডেল কিংবা নায়িকাদের মতো নয়। তবে ইচ্ছা থাকলো পরে এই নারীর রহস্যটি উদঘাটন করতে হবে। ট্যাক্সিতে উঠলাম আমরা চারজন। হোটেল বুকিং করা আছে আগে থেকেই। আমরা যখনই বিদেশে ভ্রমণ করি, তখন সব সময়ই আমাদের ভ্রমণ সঙ্গী মালয়েশিয়ান এয়ারলাইন। যেখানেই আমাদের ডেসটিনেশন হোক না কেন আমাদের যাওয়া আসা সব সময় কুয়ালালামপুর দিয়ে। মাত্র দুদিন আগেই আমরা কুয়ালালামপুর এসে পৌঁছেছি সিডনি থেকে। কেএল’এ এক রাত থেকে আজ এসেছি লাংকাউইতে। সিডনিতে ডাক্তারি কনফারেন্স থাকলেও লাংকাউইতে এসেছি নিছক ভ্রমণে। আমাদের মালয়েশিয়া ভ্রমণের ইটিনারারি ঠিক করে দিয়েছেন মালয়েশিয়ান এয়ারলাইনের ঢাকা অফিসের বিপ্লব চক্রবর্তী। প্রতিবারই কম ভাড়ায় বিমান টিকেট এবং কম দামে ফাইভ স্টার হোটেলে থাকার ব্যবস্থা বিপ্লব দা’ই করেন। লাভ শুধু এটুকুই না, বিপ্লব দার বদন্যতায় ইকোনোমি ক্লাসের টিকিট কেটে আমরা বিজনেস ক্লাসেও ভ্রমণ করেছি দু একবার। বিজনেস ক্লাসে সিটখালি থাকলেই আমাদের টিকিটটা আপগ্রেডেড হয়ে যায় অবলীলায়। এতো সুযোগ দেয়ায় আমরাও অন্য এয়ারলাইনের দিকে ঝুঁকি না। এবারও ঠিক একইভাবে ভ্রমণে বের হয়েছি। লাংকাউই হোটেল বুকিং-এর ভাউচার আমাদের সাথে।
কোনদিন এতো নির্জন দ্বীপ ভ্রমণের অভিজ্ঞতা আমাদের নেই। এদেশটা যদি মালয়েশিয়া না হতো তবে হয়তো ভয়ই লাগতো। কারণ মালয়েশিয়ার প্রায় সব ট্যুরিস্ট স্পটই আমাদের দেখা। এশিয়ান কিংবা ওয়েষ্টার্ন সব কিছুই আছে এ দেশটিতে। কিন্তু তার সাথে আছে নিèিদ্র নিরাপত্তা ব্যবস্থা। তাই সারা দুনিয়ার ট্যুরিস্টরা নিশ্চিন্তে ঘুরে বেড়ায় মালয়েশিয়ার প্রত্যন্ত এলাকায়। কোন ট্যুরিস্ট স্পটে যদি নিরাপত্তা ব্যবস্থা কঠোর না হয় তবে সে দেশে কোন ট্যুরিস্ট যাবে না কখনো। সেই দিক থেকে মালয়েশিয়ার সাফল্য একশতে একশ। ট্যাক্সিতে উঠেই ড্রাইভারকে বললাম, হলিডে ভিলা বীচ রিসোর্টে যেতে কতোক্ষণ লাগবে। ড্রাইভার জানালো পৌনে এক ঘন্টার মধ্যে আমরা পৌঁছে যাবো হোটেলে। হোটেলের নামই বীচ রিসোর্ট। অর্থাৎ বুঝতেই পারলাম সমুদ্রের পাড় ঘেঁষেই হবে আমাদের লাংকাউইর নিবাস। এয়ারপোর্ট থেকে বের হয়েই বুঝলাম, এটি জনশূন্য একটি প্রত্যন্ত দ্বীপ, যাকে সমগ্র চরাচর থেকে বিচ্ছিন্ন বলেই বিভ্রম হয়। হয় পাহাড় না হয়তো সাগরের পাশ ঘেঁষে আমাদের গাড়ি শাঁ শাঁ করে এগিয়ে যাচ্ছে হলিডে-ইন ভিলার দিকে। আশপাশে সমুদ্র সৈকতের ছড়াছড়ি। গোয়া কিংবা আমেরিকার মাওয়ি দ্বীপের সাথে লাংকাউই’র মিল রয়েছে অনেকাংশে। দূর থেকে দেখে মনে হলো মাওয়ি’র বিশ্ববিখ্যাত পাপালুয়া, কাপালনি, কাহানা কিংবা কাপালুয়া বীচের চাইতে লাংকাউই’র সৈকতগুলো কোন অংশে কম সুন্দর নয়। প্রায় দেড় যুগ আগে মাওয়ি’র কাপালুয়া বীচের পাড়ে এক রিসোর্টে আমি থেকে এসেছি এক সপ্তাহ। পাহাড়ের ওপরের হোটেল কিংবা সৈকত লাগোয়া রিসোর্টে রাত্রি যাপনের অভিজ্ঞতা সবসময়ই রোমাঞ্চকর।
কিছুক্ষণের মধ্যেই ছোট্ট একটা শহরের উপস্থিতি টের পেলাম। বলা যায় একদম বিরান ভূমি থেকে জনারণ্যে প্রবেশ করলাম। সমুদ্রের পাশ ঘেঁষে চলতেই হঠাৎ চোখে পড়লো একটি বিশাল রিসোর্ট। চোখ ফেরাতেই দেখলাম গেটে লেখা হলিডে ভিলা বীচ রিসোর্ট ও স্পা। বুঝতে পারলাম হোটেলে পৌঁছে গেছি। গাড়ি থেকে নেমেই বুঝলাম এ হোটেলের আদব-কায়দা ট্র্যাডিশনাল। অর্থাৎ অন্য পাঁচ তারকা হোটেলের সাথে এর কোন মিল খুঁজে পাওয়া যাবে না। বুঝা গেল, এ দ্বীপের ঐতিহ্যগত ভাবধারায় গড়ে তোলা হয়েছে এই রিসোর্টটিকে। হোটেল রিসেপশনে এসে আমাদের ভাউচারটি দিলাম। প্রত্যেক হোটেল কাউন্টারে যেয়ে আমি সচরাচর যে কথাটি সব সময় রিসেপশনিষ্টকে বলি সেই কথাটি এখানেও বললাম। অর্থাৎ আমি অভ্যর্থনাকারিনীকে অনুরোধ করলাম যাতে সে যতোটা সম্ভব উঁচু ফ্লোরে আমাদের রুমটির বরাদ্দ দেয়। কারণ কুড়ি তলা কিংবা পঁচিশ তলা হোটেলের জানালা দিয়ে রাতের অচেনা শহরগুলোকে স্বপ্নের মত লাগে। গতকাল রাতেই থেকে এসেছি কুয়ালালামপুরের জালান ইসমাইল রোডের রেনেসাঁ হোটেলের তেইশতম ফ্লোরের একটি ডিলাক্স রুমে। রেনেসাঁ হোটেলের জানালা দিয়ে চাইলে মনে হয় হয়তো হাত বাড়ালেই ছোঁয়া যাবে টুইন টাওয়ার। তারকা হোটেলের উঁচু তলায় থাকার ব্যাঞ্জনাই আলাদা। তাই লাংকাউই এসেও উঁচু ফ্লোরে থাকার বায়না ধরলাম রিসেপশনিষ্টের কাছে। আমাদের যাঞ্চা শুনে অভ্যর্থনাকারিনীকে একটু অবাক হতে দেখলাম। সহাস্যে পুতুলের মতো চায়নীজ মেয়েটি বললো, আমাদের হোটেলে তো হাইরাইজ ফ্লোর নেই। আমাদের হোটেলটিই তো মাত্র দোতলা। অর্থাৎ হাইরাইজ বলতে সেকেন্ড ফ্লোর। মনে মনে লজ্জা পেলাম এই ভেবে, যে হোটেলে এসেছি সেই হোটেল সম্পর্কে আমি কিছুই জানি না। যদি নিজে কখনো ইন্টারনেটে হোটেল বুক করি তবে তখন হোটেলের রুম সংখ্যা, হোটেলটি কতো তলা কিংবা ব্রেকফাস্ট ফ্রি কিনা এসব বিষয়-আশয়গুলো ভালো মতো দেখে নেই। কিন্তু এবারের ভ্রমণে তার ব্যত্যয় ঘটেছে। আমাদের হোটেল বুকিং, সাইট সিটিং সবকিছু ঠিক করে দিয়েছেন বিপ্লব দা মালয়েশিয়ান এয়ার লাইনের প্যাকেজের ভেতর। তাই হোটেল সম্পর্কে খোঁজ-খবর নেয়ার দরকার হয়নি। মেয়েটি আমাকে হেসে জানালো, উঁচু তলাতে থাকতে পারবো না কিন্তু ঘর থেকে হাত বাড়ালেই সমুদ্রের জল ছুঁতে পারবো। হোটেলের লবিটি এমন ঢং-এ বানানো যে, সেখানে দাঁড়িয়ে কারু পক্ষেই বুঝা সম্ভব নয় হোটেলটি কতো বড় এবং এটি কতো তলা হোটেল। হলিডে ভিলার রুম খুলেই আমার বৌ চন্দনার মুখে চাঁদের হাসি। এমন দৃশ্য কোথায় গেলে আর দেখা যাবে? ঠিক যেন রুমের দোরগোড়ায় সমুদ্রের ঢেউ আছড়ে পড়ছে। লবিতে দাঁড়িয়ে সমুদ্রের ফোঁপানি শোনা যায়নি। কিন্তু এখন তা স্পষ্ট। পানটাই তেনঘা সী বীচের ওপর চৌদ্দ একর জমির উপর গড়ে উঠেছে এই হোটেল। হোটেলটি গড়ে তোলা হয়েছে গ্রামের আদলে। লাংকাউই দ্বীপের পশ্চিম উপকূলে এটি একটি পশ রিসোর্ট। তিনশ আধুনিক রুমের এক বিশাল সমাহার এই রিসোর্টে। আমাদের রুমের ঠিক সামনেই বিশাল সুইমিংপুল, আর তার পাশ ঘিরে তিনটি লন টেনিস কোর্ট। জামা কাপড় পাল্টে বেরিয়ে গেলাম হোটেল পর্যবেক্ষণে। অনি-সুদি দুজনেই চাইছিল সুইমিংপুলে নামতে। কিন্তু চন্দনার আপত্তিতে তা হলো না। তখন চারদিকে আঁধার নামছে গুঁড়ি গুঁড়ি। সন্ধ্যায় সাঁতরালে যদি ঠান্ডা লাগে, সেই ভয়ে কাউকেই সুইমিংপুলে যেতে দেয়া হলো না। লবিতে নেমে হোটেলের চারপাশ ভাল মতো পর্যবেক্ষণ করলাম বেশ কিছুক্ষণ। বুঝতে পারলাম লাংকাউই শহর থেকে এই রিসোর্টটি প্রায় বিচ্ছিন্ন। আশপাশে কোন লোকালয় চোখে পড়লো না। হোটেলের সামনে জঙ্গলের ভেতর দু’ একটা ছোট ছোট রেস্টুরেন্ট আছে ট্যুরিস্টদের জন্য। সাহেবরা অনেক সময়ই ফাইভ ষ্টার হোটেলে বসে খেতে পছন্দ করে না। তাই রুচি পাল্টাতে আসে এসব ঘুপচি ঘরে। সুইমিংপুলের পাশ ঘেঁষে চলে এলাম সী বীচে। সী বীচে তখনও অতি উৎসাহী সাহেব মেমরা স্নানে ব্যস্ত। সী বীচের চারপাশে তখন বীয়ার আর স্যাম্পেনের ফোয়ারা। হোটেলের ট্রপিক্যাল বীচ বার তখন পরিপূর্ণ। এ দৃশ্য দেখলে কে বলবে মালয়েশিয়া মুসলিম অধ্যুষিত একটি দেশ। আপনার মনে হবে এটি হাওয়াই দ্বীপের ওয়াইকিকি বীচ। সন্ধ্যা গড়ালো। অনি তাড়া দিচ্ছিল ডিনারের জন্য। কোথায় ডিনার খাবো তা নিয়ে বিভ্রান্তি। সুদি বললো চলো ট্যাক্সি ভাড়া করে শহরের ভেতর যাই। চন্দনা সায় দিলো না। এ হোটেল থেকে মূল শহরের দূরত্ব কতোটুকু, তা আমাদের ধাতে নেই। বিদেশ বিভূই। কাউকে এখানে জানি না – চিনিও না। তাই রাতে আর বেরুলাম না। ডিনার করবো এ হোটেলেই। কোথায় ডিনার সারবো। তাতেও দ্বিধাদ্বন্দ্ব। লাগেন্ডা রেস্টুরেন্ট, মারিও ইতালিয়ান রেস্টুরেন্ট, সানসেট টেরেসে তখন মহাধূমধামে ডিনার চলছে। ইতালিয়ান খাবার আমাদের পছন্দ নয়। খোদ রোমে যেয়েও আমরা পিজা-পাস্তা খেতে চাইনি। অনির মহাপছন্দ পিজা। ও আমাদের জোর করেই ইতালিয়ান রেস্টুরেন্টের দিকে নিয়ে যেতে চাইলো। আমরা সায় দিলাম না। বিদেশে গেলেই আমরা বাফেট ডিনার কিংবা লাঞ্চ খুঁজি। কারণ এতে খাবার সিলেকশনের স্বাধীনতা থাকে। হোটেলের একজন কর্মীকে জিজ্ঞেস করলাম এই হোটেলে কিংবা আশপাশে বুফে ডিনারের ব্যবস্থা আছে কিনা? সে বললো মিড নাইট পর্যন্ত লাগেন্ডা রেস্টুরেন্টে বারবিকিউ ডিনার চলবে। বারবিকিউ ডিনার মানে আগুনে ঝলসানো মাংস কিংবা মাছের ডিনার। ঢুকে গেলাম লাগেন্ডাতে। খাসী, গরু, সামুদ্রিক মাছ কিংবা গলদা চিংড়ির বারবিকিউ। তবে ওটি পারফেক্ট বারবিকিউ ডিনার ছিল না। ঝলসানো খাবারের সাথে ছিল শতেক রকমের এশিয়ান, আমেরিকান কিংবা জাপানী খাবার দাবার। মাথাপিছু মাত্র বিশ ডলারে অমন ডিনার ইউরোপ আমেরিকাতে কেন সিঙ্গাপুরেও চিন্তা করা যায় না। বড় বড় গলদা চিংড়ি, কুককে বলা সাথে সাথে হয়ে যায় ফ্রাই। যতো খুশী খাও। কেউ বাধা দিবে না। যতো খুশী খাও আর যতোক্ষণ খুশী ততোক্ষণ খাও এদুটোই বুফে ডিনারের বাড়তি চার্ম। খেতে খেতে হঠাৎ করেই অনি বললো বাবা দ্যাখো, ঐ মেয়েটির ছবি এই হোটেলেও আছে। চেয়ে দেখি সত্যিই তাই। এই একই নারীর পোট্রেট আমরা এয়ারপোর্টে ও বিভিন্ন জায়গায় দেখে এসেছি। কিন্তু কোথাও এই নারীর পরিচয় লেখা নেই। এখানেও নেই। রেস্টুরেন্ট থেকে বেরিয়েই দেখলাম শুধু এক জায়গায় নয় বিভিন্ন জায়গায় এই রমণীর পোট্রেট শোভা পাচ্ছে। অনুসন্ধিৎসাটা আর চেপে রাখতে পারলাম না। রিসেপশনিষ্ট মেয়েটির কাছে এসে ঐ নারীর পোট্রেটটির দিকে ইঙ্গিত করে জানতে চাইলাম তার পরিচয়। চাইনীজ মেয়েটি আমার প্রশ্নটি শুনে বোধহয় বেশ অবাকই হলো। এমনিতেই ফকফকা সুন্দরী মংগল মেমদের মুখ দেখতে অনেকটা পুতুলের মতো। আর এখন আমার প্রশ্ন শুনে ঐ মেমটির মুখ যেন পুরোপুরি বার্বিডল হয়ে গেল। চোখে কোন নড়ন-চড়ন নেই। একদৃষ্টিতে সে তাকিয়ে থাকলো আমার মুখের দিকে। বুঝতে পারলাম তৈলচিত্রের ঐ নারী মূর্তিটি সম্পর্কে না জেনে এই দ্বীপে আসা আমার উচিত হয়নি। বাকিংহাম প্যালেসের সামনে দাঁড়িয়ে কোন পর্যটক যদি রাণীমাতার পোট্রেটের দিকে অঙ্গুলি নির্দেশ করে কোন বৃটিশ মেমের কাছে জানতে চায় ঐ ছবিটি কার তবে ঐ মেম সাহেবের মুখের আদল বিস্ময়ে যেমন বদলে যাবে ঠিক তেমনি অবস্থা তখন চাইনীজ মেয়েটির। সে সোজা সাপটা আমার প্রশ্নের কোন উত্তর দিল না। ড্রয়ার থেকে একটা বই বের করে তা আমার হাতে ধরিয়ে দিল। শুধু আলতো করে বললো লাংকাউই দ্বীপ মানেই ঐ নারী। বাকীটা বই থেকে পড়ে নিতে। বইটা হাতে নিলাম। ডিসকভারি সিরিজের বই। প্রচ্ছদে লেখা লাংকাউই – আইল্যান্ড অব লিজেন্ড। অর্থাৎ অলৌকিক কাহিনীর দ্বীপ লাংকাউই। চন্দনা, সুদি আর অনির চোখে তখন অনেক ঘুম। গত দুদিনে টায়ারিং জার্নি করেছি আমরা চারজন। মেলবোর্ণ থেকে সিডনি, সিডনি থেকে কুয়ালালামপুর তারপর এক রাত না পেরুতেই লাংকাউই। ওরা চলে গেল ঘরে। আমার তখনও ঘুম বা ক্লান্তি আসেনি। নতুন কোন কিছু জানার থাকলে আমার চোখে কখনো ঘুম আসে না।
একা একা চলে গেলাম সী সাইড বারে। তখনো জোড়ায় জোড়ায় বিদেশীরা ঘুরে বেড়াচ্ছে সমুদ্রের পাড়ে। সাগরের পাড় ঘেঁষে ওপেন স্টেইজ বানানো ডিনার ডান্সের জন্য। প্রতি শনিবার সারারাত এখানে কনসার্ট হয় আর তার সাথে ডিনার আর ডিসকো। হোটেলের পেছনে এক জায়গায় একটা সাইনবোর্ড দেখলাম। তাতে লেখা আছে খবঃ ঁং সধহলধ ুড়ঁ. মাঞ্জা কথাটা বাংলা না ইংরেজি তা বুঝতে পারলাম না। ছোটবেলায় যারা ঘুড়ি উড়িয়ে অভ্যস্ত তারা সবাই মাঞ্জা কথাটার সাথে পরিচিত। সুতাকে ধারালো করার জন্য বার্লি আর কাঁচের গুঁড়া দিয়ে ঘুড়ি ওড়ানোর সূতাতে মাঞ্জা দেয়া হয়। বার কয় চোখ কচলে ভাল করে তাকিয়ে দেখি ঐ সাইনবোর্ডটির পাশেই গুপ্তঘরের মতো একটি দরজা। নীল আলোর দরজা, স্পষ্টতই বুঝা গেল এটা হোটেলের মাসাজ পার্লার। চীনা, মালয়ি, ইতালি ও বাহারি মেয়ের সমাবেশ আছে এখানে। লেখা আছে মাসাজ করার ফি আশি রিংগিত। কিন্তু আমি জানি আশি রিংগিতই শেষ কথা নয়। মাসাজ রুমে একবার কোন পর্যটককে ঢুকাতে পারলেই কম্ম ফতে। একেক কাজের জন্য একেক রকমের চার্জ। মালয়েশিয়ান মেয়েরা এ কাজে মহা পটু। কি করে সাহেবদের কাছ থেকে বৈদেশিক মুদ্রা আহোরণ করতে হয় তা তারা জানে। শুধু জানে বললে ভুল হবে, খুব ভালো জানে। পেনাং শহরের মাসাজ পার্লারগুলো একবার ঘুরে দেখলেই বুঝা যাবে এরা সিঙ্গাপুর তো কোন ছাড়, কোন কোন ক্ষেত্রে থাইল্যান্ডের পাটায়া পুখেতকেও হার মানিয়ে দিবে। মাসাজ পার্লারের কাণ্ড কাহিনী সবই আমি জানি। তবে মানুষকেও যে মাঞ্জা দেয়া যায় তা আজ রাতেই প্রথম জানলাম।
রাতে ব্যালকনিতে বসে আগামীকালের ভ্রমণসূচি নির্ধারণ করি। হলিডে ভিলার এই রিসোর্টের একটা বিশেষ দিক হলো সমুদ্রের দিকের প্রতিটি রুমের সাথে আছে লাগোয়া সুপরিসর ব্যালকনি। কোন ফাইভ ষ্টার হোটেলে সাধারণত এমন দেখা যায় না। একবার আমরা ছিলাম জাকার্তার শারি প্যানপ্যাসিফিক হোটেলে। ঐ হোটেলেও ছিল রুম লাগোয়া ব্যালকনি। রাতে যখন জাকার্তা ঘুমায় তখন ব্যালকনিতে বসে নিশি রাতের শহর দেখা যায়। সুউচ্চ হোটেলের ব্যালকনিতে বসে রাতের আঁধারে চা কফি খেলে পরিবেশকে অনেকটা ভুতুড়ে মনে হয়। মনে হয় যেন চিলেকোঠায় বসে আছি। তবে হলিডে ভিলাকে চিলেকোঠা ভাবার কোন উপায় নেই কারণ এই হোটেলটিই মাত্র দোতলা। রাত বাড়ে আর সমুদ্রের গর্জন বাড়ে। হোটেল সংলগ্ন সমুদ্রের সৈকতটি রাতেও আলোতে উজ্জ্বল। বোঝা যায় সিকিউরিটির কারণে এতো আলোক বিন্যাস। অতি উৎসাহী পর্যটকরাও এতোক্ষণে সৈকত ছেড়ে নিজ নিজ ঘরে চলে গেছে। তাই সমুদ্র পাড় এখন একেবারেই সুনশান। রাতে ঘরে শুয়েও অন্তর দিয়ে অনুভব করতে থাকি সমুদ্রের হাসি কান্না মেশানো গর্জন। সমুদ্র স্রোতের আওয়াজ এতো কাছে অনুমান হয় যে মাঝে মাঝে মনে হয় এই বুঝি সাগরের নোনাজল উপচে পড়বে আমাদের ঘরে। পুখেতের বিখ্যাত সমুদ্র সৈকত পাতং বীচে আমরা একবার চার পাঁচ দিন কাটিয়ে এসেছি আন্দামান সী ভিউ হোটেলে। সেখানেও ঘরের পাশেই ছিল সমুদ্র। এখানেও তাই। আজো আমার মনে আছে পুখেত থেকে ঢাকা ফিরে আসার দু সপ্তাহের মধ্যে পৃথিবীর ভয়াবহ সুনামীতে পুখেত লণ্ডভণ্ড হয়ে গিয়েছিল। পাতং বীচের পাড়ে গড়ে ওঠা প্রায় দু ডজন ডিলাক্স হোটেল সম্পূর্ণ নিশ্চিহ্ন হয়ে যায়। এদের মধ্যে একটি ছিল আন্দামান সী ভিউ হোটেল। আজ রাতে আমরা যেমন লাংকাউই সাগরের পাড়ে বিছানায় শুয়ে আছি নিশ্চয়ই ঐদিন রাতে আন্দামান সী ভিউতেও কারুর পরিবার নিশ্চিন্তে ঘুমিয়ে ছিল ঐ ঘরটিতে। কে জানতো ঐদিন রাতের আঁধারে তাদের সবার দেহ মহাকালের জন্য মিশে যাবে সমুদ্রের নোনাজলে। সাগর পাড়ে পর্যটন করার ভয়াবহতা মনে করতে করতেই এক সময় ঘুম আসে দু চোখ জুড়ে।
সকালে লাগেন্ডা রেষ্টুরেন্টে বাফেট ব্রেকফাষ্ট। বলা যায় রাজকীয় নাস্তা। এক নাস্তাতেই শত পদের খাবার। ব্যাংকক, সিঙ্গাপুর কিংবা মালয়েশিয়ার যেকোন শহরে যারা প্যাকেজ ট্যুরে ভ্রমণ করে অভ্যস্ত তারা সবাই জানে এসব হোটেলের সকালের খাবার কতোটা জাঁকালো। সকাল দশটার দিকে ব্রেকফাষ্ট করলে দুপুরের লাঞ্চটা বেমালুম চেপে যাওয়া যায়। আর কেউ যদি সত্যি সত্যি ভোজন রসিক হয় তবে পেট চুক্তি ব্রেকফাষ্ট খেয়ে লাঞ্চ-ডিনার স্কিপ করে একেবারে আগামীকাল ব্রেকফাষ্ট টেবিলেও আসতে পারেন। আমার স্ত্রী-কন্যার আবার বুফে ব্রেকফাষ্টে কমপক্ষে এক ঘন্টা কাটানোর অভ্যাস। আজো তাই হলো, সকাল আটটা থেকে ন’টা পর্যন্ত কাটলো লাগেন্ডা রেষ্টুরেন্টে। সকাল ন’টায় বের হয়ে এসেই দেখি মে ফ্লাওয়ার ট্র্যাভেল এজেন্সির মংক্রোবাস আমাদের জন্য অপেক্ষা করছে। মালয়েশিয়ান এয়ার লাইনের সাথে আমাদের ট্যুরের চুক্তিতেই এই ট্যুর অন্তর্ভুক্ত। শুধু আমরা না, আরো একটি সাহেব-মেমদের ফ্যামিলি আমাদের সাথে যোগ হলো। তারা এসেছে ইতালী থেকে লাংকাউই দেখতে। আমাদের ড্রাইভার ইংরেজিতে ফ্লুয়েন্ট। সাধারণত প্রতিটি ট্যুরিস্ট স্পটেই দেখেছি ড্রাইভাররা ইংরেজি বুঝতে ও বলতে পারে। শুধু এর ব্যত্যয় দেখা যায় থাইল্যান্ডে। থাইরা কখনো ভাল ইংরেজি বুঝে না। এমনকি ষ্টার রেটেড হোটেলেও এ অবস্থা। ড্রাইভার প্রথমেই জানতে চাইলো আমরা প্রথমে কোথায় যেতে ইচ্ছুক। আমার কোন কিছু বলতে হলো না। ইতালীয় মেমটি আমাদের দিকে ভ্রƒক্ষেপ না করেই বলে দিল তারা সর্বপ্রথমে কুটা মাশুরি দেখতে আগ্রহী। আমাদেরও তাই ইচ্ছা। দুই ফ্যামিলির ইচ্ছা হুবহু এক। তাই গাড়ী চললো কুটা মাশুরির দিকে। এই প্রথম দিনের আলোতে লাংকাউই দ্বীপকে ভালভাবে দেখতে চেষ্টা করলাম।
মোট তেরটি রাজ্য নিয়ে মালয়েশিয়া। এর মধ্যে এগারোটি মালয়ি পেনিনশ্যুলাতে আর বাকী দুটি বোরনিও দ্বীপে। বোরনিও পৃথিবীর তৃতীয় বৃহত্তম দ্বীপ। লাংকাউই মালয়েশিয়ার কেডা রাজ্যে অবস্থিত, যা একেবারেই সমুদ্রের ভেতরে। বাসে ট্রেনে করে এই দ্বীপে আসা যাবে না। আসতে হবে আকাশে উড়ে আর নাহলে জলে ভেসে। কেডা রাজ্যকে বলা হয় জরপব নড়ষি ড়ভ গধষধুংরধ. খাদ্য শস্য উৎপন্ন করতে এই দ্বীপ মালয়েশিয়ায় এক নম্বরে। ছোট ছোট ৯৯টি আরকিপিল্যাগো বা দ্বীপপুঞ্জ নিয়ে লাংকাউই। আন্দামান সাগরের পাড়ে থাইল্যান্ডের পাশ ঘিরে গড়ে উঠেছে পৃথিবীর একটি স্বপ্নিল পর্যটন কেন্দ্র। সমগ্র দ্বীপটির আয়তন ৫২৮ বর্গ কিলোমিটার। লাংকাউই দ্বীপের জনসংখ্যা ষাট হাজার। এ দ্বীপের রাজধানীর নাম কূয়া। সমগ্র লাংকাউই একটি ডিউটি ফ্রি দ্বীপ। খধহমশধরি কথাটা এসেছে দুটি শব্দ সংযুক্ত হয়ে। খধহম কথার অর্থ হলো হেলাং। এটি একটি মালয়ি শব্দ যা ঈগল পাখীকে বোঝায়। আর কধরি একটি সংস্কৃত শব্দ যার অর্থ মার্বেল। এক সময় এই দ্বীপ ছিল ঈগল পাখীদের অভয়ারণ্য। আর এখানে পাওয়া যায় বিবিধ ধরনের মার্বেল। তাই ঈগল আর মার্বেল দুটি কথার সংযুক্তি ঘটিয়ে এ দ্বীপের নামকরণ করা হয়েছে খধহমশধরি। আমাদের মাইক্রোবাসটি চলছে সাগরের পাড় ঘেঁষে আর পাহাড় ডিঙ্গিয়ে। পাহাড় আর সাগরের মহামিলন এই দ্বীপে। বিস্তীর্ণ এলাকা কিন্তু কোথাও কোন জনবসতি দেখা যায় না। রাস্তায় হেঁটে যাওয়া মানুষের সংখ্যা নাই বললেই চলে। রাস্তায় বের হয়েই আমার মনে হলো এই দ্বীপের মানুষগুলো গেল কোথায়? চারপাশ এতো ভূতুড়ে আর জনমুনিষ্যি শূন্য কেন? হঠাৎ করেই আমার ছেলে সুদি বললো বাবা ঐ দ্যাখ শহর। ডান দিকে তাকাতেই দেখি সত্যিই তাই। হঠাৎ করেই যেন নির্জন সাগরে ভেসে ওঠা আইসবার্গের মতো একটা ছোট্ট শহর দৃশ্যমান হলো। গাড়ী চলছে শহরের দিকে। গাড়ীতে উঠেই একটা বিষয় লক্ষ্য করলাম আমরা। কুটা মাশুরি যে লাংকাউই’র সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ স্থান তা রাস্তায় বেরুলেই বুঝা যায়। কয়েকশ গজ পর পরই ছোট ছোট সাইনবোর্ডে তীর চিহ্ন দিয়ে দেখিয়ে দেয়া আছে মাশুরির মিউজিয়াম কোন্ দিকে। লাংকাউইতে পর্যটনের স্থান অগুনতি কিন্তু তাদের মধ্যে কুটা মাশুরি অনন্য। ঠিক এমন অবস্থা দেখেছি ল্যুভর মিউজিয়ামে। প্যারিসের এই মিউজিয়ামে তিশিয়ান, রেমব্রান্ট, পোশিয়ান, রাফায়েল, বাউচার, ক্যারভ্যাগিনো কিংবা মাইকেলাঞ্জেলোসহ অনেক জগৎ বিখ্যাত শিল্পীদের ছবি শিল্পকর্ম ছড়িয়ে ছিটিয়ে আছে। কিন্তু পর্যটকদের তো সব শিল্পকর্মের প্রতি তেমন কোন আকর্ষণ নেই। সবাই যেতে চায় মোনালিসার কাছে। তাই ল্যুভর কর্তৃপক্ষ এই বিশাল মিউজিয়ামের গেট থেকে মূল গ্যালারি পর্যন্ত ছোট ছোট সাইনবোর্ডে অ্যারো চিহ্ন এঁকে বুঝিয়ে দিয়েছে লিওনার্দো ভিঞ্চির মোনালিসা কোন্ দিকে। ল্যুভরে দেখেছি মানুষের ঢল মোনালিসার গ্যালারির দিকে। ঠিক একই অবস্থা লাংকাউইতে। এই দ্বীপের সব প্রধান প্রধান জায়গায় লেখা আছে কুটা মাশুরি কোন পথে যেতে হবে। এর কিছুক্ষণ পরেই আমরা পৌঁছে গেলাম কূয়া শহরে। ছোটখাটো একটা ছিমছাম শহর। তবে আভিজাত্যে সিঙ্গাপুর কিংবা ব্যাংককের সাথে তুলনীয়। এমন একটি নির্জন দ্বীপে হঠাৎ করে একটা আধুনিক শহর পাওয়া যাবে তা ভেবে অবাক হতে হয়। আমাদেরকে নামিয়ে দেয়া হলো শহরে। বলা হলো এক ঘন্টা সময় দেয়া হলো শহর দেখার জন্য। তারপর গাড়ী ছাড়বে মাশুরির মিউজিয়ামের দিকে। কূয়া শহর থেকে কুটা মাশুরির দূরত্ব ১২ কিলোমিটার। এক ঘন্টা অনেক সময়। পায়ে হেঁটে চললাম, শহর পরিভ্রমণে। এই শহরটির নাম কূয়া কেন তার পেছনে একটা ছোটখাটো ইতিহাস আছে। মালয়ি ভাষায় কূয়া কথার ইংরেজি অর্থ হলো এৎধাু অর্থাৎ রস কিংবা মাংসের ঝোল। কথিত আছে এক সময় এই দ্বীপের রাজার সুন্দরী মেয়েকে বিয়ে করার জন্য দুই বিশালদেহী পুরুষের মধ্যে মল্ল যুদ্ধ অনুষ্ঠিত হয় এই স্থানটিতে। যুদ্ধের এক পর্যায়ে বিশাল ভান্ডে রাখা মাংসের ঝোলের পাত্রটি ভেঙ্গে যায়। সুরা বা ঝোল সবটুকু ছড়িয়ে পড়ে মাটিতে। এই ঝোল থেকেই এই জায়গাটির নাম হয়ে যায় কূয়া অর্থাৎ ঝোল। বেশ কিছুক্ষণ ঘুরেফিরে অন্য দশটা শহর থেকে কূয়াকে পার্থক্য করা যায় না। একটা গতানুগতিক আধুনিক শহরে যা যা থাকা দরকার, তার সব কিছুই আছে কূয়া শহরে। কিন্তু এরই মধ্যে চেয়ে দেখি চন্দনা, সুদি আর অনি আমার চারপাশে নেই। ওরা হারিয়ে গেছে সে কথা আমি বিলক্ষণ চিন্তাও করলাম না। আশপাশে চেয়ে দেখার চেষ্টা করি কোথাও কোন বড় মার্কেট কিংবা ডিপার্টমেন্টাল স্টোর আছে কিনা। ক’কদম এগুতেই চোখে পড়লো বিরাট মার্কেট। সামনে সাইনবোর্ড। তাতে লেখা বিলিয়ন সুপার মল। আমি নিশ্চিত বুঝতে পারলাম ওরা এখানেই আছে। একটু এগুতেই অনির কথার আওয়াজ পেলাম। ও আমাকে ডেকে বলছে- বাবা আমরা এখানে। মার্কেটের নাম বিলিয়ান মার্কেট। এই মার্কেটটা কি সাধারণ মানুষের জন্য না শুধু বিলিয়নারীদের জন্য তা বোধগম্য হলো না। কিছুক্ষণ পর চন্দনা মার্কেট থেকে বেরিয়ে আমাকে বললো এই মার্কেটে জিনিসপত্রের দাম অনেক কম তাই সে সন্ধ্যায় এখানে আসতে চায়। আমাদের প্যাকেজ ট্যুর বিকেল চারটা পর্যন্ত। তাই ট্যাক্সি ভাড়া করে সন্ধ্যায় এখানে আসা খুবই সহজ। রাজী হলাম আবার সন্ধ্যায় কূয়া শহরে আসতে। সাড়ে দশটার দিকে রওয়ানা হলাম কুটা মাশুরির দিকে।
কড়ঃধ গধযংঁৎর কথা যার অর্থ হলো মাশুরির শহর। কড়ঃধ কথার অর্থ হলো ঞড়হি। মাশুরি নামের এক নারীকে ঘিরে গড়ে উঠেছে এই শহর। লাংকাউই দ্বীপের উলু মেলাকা এলাকায় গড়ে উঠেছে কুটা মাশুরি কালচারাল সেন্টার। একে অনেকে মিউজিয়ামও বলে। মিউজিয়ামের গেটে আমাদের গাড়ী থামলো। নেমেই দেখি শত শত পর্যটক লাইন দিয়ে দাঁড়িয়ে আছে ভেতরে ঢোকার টিকিট কেনার জন্য। জনপ্রতি এন্ট্রি ফি দশ রিংগিত। আমাদের সাথে যারা লাইনে দাঁড়িয়ে আছে তারা সবাই বিদেশী। এদিক সেদিক ছড়িয়ে ছিটিয়ে আছে ডজন ডজন এয়ারকন বাস আর মাইক্রোবাস। সবাই এখানে বিদেশী।
কুটা মাশুরিতে ঢুকেই প্রথম চোখে পড়লো একটি সমাধি। বুঝতে পারলাম এটি মাশুরির সমাধি। মাশুরির পুরো নাম মাশুরি বিনতে পানডাক মায়া। তখনও আমি বুঝতে পারছিলাম না এই নারী এই দ্বীপে কেন এতো বিখ্যাত। কেন সবাই আসে এই নারীর সমাধিতে? এর উত্তর পেতে দেরী হলো না। না জেনে শুনে এখানে সেখানে ঘোরাফেরা করার চাইতে জেনে শুনে দেখা ভাল। তাই ঢুকে গেলাম মাশুরির মিউজিয়ামে। কারণ হোটেলের বুকলেটে মাশুরির ছবি আছে অনেক কিন্তু ইতিহাস আছে অতি সামান্য। মিউজিয়ামের গেটে প্রতিদিন সকাল ন’টা থেকে বিকাল পাঁচটা পর্যন্ত মালয়ি কিশোর-কিশোরীরা নাচ গান করে। মিউজিয়ামে ঢুকেই বুঝতে পারলাম মাশুরি নামের এই নারী কেন লাংকাউইতে অদ্বিতীয়।
মাশুরি মিউজিয়ামটি মাশুরির ব্যক্তিগত কথকথা আর পারিবারিক জীবন নিয়ে গড়ে তোলা হয়েছে। মূল গ্যালারিটির প্রতিটি জায়গায় স্থান পেয়েছে ঐ অনিন্দ সুন্দরী নারীর পোর্টেট। ১৮১৫ সালের দিকে মাশুরি বিনতে পানডাক মায়া নামের এক যুবতীর রূপের কথা এই দ্বীপে সর্বত্র আলোচনার বিষয়বস্তু হয়ে দাঁড়ায়। তাকে বিয়ে করার প্রস্তাব আসতে থাকে চারদিক থেকে। সে সময় লাংকাউই এর গোষ্ঠী প্রধান ছিল দাতু পাকেরান জায়া। তার ছোট ভাই ওয়ান ডারুসের সাথে মাশুরির বিয়ে ঠিক হয়। মাশুরির বিয়েতে তার বাবা পানডাক মায়া এবং মা কিট অ্যালাং যারপরনাই খুশী হয়। সামান্য কৃষকের মেয়ে হয়ে যায় রাজবধূ। কিন্তু মাশুরির জীবন সুখের হয়নি। স্বামী তাকে ভালবাসলেও সে রাজ পরিবারের অন্যদের কাছ থেকে এতোটুকু ভালবাসা পায়নি। সবচেয়ে আশ্চর্য হলো রাজার ছোট ভাই এর সাথে বিয়েতে প্রাথমিকভাবে মাশুরি নিজে রাজীই হতে চায়নি। মাশুরি চেয়েছিল সাধারণ যুবকের বৌ হয়ে ছিমছাম সাধারণ জীবন বেছে নিতে। কিন্তু দ্বীপের সবচেয়ে সুন্দরী নারীর বিয়ে হবে অন্য পুরুষের সাথে তা লাংকাউই-এর গোষ্ঠী প্রধানরা মেনে নেয়নি। প্রায় জোর করেই মাশুরিকে ওয়ান ডারুসের সাথে বিয়ের পিঁড়িতে বসানো হয়। স্বামী ভাগ্য মাশুরির ভালো ছিল। কিন্তু ওয়ান ডারুসের বড় ভাই রাজা পাকেরান জায়ার স্ত্রী মোহরা একেবারেই মাশুরিকে সহ্য করতে পারছিল না। মোহরা নানাভাবে তার বান্ধবীদের দিয়ে মাশুরিকে হেনস্তা করতে থাকে। এক সময় মোহরা মাশুরির রূপে আর গুণে অসহ্য হয়ে তাকে মেরে ফেলার পরিকল্পনা করে। ১৮১৯ সালের প্রথম দিকে মাশুরির স্বামী বিদেশে যায় কয়েক সপ্তাহের জন্য। আর ঐ সুযোগেই মোহরা তার পরিকল্পনাটি চরিতার্থ করে। একদিন বিকেলে মাশুরির এক দু:সম্পর্কের আত্মীয় যুবক বাটু বাহারা থেকে মাশুরির সাথে দেখা করতে আসে। যুবকটির নাম ছিল ডেরামবাং। বিকেলে মাশুরি আর ডেরামবাং বসে আলাপ করছিল। তারপর দিন মোহরা চারদিকে রটিয়ে দেয় মাশুরি চরিত্রহীন। সে ঐ ভিনদেশী যুবকের সাথে দৈহিক সম্পর্ক স্থাপন করেছে। মোহরা তার তিন বান্ধবীকে সাক্ষী হিসেবে উপস্থাপন করলো। তারা বললো মাশুরিকে নাকি তারা ঘরের ভেতর সহবাসরত দেখেছে। মাশুরির জীবনে নেমে এলো ঘোর অমানিশা। স্বামী রাজ্যে নেই কিন্তু বিচার হয়ে গেল একতরফা। স্ত্রীর প্ররোচনায় রাজা পাকেরান জায়া তড়িঘড়ি করে মাশুরির বিচার করে ফেলে। বিচারে মাশুরির প্রাণদণ্ড হয়। একই সাথে কথিত প্রেমিক ডেরামবাং-এরও প্রাণদণ্ড হয়। প্রতারণা আর বিশ্বাসঘাতকতার জন্য নিষ্পাপ মাশুরি মৃত্যুর মুখোমুখি দাঁড়িয়ে যায়। রাজা ছোট ভাই ওয়ান ডারুসের জন্য অপেক্ষা করলো না। তাড়াতাড়ি ভাই ফিরে আসার আগেই মাশুরির প্রাণ সংহার করতে সে সব আয়োজন পূর্ণ করে। মৃত্যুদণ্ডের দিন একটি গাছের সাথে মাশুরিকে বেঁধে ফেলা হয়। তারপর প্রকাশ্য দিবালোকে কীরিচ দিয়ে মাশুরির শরীরে আঘাত করা হয়। রাজ জল্লাদ আরিয়া বার বার বিভিন্ন অস্ত্র দিয়ে মাশুরিকে আঘাত করতে থাকে কিন্তু কোন অস্ত্রই মাশুরির শরীরে বিঁধছিল না। রাজ্যের সব ভয়ংকর অস্ত্র দিয়ে পর পর পাঁচ দিন চেষ্টা করেও মাশুরির প্রাণদণ্ড কার্যকর করতে ব্যর্থ হয় রাজা। রাজা আর মোহরা লজ্জায় ডুবে যায়। চারদিকে যখন প্রচণ্ড রোদ তখন মাশুরিকে যে স্থানে বেঁধে রাখা হয়েছে তার ওপরে পাখিরা তাদের পাখা দিয়ে সামিয়ানা তৈরি করে রাখতো যাতে মাশুরির শরীরে একটুও রোদের আঁচ না লাগে। এতোসব অলৌকিক কাণ্ড-কারখানা দেখে রাজ্যের অধিবাসীদের মনে ধারণা জন্মে যে, মাশুরি হয়তো কোন ষড়যন্ত্রের শিকার। তখন রাজ্যের সব কৃষকরা তাদের যাবতীয় সোনাদানা আর শস্য রাজাকে দিয়ে পরিবর্তে মাশুরির প্রাণ ভিক্ষা করে। রাজা সামান্য নরম হলেও তার স্ত্রী মোহরাকে পেয়ে বসে খুনের নেশায়। যে করেই হোক মাশুরিকে হত্যা করতেই হবে। সে তখন জল্লাদ আরিয়াকে মাশুরির কাছে পাঠায় কেন তাকে হত্যা করা যাচ্ছে না রহস্য জানতে। লজ্জায় মাশুরি আর এ জীবন রাখতে চায়নি। সে তখন আরিয়াকে বলে তাদের পারিবারিক কীরিচ দিয়ে আঘাত করলেই তার মৃত্যু ঘটবে। এর পরদিন মাশুরির পারিবারিক কীরিচ দিয়ে মাশুরিকে আঘাত করা হলো। মৃত্যুর আগ মুহূর্তে মাশুরি লাংকাউই দ্বীপকে অভিশাপ দিয়ে যায়। সে বার বার উচ্চারণ করতে থাকে সে যদি নিষ্পাপ হয় তবে সাত জনম এই দ্বীপে কোন শস্য দানা মাটিতে ফলবে না। এই দ্বীপ হয়ে যাবে বিরাণ ভূমি। কথিত আছে মাশুরির বুকে আঘাত করার পর তার বুক থেকে লাল রক্তের পরিবর্তে সাদা রক্ত গল গল করে বেরুতে থাকে। আর ঐ সাদা রক্ত মাটিতে না পড়ে আকাশের দিকে ধাবিত হয়ে মেঘের সাথে মিশে যায়। মাশুরির মৃত্যু হওয়ার সাথে সাথে বনে বনে আগুন লেগে যায়। পাকা শস্য ক্ষেতের ফসল জ্বলেপুড়ে ছাই হয়ে যায়। মাত্র এক বছরের মধ্যে লাংকাউই মরুভূমির মতো নিষ্ফলা হয়ে ওঠে। মাশুরির অভিশাপে এই দ্বীপ হয়ে ওঠে অভিশপ্ত রাজ্য। ক্ষুধার তাড়ণায় এ দ্বীপের মানুষ মূলত থাইল্যান্ডের দিকে চলে যায়। রাজ্য ফেলে রাজারা হয় দেশান্তরী। মাশুরির বাবা-মা মেয়ে হারানোর লজ্জায় আর ক্ষোভে থাইল্যান্ডের পুখেতে আশ্রয় নেয়। একমাত্র পুত্র ওয়ান হাকিমকে নিয়ে মাশুরির স্বামী ওয়ান ডারুস থাইল্যান্ডে নির্বাসিত জীবন যাপন করে। মাশুরির অভিশাপের সাত জনম পার হয় হয় ১৯৮০ সালে। লাংকাউই এর মানুষরা আশায় ছিল কখন মাশুরি পরিবারে সাত জেনারেশন পার হয়। কারণ শুধু তাহলেই মাশুরির অভিশাপের মেয়াদ পার হবে। দুর্ভিক্ষ আর ক্ষুধার রাজ্য আনন্দে নেচে ওঠে ১৯৮০ সালে। ঐ বছর ওয়ান ডারুস আর মাশুরির পরিবারে জন্মগ্রহণ করে এক নবজাতক নারী, যার নাম আসিয়া নোয়াই। জন্মের পর পরই মালয়েশিয়ানরা আসিয়াকে থাইল্যান্ড থেকে লাংকাউই নিয়ে আসে। কথিত আছে আসিয়া লাংকাউই এর মাটিতে পা রাখার সাথে সাথে রাতারাতি বদলে যায় এই দ্বীপের আদল। মাত্র পঁচিশ বছরে এই দ্বীপ আজ পৃথিবীর অন্যতম শ্রেষ্ঠ পর্যটন কেন্দ্র হিসেবে বিবেচিত। উৎকৃষ্ট মানের ধান উৎপন্ন করার জন্য লাংকাউই আজ মালয়েশিয়ার গর্ব। পরিমাণে বেশি নয় কিন্তু মানে এখানকার ধান চমৎকার। মাশুরিকে লাংকাউই-এর অধিবাসীরা দেবতা জ্ঞানে শ্রদ্ধা করে। তাকে বলা হয় সততা আর পবিত্রতার প্রতীক। প্রায় এক ঘন্টা আমরা মিউজিয়ামে এদিক সেদিক ঘুরে দেখলাম। শত বছরের পুরনো ফটো আর পোর্ট্রেট ভরা গ্যালারি। আর তার সাথে আছে অডিও আর ভিডিও বর্ণিত ইতিহাস। মাশুরি আর তার পরিবারের বংশানুক্রম সাজানো আছে পোস্টারে। কিন্তু সবচেয়ে আশ্চর্য হলো এই মিউজিয়ামে মাশুরির ওপর লেখা ইংরেজিতে কোন বই নেই। ইচ্ছে ছিল ক্যামেরা দিয়ে পোস্টারগুলোর ছবি করে নেয়া। কিন্তু সেখানেও বিপত্তি। মিউজিয়ামের ভেতর ক্যামেরা নিয়ে প্রবেশে কড়াকড়ি। ক্যামেরায় ক্লিক করলেই হুজ্জতি। তাই অগত্যা ডায়রিতে যতোটা পারলাম লিখে নিলাম। আমার মেয়ে এসব বিষয়ে পারঙ্গম। আমি একটা আর অনি অন্যটা এভাবে মাশুরি সম্বন্ধীয় বেশকিছু ইতিহাস আমরা দুজন টুকে নিলাম। মিউজিয়ামের এক জায়গায় লেখা আছে এই সমাধিস্থলে মাশুরিকে হত্যা করা হয়নি। মাশুরির প্রাণদণ্ড কার্যকর করা হয় তামান কীরিচ নামক স্থানে। মাশুরির সমাধিস্থল থেকে তামান কীরিচের দূরত্ব পঁচিশ কিলোমিটারের মতো, জায়গাটা এয়ারপোর্ট সংলগ্ন। সেখানেও মাশুরির একটি স্মৃতিসৌধ আছে। ইতিহাস পড়ে জানলাম যে কীরিচটি দিয়ে মাশুরিকে হত্যা করা হয় সেটি রক্ষিত আছে তামান কীরিচ এলাকায়। এবং এই কীরিচের নামানুসারেই জায়গাটির নাম হয়ে গেছে তামান কীরিচ। এবার মিউজিয়াম দেখে বের হলাম মাশুরির স্মৃতি বিজড়িত জায়গাটি ঘুরেফিরে দেখতে। মাশুরি স্মৃতিসৌধের কাছে দাঁড়িয়ে তার প্রতি শ্রদ্ধায় আমার মাথা নত হলো। যখন প্রথম এই সমাধির কাছে এসেছিলাম তখন আমার এমন অনুভূতি ছিল না। ভেবেছিলাম কোন রাজকন্যার সমাধিক্ষেত্র এটি। কিন্তু এটি যে এক নির্যাতিতা রাজবধূর সমাধি তা এইমাত্র জানলাম। চারপার্শ্বে অনেক বিদেশী। সবারই আকর্ষণ মাশুরির সমাধি। একপাশে তৈরি করা আছে স্থায়ী মঞ্চ। সেই মঞ্চে কোন কোন বিশেষ দিনে মাশুরির জীবন নিয়ে থিয়েটার হয়। একজন মালয়েশিয়ান নায়িকা আছে যার মুখের আদল অনেকটা মাশুরি বিনতে পানডাকের মতো। সাধারণত ঐ নায়িকাকে দিয়েই মাশুরির রোল করানো হয়। এই নারীকে ঘিরেই গড়ে উঠেছে কুটা মাশুরি বা মাশুরির টাউন নামে একটি ছোট্ট শহর। প্রতিবছর গড়ে কুড়ি লক্ষ পর্যটক এই সমাধিস্থলে আসে। ধারণা করা হয় মাশুরির পরিবার এই এলাকাতেই বাস করতো। মাশুরির মৃত্যুর পর রাজ পরিবারটি সর্বস্বান্ত হয়ে যায়। রাজবাড়ীর অবশিষ্ট আর কিছু এখানে নেই। শুধু আছে মাশুরির ঘরের রিপ্লিকা। সমাধিস্থল থেকে মাত্র একশ গজ দূরে আছে টেলেগা মাশুরি। অর্থাৎ মাশুরির কুয়া। কথিত আছে ঐ কুপের জল মাশুরি নিজে ব্যবহার করতো। এই কুয়ার জল হোলি ওয়াটার হিসেবে বিবেচিত। তাই এক বোতল জল কিনতে দিতে হয় দশ রিংগিত। এসব কাণ্ড-কারখানা দেখে আমি ভাবি কি করে পর্যটকদের পকেট খালি করতে হয় সে বিদ্যায় মালয়িরা সিঙ্গাপুরিয়ান কিংবা থাইদেরও ছাড়িয়ে গেছে। এই এলাকার লোক আর্ট কালচারে বেশ উন্নত। পোর্ট্রেট আঁকিয়েরা সারি সারি বসে আছে। পঁচিশ রিংগিত দিলে আধ ঘন্টার মধ্যে তৈরি করে দিবে পেন্সিল স্কেচের পোর্ট্রেট। প্রতিদিন সকাল নটা থেকে পাঁচটা পর্যন্ত চলে এসব বিচিত্র কাজ কারবার।
দুপুর তখন দেড়টা। এবার যাচ্ছি সমুদ্র সৈকতে। কিন্তু আমার মাথা থেকে তামান কীরিচের ব্যাপারটা যাচ্ছে না। সী বীচ তো জীবনে অনেক দেখেছি। কিন্তু এমন ইতিহাস তো কোনদিন শুনিনি। ড্রাইভারকে জিজ্ঞেস করলাম আমাদের ফেরার রাস্তায় তামান কীরিচ পড়বে কিনা। কিন্তু সে হতাশ হওয়ার মতো উত্তর দিল। সে বললো তামান কীরিচ কুটা মাশুরি শহরের ঠিক উল্টো পাশে। যেতে হলে অন্য দিন যেতে হবে। গাড়ীতে উঠার আগে মাশুরির সমাধি সম্পর্কিত আর একটি তথ্য জেনে নিলাম। ১৯৪০ সালের আগে মাশুরির কবরটি বাঁধানো ছিল না। ঐ বছর মালয়েশিয়ার প্রধানমন্ত্রী টেংকু আব্দুর রহমান পুত্রা আলহাজ্ আনুষ্ঠানিকভাবে মাশুরির সমাধি স্থল স্থাপনার উদ্বোধন করেন। মালয়েশিয়ানরা মাশুরি লিজেন্ডটি পুরোপুরি বিশ্বাস করে। তারা বিশ্বাস করে ১৯৮০ সালে অভিশাপমুক্তির পর থেকে রাতারাতি লাংকাউই বিখ্যাত হয়ে গেছে। ছোট্ট একটা দ্বীপ যেখানে বাস কিংবা ট্রেনে যাওয়া যায় না, সাগর থেকে চাইলে মনে হয় সাগরের মধ্যে ভেসে আছে এক খন্ড সবুজ ভূমি। আর সেই ছোট্ট দ্বীপ শহর লাংকাউইতে আছে ৭৫টি স্টার রেটেড হোটেল। চিন্তা করা যায় কতোটা আকর্ষণীয় এই শহরটি।
এবারের গন্তব্য সী বীচ। সমুদ্র সৈকত সব পর্যটকদের জন্যই আকর্ষণীয়। কিন্তু ক’ বছর আগেই আমরা ভারতের গোয়া আর আমেরিকার হাওয়াই দ্বীপের সী বীচগুলো দেখে এসেছি। যারা গোয়া বীচ কিংবা ওয়াইকিকি সী বীচ দেখে এসেছে তাদের কাছে পৃথিবীর অন্য কোন সৈকত তেমন ভাল লাগার কথা নয়। তবুও গাইডরা বললো লাংকাউই এর সমুদ্র সৈকতগুলো নাকি অন্য ধরনের। এ দ্বীপের একেকটি সৈকতের বৈশিষ্ট্য নাকি আলাদা ধরনের। লাংকাউইতে দেখার আছে অনেক কিছু। জলপ্রপাত, বিখ্যাত সেভেন ওয়েল, বুটিক ভিলেজ, ওরিয়েন্টাল ভিলেজ, লাংকাউই ক্যাবেল কার, আন্ডার ওয়াটার ওয়ার্ল্ড, কুমীরের ফার্ম, রাজকীয় প্রমোদতরীতে নৌবিহার- সব আছে এই ক্ষুদ্র দ্বীপটিতে। কিন্তু এখানে পর্যটকরা আসে মূলত এখানকার পৌরাণিক কাহিনীগুলোর স্পর্শ পেতে। তাই লাংকাউইকে বলা হয় ওংষধহফ ড়ভ ষবমবহফং . অলৌকিক কাহিনীর দ্বীপ। এ দ্বীপের প্রহেলিকাময় অতীত পর্যটকদের কাছে টানে। কুটা মাশুরির উত্তরে আরেক লৌকিক কাহিনীর স্থান গড়ে উঠেছে। এর নাম লেক অব প্র্যাগনেন্ট মেইডান অর্থাৎ কুমারী মাতার বিল। কথিত আছে শত শত বছর আগে এক পরীর পছন্দ হয়েছিল পার্থিব পুরুষকে। কুমারী পরীর গর্ভে জন্ম নেয় আধা হুর আর আধা মানুষ এক সন্তান। কিন্তু জন্মের কিছুক্ষণ পরই শিশুটি মারা যায়। পরী দেশের রাজকন্যা ব্যথিত হয়ে মৃত সন্তানকে এই বিলের জলে ভাসিয়ে দেয়। মর্ত ত্যাগ করার আগে ঐ রাজকন্যা পরী বলে যায় যে, বন্ধ্যা নারীরা এই লেকের জলে স্নান করলে তারা গর্ভধারণ করতে সক্ষম হবে। আজো এই রীতি লাংকাউই তে চলে আসছে। প্রতিদিন ডজন ডজন বন্ধ্যা নারী এখানে স্নান করতে আসে সন্তান কামনায়। এ সব দেখে আধা ঘন্টার মধ্যে পৌঁছে গেলাম প্রথম সমুদ্র সৈকতে। একেবারেই গ্রামের ভেতর দিয়ে ঢুকে গেলাম সৈকতে। যে রাস্তায় এলাম তার চারপাশে রাবার ট্রি ফার্ম। রাবার শিল্প লাংকাউই-এর প্রধান ব্যবসা। দ্বীপ জুড়েই মানুষের সংখ্যা বড়ো কম। পায়ে হেঁটে চলা মানুষ রাস্তায় খুবই কম। ড্রাইভার কাম গাইড আমাকে বললো এখানকার সব বাড়িতেই অন্তত: একটি মোটর সাইকেল আছে। কোন কোন পরিবারে চার পাঁচটি মোটর বাইকও আছে। বাচ্চারা স্কুলে যায় বাই সাইকেলে। নিরাপদ রাস্তা-ঘাট। গাড়ী ঘোড়ার সংখ্যা নিতান্তই কম। দ্বীপময় ঘুরে বেড়ায় শুধু পর্যটকদের বহর। সৈকতের পাশেই ছোট্ট বাজার। বলা যায় একটা শুঁটকি মাছের বাজার। এতো বড় শুঁটকি মাছের আড়ত কিন্তু তেমন কোন উৎকট গন্ধ নেই। আস্ত সামুদ্রিক মাছের শুঁটকি থেকে শুরু করে কাচকি মাছের শুঁটকি সব পাওয়া যায়। লাংকাউই এর শুঁটকি ব্যবসা জমজমাট। রাস্তাঘাটে শুঁটকির ভ্যান গাড়ী ঘুরে বেড়ায়। দাম কম বলে আমার বৌ চন্দনা এক সাথে কম করে হলেও আট দশ কেজি কাচকি মাছের শুটকি কিনে ফেললো। দাম এতো আকর্ষণীয় যে, শুধু আমার বৌ কেন যে কোনদিন শুঁটকি খায়নি সেও যদি এমন কম দামে এতো ভাল শুঁটকি পায় তবে তারও কিনে নিয়ে কাউকে গিফট দিতে ইচ্ছে করবে। চলে এলাম সৈকতে। অবাক বিস্ময়ে চেয়ে থাকি সৈকতের রং-এর দিকে। পুরো সৈকতটি কালো রং-এর। বালির রং কালো। পাথরও কালো। তাই সৈকতের নাম ব্ল্যাক স্যান্ড বীচ। মালয়ি ভাষায় এই বীচকে বলা হয় পাসির হিটাম বীচ। কেন এই বীচের রং কালো তা নিয়েও লিজেন্ড আছে। এখানে লেখা আছে বহুকাল আগে জলদেবীর কাছে এখানকার জেলেরা একটা ওয়াদা করেছিল। কিন্তু বার বার তাগাদা দেয়া সত্ত্বেও তারা ঐ ওয়াদা পূরণ করেনি। তাই ক্ষুব্ধ জলদেবীর অভিশাপে জেলেদের সব ঘরবাড়ী পুড়ে যায় এবং সৈকতের বালিতে লেগে যায় আগুন। তাই আজও এই সৈকতের রং কালো। তবে ভূ-তাত্ত্বিকরা বলেন এই সৈকতের বালিতে টারমুলিন, ইলমেনাইট ও জিরকনের পরিমাণ বেশি। এই তিনটি যৌগ একত্র হওয়ার জন্য এখানকার সৈকতের রং কালো। এরপর আরো তিনটি সৈকত দেখে আবার হোটেল পানে যাত্রা। আজকের মতো এখানেই শেষ।
হোটেলে ফিরলাম বিকেল সাড়ে তিনটায়। আমাদের হোটেলের উল্টো দিকের ওয়ারং রেস্টুরেন্ট থেকে লাঞ্চ সারলাম। দুপুরে ঘুমালেই সময় অপচয়। বিদেশে এলে কম সময়ে যতো বেশি দেখা যায় ততই ভাল। চন্দনা সকালে কূয়া শহরে দেখে এসেছে আকর্ষণীয় বিলিয়ন মার্কেট। সে সেখানে যাওয়ার জন্য উদ্গ্রীব। তাকে উস্কে দিচ্ছে সুদি আর অনি। এখানে ট্যাক্সি পাওয়া দুষ্কর। হোটেল লবিতে বলা মাত্র কোত্থেকে এক ক্যাব এসে হাজির হলো মুহূর্তে। ছুটলাম বিলিয়ন মার্কেটের দিকে। পাহাড় আর সাগরের সাথে লুকোচুরি খেলতে খেলতে পৌঁছে গেলাম কূয়া শহরে। বিলিয়ন মার্কেটে ঢুকেই বুঝতে পারলাম বিলিয়নিয়ার না হলেও বিলিয়ান মার্কেট থেকে কেনাকাটা করা যাবে। চন্দনা চা, কফি থেকে শুরু করে কসমেটিক সবকিছু কিনলো এখান থেকে। পুরো লাংকাউই ডিউটি ফ্রি জোন। তাই দাম আকর্ষণীয়।
মার্কেটিং করে আর শহর ঘুরে রাত ন’টায় ফিরছি হোটেলের দিকে। চারদিক মহাশূন্যের মতো সুনশান। সাগরের পাশ দিয়ে সাপের মতো এঁকেবেঁকে চলে গেছে রাস্তা। কোথাও কোথাও ভূতের মতো দাঁড়িয়ে আছে সারি সারি পাহাড়। শহর থেকে হলিডে ভিলা রিসোর্ট এক ঘন্টার পথ। রাস্তায় তেমন কোন গাড়ীঘোড়াও নেই, আলোও নেই। এই নির্জন পথে আমরা চারজন। সাথে অপরিচিত ড্রাইভার। বিরাণ রাস্তা দিয়ে ফেরার সময় আমার মনে হয়েছিল এই ড্রাইভার যদি ইচ্ছা করে যে সে এই নির্জন প্রান্তরে আমাদেরকে খুন করে লাশ সমুদ্রে কিংবা পাহাড়ের গুহায় লুকিয়ে রাখবে তবে তা খুব কঠিন কাজ হবে না। বন্দুকের গুলির শব্দও কোন মানুষের কর্ণকুহরে প্রবেশ করবে না। অথবা সে আমাদেরকে এমন জায়গায় নিয়ে যেতে পারে যেখান থেকে আমাদের সর্বস্ব লুট করে আমাদের লাশ গুম করে ফেলা হবে অতি সহজ। আমার পকেট আর চন্দনার ভ্যানিটি ব্যাগ মিলিয়ে কম করে হলেও তিন হাজার ডলার। ভয়ে গা ছম ছম করা অস্বাভাবিক নয়। আমি আমাদের দেশের অবস্থাটা চিন্তা করতে থাকি। কোন দেশে ট্যুরিজম সেন্টার গড়ে তোলার পূর্ব শর্ত হলো নিèিদ্র নিরাপত্তা ব্যবস্থা। তা না হলে কেউ আসবে না সে জায়গায়। এশিয়ার বিখ্যাত পর্যটন কেন্দ্র থাইল্যান্ডের পাটায়াতে বিদেশী যুবক শোভরাজ খুন করেছিল এক বিদেশিনীকে। তাই পাটায়ার ব্যবসা ক’ বছরের জন্য লাটে উঠেছিল। টাইট সিকিউরিটি ছাড়া যতো ভাল দৃশ্যই থাক না কেন কোন দেশ পর্যটন ব্যবসায় ভাল করতে পারবে না। ক’ বছর আগে এক জাপানীজ যুবক এসেছিল ঢাকায় হলিডে করতে। ভোর ছ’টায় কাওরানবাজার এলাকায় জগিং করতে যেয়ে পেটে ছুরিকাঘাত এবং মানিব্যাগ লুট। এমন দেশে কখনও পর্যটক আসে? রাত দশটার দিকে নির্বিঘেœ পৌঁছে গেলাম হলিডে ভিলাতে। নিশ্চয়ই এখন ডিনার খাওয়ার সময়। কেউ আর বাফেট ডিনার খেতে পছন্দ করলো না। ফেরার পথে তুলসী নামে একটি ইন্ডিয়ান রেস্টুরেন্ট চোখে পড়েছে। দূর খুব বেশি নয়। হেঁটে গেলে বড়জোর পনের মিনিট। নির্জন রাস্তায় হেঁটে চলে এলাম তুলসী হোটেলে। এসেই দেখা হলো হোটেল বয় কালামের সাথে।
মাত্র ক’দিন আগে সে পেনাং থেকে লাংকাউই এসেছে। শহর হিসেবে পেনাং এর সাথে লাংকাউই-এর কোন তুলনাই চলে না। পেনাং মালয়েশিয়ার টিপটপ শহর। আর লাংকাউই নির্জন দ্বীপ। এখানে বড়জোর সাত দিন একনাগাড়ে থাকা যায়। এরচেয়ে বেশি নয়। তাই জানতে ইচ্ছা করলো কেন সে পেনাং থেকে এখানে চলে এলো। সে বললো তার কাছে কোন বৈধ কাগজপত্র নেই। ভিসার মেয়াদ শেষ। পেনাং-এ অবৈধভাবে থাকা বিপজ্জনক। তাই চলে এসেছে সে এই নির্জন দ্বীপে ভাগ্যান্বেষণে। সকাল আটটা থেকে রাত একটা পর্যন্ত ডিউটি। বেতন ৮০০ রিংগিত অর্থাৎ ষোল হাজার টাকা। এক লক্ষ ষাট হাজার টাকা খরচ করে সে মালয়েশিয়া এসেছে টাকা রোজগার করতে। এতো কষ্ট করে মাসে রোজগার ষোল হাজার টাকা। বিয়ের এগার দিন পর বৌকে একা ফেলে কালাম এসেছে মালয়েশিয়া। গত দেড় বছরে বৌ’র সাথে যোগাযোগ শুধু কালেভদ্রে টেলিফোনে। রাত তখন বারোটা। হঠাৎ শুরু হলো বজ্রপাতসহ বৃষ্টি। রেস্টুরেন্ট থেকে ট্যাক্সি ক্যাব ডেকে দিল। স্বাভাবিক ভাড়া পাঁচ রিংগিত। আমাদের দেশ হলে ড্রাইভার যেতেই চাইতো না। অথবা সে এমন ঢং করতো যেন সে এই ঝমঝম বৃষ্টিতে আমাদেরকে লিফট দিয়ে কৃতার্থ করেছে। তারপর ভাড়া হাঁকতো তিনচার গুণ। কারণ তখন যা চাইবে আমরা তা দিতে বাধ্য। হোটেলে এসে ড্রাইভারের কাছে ভাড়া জানতে চাইলাম। সে মিটার দেখিয়ে পাঁচ রিংগিতই চাইলো। এক রিংগিতও বেশি দাবী করলো না। মনে মনে ভাবি এরা জাতে মালয়ি কিন্তু আদব কায়দায় ইউরোপীয়। মালয়েশিয়ার উন্নতি ঠেকায় কে? একটা জাতি যদি সৎ ও কর্মঠ হয় তবে তাদের উন্নতি আটকে রাখা যায় না। ডা: মাহাথির মোহাম্মদ তা প্রমাণ করে দিয়েছেন।
তিন দিন লাংকাউই ভ্রমণ করে আজ চলে যাচ্ছি কুয়ালালামপুর। আমাদের ফ্লাইট বিকেল চার টায়। কিন্তু আমার মাথা থেকে মাশুরির লিজেন্ড এখনও দূর হয়নি। যে কীরিচ দিয়ে মাশুরিকে হত্যা করা হয়েছে তা রক্ষিত আছে তামান কীরিচ নামক জায়গায়। জেনে নিয়েছি জায়গাটি এয়ারপোর্ট সংলগ্ন। তাই প্ল্যান করে রেখেছিলাম ফেরার সময় দেখে যাব ঐ মনুমেন্টটি। হোটেল থেকে চেক আউট করলাম দুপুর বারোটার দিকে। তারপর চললাম তামান কীরিচ।
এক সময় রাস্তায় তামান কীরিচ নামের অ্যারো সাইন দেখতে পেলাম। বুঝা গেল পৌঁছে গেছি গন্তব্যে। তামান কীরিচ একেবারেই জনশূন্য এলাকা। শুধু মাশুরির স্মৃতিসৌধ ছাড়া আশপাশে আর তেমন কিছু নেই। যে গাছের সাথে বেঁধে মাশুরিকে হত্যা করা হয়েছিল তার গোড়াটি বাঁধাই করা আছে। কীরিচের আদলে গড়ে তোলা হয়েছে মনুমেন্ট। আমাদের ড্রাইভারটি বললো মূল কীরিচটি এই মনুমেন্টের ভেতর প্রোথিত করে রাখা হয়েছে। আমরা চারজন ঘুরেফিরে বেশ কিছুক্ষণ মাশুরির প্রাণদণ্ড কার্যকরের স্থানটি দেখলাম। সুদি আর অনি মাশুরির স্মৃতিকে ধরে রাখার জন্য বেশ কিছু ছবি তুলে নিলো। দুইশত বছরের পুরনো হলেও মাশুরির জন্য দুঃখ হলো। যে সময় মাশুরিকে মৃত্যুদণ্ড দেয়া হয় তখন সে ছিল দ্বিতীয় বারের মতো গর্ভবতী। নিজের জন্য নয় অনাগত সন্তানের জন্য প্রসব পর্যন্ত প্রাণদণ্ড স্থগিত রাখার অনুরোধ করেছিল মাশুরি। কিন্তু অন্য নারী মোহরা তাতে কর্ণপাত করেনি। গর্ভবতী নারীর প্রাণদণ্ড কার্যকর করা হয় এখানে নির্মমভাবে। মাশুরির মৃত্যুর পর পরই পুরো লাংকাউই এর শস্যক্ষেতে আগুন লেগে যায়। সেই পুড়ে যাওয়া ধান এখনো মিউজিয়ামে রক্ষিত আছে। মাশুরিকে হত্যার বছরেই রাজাও তার স্ত্রী মোহরা লাংকাউই থেকে বিতাড়িত হয়। ঐ বছরই সিয়ামিজ (থাই) রা লাংকাউই দখল করে নেয়। ১৯৮০ সালে মাশুরি বংশের সপ্তম জেনারেশনের নবজাতক আছিয়া নোয়াই লাংকাউই-এর মাটিতে পদার্পণ করে এ ভূমিকে অভিশাপমুক্ত করে আবার থাইল্যান্ডে চলে যায়। কারণ তারা আর লাংকাউইতে স্থায়ীভাবে থাকতে চায়নি। কিন্তু ২০০১ সালে মালয়েশিয়ার প্রধানমন্ত্রী মাহাথির মোহাম্মদের অনুরোধে মাশুরির পরিবারের সদস্যরা স্থায়ীভাবে লাংকাউইতে ফিরে আসে। ২০০১ সালের মার্চ মাসে প্রধানমন্ত্রী দ্বীপব্যাপী অনুষ্ঠান করে নিজে মাশুরির পরিবারকে বরণ করে নেন। এরপর থেকে লাংকাউইকে আর পেছনে ফিরে তাকাতে হয়নি।
মাশুরি বিনতে পানডাক মায়ার কাহিনীটি মালয়িরা পুরোপুরি বিশ্বাস করে। তাদের কাছে মাশুরি কোন ভোজবাজি, অলীক কিংবা কাল্পনিক আখ্যান নয়, এটি বাস্তব সত্য কাহিনী।
মাশুরির জন্য দু’ ফোঁটা চোখের জল ফেলে চলে এলাম এয়ারপোর্ট। ফিরে যাচ্ছি কুয়ালালামপুর। তিন দিন এই লৌকিক উপাখ্যানের দেশে থেকে যা হৃদয় দিয়ে অনুভব করে গেলাম তা লাংকাউই না গেলে অন্যকে বুঝানো যাবে না। আমার এই ভ্রমণ কাহিনী পড়ে কেউ যদি লাংকাউই-এর রূপ-গন্ধ-বর্ণ-স্বাদকে অন্বেষণ করতে চান তবে তা হবে প্রায় অসম্ভব। লাংকাউই না যেয়ে তাকে অনুভব করার বিষয়টি হবে কমলালেবুর পরিবর্তে ভিটামিন-সি খাওয়ার মতো স্বাদহীন।
স্পার্ক অভ লাইফ; মূল: এরিক মারিয়া রেমার্ক; অনুবাদ: বুলবুল সরওয়ার
স্পার্ক অভ লাইফ
মূল: এরিক মারিয়া রেমার্ক
অনুবাদ: বুলবুল সরওয়ার
ধীরে ধীরে চোখ মেলে তাকাল ৫০৯। সে কি অজ্ঞান হয়ে গিয়েছিল, না শুধু ঘুমিয়ে পড়েছিল? দুটোর ভিতর এখন আর কোন তফাত নেই। ক্ষুধা আর ক্লান্তি অনেকদিন আগেই সে পার্থক্য মুছে দিয়েছে। দুই-ই যেন সিন্দাবাদের দৈত্যের জলা; ওঠা যায় না।
৫০৯ কিছুক্ষণ স্থির কান পেতে সিন্দাবাদের দৈত্যের গর্তে শুয়ে থাকে। ক্যাম্পের পুরানো নিয়মঃ কোন্ দিক থেকে বিপদ আসবে কেউ জানে না বলেই নড়াচড়া না করে যতক্ষণ পারা যায় ততক্ষণ মৃতের মত পড়ে থাকো। প্রকৃতির এই সহজ নিয়মটা সব পোকারও জানা।
সন্দেহজনক কিছু সে শুনতে পেল না। সামনের মেশিনগানাররা আধা-ঘুমন্ত, পিছন দিকেও সব চুপচাপ। সতর্ক ঘাড় ঘুড়িয়ে পিছন দিকে তাকায় সে।
রোদে নিশ্চিন্তে ঝিমেচ্ছে মেলার্ন কনসেনট্রেশন ক্যাম্প। নাম-ডাকার বড় মাঠটা ফাঁকা। এস.এস১ কর্মীরা রসিকতা করে ওটার নাম দিয়েছে নাচের মাঠ। গেটের ডান দিকের কাঠের মজবুত খুঁটিগুলো থেকে চারজন মানুষ শুধু ঝুলছে। তাদের হাতদুটো পিছমোড়া করে বাঁধা। দড়িতে বেঁধে এমন উঁচুতে টাঙানো হয়েছে, যাতে তাদের পা-দু’টো আর মাটিতে না ঠেকে। তাদের হাতের কব্জি সরে গেছে। ক্রিমেটারিয়ামের জানালা থেকে দুজন স্টোকার তাদের দিকে ছোট ছোট কয়লার টুকরো ছুঁড়ে দেখছে চার জনের কেউ নড়ে কিনা। আধ ঘন্টা ধরে ওরা বাতা থেকে ঝুলছে। এখন চেতনাও লুপ্ত ।
লেবার ক্যাম্পের ব্যারাকগুলো ফাঁকা। যেসব মজুর যেসব বাইরে গেছে তারা এখনও ফেরেনি। যাদের ডিউটি ঘরে, তাদের দু-চার জন মাঝে-মাঝে গুটিশুটি রাস্তা পার হচ্ছে। ফটকের বাঁ দিকে, শাস্তি দেবার বাঙ্কারের সামনে এস-এস স্কোয়াড লীডার ব্রয়ের বসে আছে। গোলটেবিলের সামনে একটা বেতের চেয়ারে। এক পেয়ালা কফি নিয়ে বসে আছে সে। ১৯৪৫-এর বসন্তকালে আসল কফি খুবই দুর্লভ ; কিন্তু একটু আগেই দুজন ইহুদিকে সে গলা টিপে শেষ করে এসেছে। দেড় মাস ধরে ওই দুজন বাঙ্কারে পচছিল। এই অসামান্য কাজের জন্যে একটা পুরস্কার ওর অবশ্যই প্রাপ্য বলে ও মনে করে। রসুইখানা থেকে কাপো২ কফির সঙ্গে এক প্লেট ময়দার কেকও পাঠিয়েছে। ধীরে ধীরে তারিয়ে তারিয়ে কেকটা খাচ্ছে ব্রয়ের; বিশেষ করে দানাহীন কিসমিস সে খুবই পছন্দ করে। কেকটা সেই মজাদার কিসমিসে ঠাসা। বয়স্ক ইহুদিটার মৃত্যু থেকে বেশি মজা সে পায়নি, কিন্তু ছোকরা ইহুদিটা বেশ শক্তসমর্থ ছিল; বেশ কিছুক্ষণ ওটা পা ছুঁড়েছে আর চিৎকার চেঁচামেচি করেছে। ব্রয়ের হাসিমুখে ঝিমুতে থাকে আর ক্যাম্পের বাজনাদারদের রেওয়াজের ছাড়া-ছাড়া সুরগুলো শুনতে থাকে। অর্কেস্ট্রাতে ‘দক্ষিণ দেশের গোলাপ’ জ্যাজ সুরটা বাজছিল। ঝটিকাবাহিনীর অধিনায়ক নয়েবাউয়েরের প্রিয় সুর ওটা।
ক্যাম্পের বিপরীত দিকে মুখ করে ৫০৯ শুয়েছিল। কাছেই অনেকগুলো কাঠের ব্যারাক। বড় লেবার-ক্যাম্প থেকে কাঁটাতারের বেড়া দিয়ে সেগুলো আলাদা করা। এগুলোকে বলা হয় ছোট ক্যাম্প। যে সব কয়েদি এতই দুর্বল যে কাজও করতে পারে না, তারা এখানে থাকে। বেশির ভাগই তাড়াতাড়ি মারা যায়, কিন্তু সব কয়েদি মারা যাবার আগেই নতুন কয়েদিদের ভিড় লেগেই থাকে। মুমূর্ষু কয়েদিদের বারান্দায় গাদাগাদি করে রাখা হয়, নয়তো বাইরে। খোলা জায়গাই অনেকে মারা যায়।
মেলার্নেতে গ্যাস-চেম্বার নেই। ব্যাপারটা নিয়ে অধিনায়কের বিশেষ গর্ব আছে। মেলার্নেতে লোকের স্বাভাবিক মৃত্যু হয়- এ কথা ব্যাখ্যা করতে তার ভালো লাগে। ছোট ক্যাম্পকে সরকারীভাবে বলা হয় ‘করুণা বিভাগ’। যদিও সেই করুণা এক থেকে দুই সম্পাহের বেশি প্রতিরোধ করতে পারে এমন কয়েদির সংখ্যা হাতে-গোনা। এই শক্ত মানুষদের ছোট্ট দলটিই বাইশ নম্বর ব্যারাকে থাকে। তিক্ত রসবোধ থেকে এরা নিজেদের নাম দিয়েছে ‘প্রবীণ’। ৫০৯ এদেরই একজন। ছোট ক্যাম্পে তাকে আনা হয়েছে চার মাস আগে। সে যে এখনও বেঁচে আছে, ব্যাপারটা তার নিজের কাছেও অলৌকিক বলে মনে হয়।
ক্রিমেটারিয়াম থেকে কুণ্ডলী পাকিয়ে ধোঁয়া উঠছে। বাতাসের চাপে বাষ্পটা নিচে নেমে এসে ব্যারাকগুলোকে ঢেকে ফেলছে। মিষ্টি তেল-তেল গন্ধে বমি আসে। ক্যাম্পে দশ বছর বাস করেও ৫০৯ এটার সঙ্গে নিজেকে মানিয়ে নিতে পারেনি। দুজন প্রবীনের অবশিষ্টাংশ আজ ওখান দিয়ে বেরুবে। ঘড়ি-নির্মাতা ইয়ান সিবেলস্কি আর বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক জোয়েল বুক্স্বাউম অবশ্য আস্ত ছিল না- তিনটে আঙ্গুল, সতেরোটা দাঁত, পায়ের নখগুলো আর জনন-অঙ্গের বেশ খানিকটা আগেই খুইয়েছে তারা। ‘কাজে লাগার মতো মানুষ’ হয়ে ওঠার শিক্ষায় শিক্ষিত হওয়ার সময় ওগুলো হারিয়েছে তারা। জনন-অঙ্গের বিষয়টা এস. এস কোয়ার্টারের সান্ধ্য-আসরে খুবই হাসির খোরাক জুগিয়েছিল। ক্যাম্পে নবাগত স্কোয়াড লীডার গান্থার স্টাইনব্রেনারের মাথায় এসেছিল ব্যাপারটা। যাবতীয় বড় বড় আবিষ্কারের মতো এই ব্যাপারটাও খুবই সহজ শুধু একটু বেশি মাত্রার গাঢ় হাইড্রোক্লোরিক ইন্জেকশন দেয়া, আর কিছু নয়। এটা দিয়ে সঙ্গীদের চোখে সঙ্গে সঙ্গে সমীহ আদায় করেছিল স্টাইনব্রেনার।
মার্চ মাসের বিকেল। রোদটা এর মধ্যেই কিছুটা গরম হয়ে উঠেছে। তা সত্ত্বেও ৫০৯-এর শীত করছে- যদিও নিজের জামাকাপড় ছাড়াও ওর গায়ে রয়েছে আরও তিনজনের পোশাক; জোসেফ বুচারের জ্যাকেট, পুরানো কাপড়ের প্রাক্তন ব্যবসায়ী লেবেন্থালের ওভারকোট, আর জোয়েল বুক্স্বাউমের ছেঁড়া সোয়েটারটা। তাদের মৃতদেহ চালান করে দেয়ার আগে ব্যারাকের লোকেরা সেগুলো সরিয়ে রেখেছিল। কিন্তু পোশাক ছ-ফুটের চেয়ে কম লম্বা, আর আশি পাউণ্ডের কম ওজনের কোন মানুষকে সম্ভবত তিন-প্রস্থ পোষাকেও যথেষ্ট উত্তাপ দেয় না।
রোদে আধঘন্টা শুয়ে থাকার অধিকার ৫০৯-এর ছিল। তারপর তাকে ফিরে আসতে হবে, ধার-করা পোশাক-সমেত নিজের জ্যাকেটটাও দিয়ে দিতে হবে; এবার অন্য আর এক জনের পালা। শীত চলে যাওয়ার পর থেকে প্রবীণেরা নিজেদের মধ্যে এই ব্যবস্থা করেছে। কারও কারও এই ব্যবস্থার আর দরকার নেই। তারা খুবই মুমূর্ষু হয়ে পড়ছে, শীতের কষ্টটার পর ব্যারাকের মধ্যে শুধু নিশ্চিন্তে মরতে চায়। কিন্তু রুম-সিনিয়র (কক্ষ-অধ্যক্ষ) বার্জারের ইচ্ছা- এখনও যারা হামাগুড়ি দিতে পারে, তারা যেন বাইরের খোলা হাওয়ায় কিছুক্ষণ কাটায়। পরের পালা ওয়েস্টহফেল এবং বুচারের। লেবেন্থাল যাবে না, তার হাতে আরও দামী কাজ।
৫০৯ পাশ ফেরে। ক্যাম্পটা পাহাড়ের উপর। কাঁটাতারের ফাঁক দিয়ে শহরটা এবার সে দেখতে পায়। উপত্যকায়, ক্যাম্পের থেকে অনেক নিচে, স্পষ্ট আলোয় শহরটা দাঁড়িয়ে আছে। ছাদের পর ছাদ, তাদের ছাপিয়ে গির্জাগুলোর বুরুজ। পুরোনো শহর, অনেক গির্জা আর প্রাকার। মাথায় মাথায় ঠেকে গেছে লাইম গাছ, নিচ দিয়ে রাস্তা, আঁকাবাঁকা গলি। আধুনিক অংশটা গড়ে উঠেছে উত্তর দিকটায়। সেদিকের রাস্তাগুলো আরও চওড়া। সেদিকে আছে মেইন রেলস্টেশন, শ্রমিক বস্তি, কারখানা এবং তামা ও লোহার ফাউণ্ড্রিতে লেবার ক্যাম্পের মজুরেরা সেখানে কাজ করে। চওড়া বাঁক নিয়ে একটা নদী শহরের ভিতর দিয়ে চলে গেছে। নদীর বুকে সেতু আর মেঘের ছায়াগুলো যেন পরে পরে ঘুমোয়।
৫০৯-এর মাথাটা ঝুলে পড়ল। অল্প সময়ের জন্যই ঘাড়টা সে সোজা রাখতে পারে। ঘাড়ের পেশীগুলো শুকিয়ে গেলে মাথাটা ভারী হয়ে যায় আর উপত্যকার চিমনিগুলো থেকে ধোঁয়া বেরুতে দেখলে খিদেটাও বেড়ে ওঠে। খিদেটা কেবল পেটের মধ্যেই নয় যেন মাথায় ধাক্কা মারে। অনেক বছর ধরে পেটের খিদেটা মরে গেছে, একটা অস্পষ্ট লোভ ছাড়া আর কোন অনুভূতিই পেটটার নেই। মাথার খিদে কিন্তু আরও খারাপ; এতে সব মিথ্যা জেগে ওঠে; কিছুতেই সেগুলো তাড়ানো যায় না। ঘুমের ভিতরেও সেগুলো কুরে-কুরে খায়। এবারের শীতকালে আলুভাজার ছবিটা ৫০৯-এর মনে তিন মাস লেগেছিল। যেখানেই যায়, সেখানেই আলুর গন্ধ; এমন কি পায়খানার দুর্গন্ধের মধ্যেও। এখন সে বেকনের গন্ধ পাচ্ছে। বেকন আর ডিম।
কাছেই মাটির উপর নিকেলের ঘড়িটা রয়েছে। সেটার দিকে তাকায় ৫০৯। লেবেন্থাল ওকে সেটা ধার দিয়েছে। ব্যারাকে একটা অমূল্য সম্পদ এটা। পোল্যাণ্ডের বাসিন্দা জুলিয়াস সিলবার মারা গেছে অনেক দিন আগে। বহু বছর আগে সে এটাকে গোপনে ক্যাম্পে আমদানি করেছিল। ৫০৯ দেখল, এখনও তার হাতে দশ মিনিট আছে। তা সত্ত্বেও ক্যাম্পে ফিরে যাওয়াই সে স্থির করল। আবার ঘুমিয়ে পড়ার ইচ্ছা তার নেই। ঘুমিয়ে পড়লে আবার জাগবে কিনা তার ঠিক নেই। ক্যাম্পের প্রধান সড়কটার দিকে আর একবার সে সতর্ক দৃষ্টি ফেলল। বিপদ ঘটার মতো এবারেও কিছু চোখে পড়ল না। সেটা সে আশঙ্কাও করেনি। ক্যাম্পের পুরোনো লোকের কাছে সতর্কতাটা বাস্তব ভয়ের থেকেও বেশি অভ্যাসের ব্যাপার।
পেটের অসুখের কারণে ছোট ক্যাম্পটা এক ধরনের পৃথকীকরণ ব্যবস্থা চালু আছে। এস-এস’রা কদাচিৎ সেখানে ঢোকে। তাছাড়া, যুদ্ধের বছরগুলিতে গোটা ক্যাম্পটাতেই খবরদারির ব্যাপারটা রীতিমতো শিথিল হয়ে পড়েছে। যুদ্ধটা বেশি ঘোরালো হয়ে উঠলে ঝটিকাবাহিনীর যে সব প্রহরী এতদিন কেবল বন্দীদের উপর বীরত্ব ফলিয়ে আর হত্যা করে আসছিল? তাদের যুদ্ধক্ষেত্রে পাঠিয়ে দেয়া হয়েছে। আগে ক্যাম্পে ঝটিকাবাহিনীর যত সৈন্য থাকত, এখন ১৯৪৫’র এই বসন্তে তার সংখ্যা এক-তৃতীয়াংশে নেমে গেছে। ইদানীং অভ্যন্তরীণ প্রশাসন-ব্যবস্থাটা প্রায় পুরোপুরি কয়েদিদেরই হাতে। প্রত্যেক ব্যারাকে একজন ব্লক-সিনিয়র আর কয়েকজন রুম-সিনিয়র আছে; মজুর দলগুলো কাপো আর ফোরম্যানের অধীনে আর, গোটা ক্যাম্পটা ক্যাম্প-সিনিয়রের অধীনে। সকলেই কয়েদি। ক্যাম্পলীডার, ব্লক-লীডার আর গ্যাঙ-লীডাররা এদের নিয়ন্ত্রণ করে। তারা হল ঝটিকাবাহিনীর লোক। প্রথম দিকে ক্যাম্পে ছিল শুধু রাজনৈতিক বন্দী। তারপর বছরের পর বছর ধরে শহর আর শহরতলির জেলগুলো থেকে সাধারণ অপরাধীরা আসতে থাকল। এদের আলাদা করে চেনার জন্য পোশাকের উপর বিভিন্ন রঙের কাপড়ের ত্রিভুজ সেলাই করে দেয়া হত। সমস্ত কয়েদিদের ক্ষেত্রেই এই ব্যবস্থা। রাজনৈতিক বন্দীদের ত্রিভুজের রঙ লাল, গুণ্ডা বদমাশদের সবুজ। ইহুদিদের থাকত আরও একটা ত্রিভুজ, হলুদ রঙের; ফলে দুটো মিলে ইহুদিদের ধর্মীয় প্রতীক ‘ডেভিডের তারা’ হয়ে উঠত। লেবেন্থালের ওভারকোট আর জোসেফ বুচারের জ্যাকেটটি খুলে ৫০৯ নিজের পিঠে ফেলল, তারপর ব্যারাকের দিকে গুড়ি মেরে এগিয়ে যেতে শুরু করল। স্বাভাবিকের থেকে বেশি ক্লান্ত হয়েছে সে। এমন কি হামাগুড়ি দিতেও কষ্ট হচ্ছে তার। অল্প পরেই তার পায়ের তলার মাটিটা দুলতে থাকল। থেমে গিয়ে, চোখ বুঁজে সে লম্বা-লম্বা শ্বাস নিতে থাকে। ঠিক সেই সময়েই শহর থেকেই সাইরেনের আওয়াজ ভেসে সে।
প্রথমে দুটো আওয়াজ। কয়েক সেকেণ্ড পরেই আরও অনেকগুলো। তারপরেই মনে হল গোটা শহরটা যেন চেঁচিয়ে উঠছে। ছাদের উপর থেকে, রাস্তাগুলো থেকে, বুুরুজগুলো থেকে, কারখানাগুলো থেকে আর্তনাদ। রোদে শুয়ে রয়েছে শহরটা, কিছুই সেখানে নড়াচড়া করছে না। অথচ মৃত্যুর মুখে হঠাৎ পড়ে গেলে পশু যেমন পালাতে পারে না, শুধু চিৎকার করে ওঠে, সেরকম নিস্তব্ধ আকাশে সাইরেন আর স্টীমের বাঁশি আর্তনাদ করে উঠল।
৫০৯ মড়ার মতো শুয়ে পড়ল। বিমান-হামলার সাইরেন বাজলে ব্যারাকের বাইরে থাকা নিষেধ। দৌড়ানোর চেষ্টা সে করতে পারত, কিন্তু যথেষ্ট ছোটার মতো শক্তি তার নেই। আর ব্যারাকটাও অনেক দূরে। নতুন আসা কোন প্রহরী খেপে গিয়ে তার দিকে গুলি চালাতে পারে। যত তাড়াতাড়ি পারে কয়েক গজ হামাগুড়ি দিয়ে পিছিয়ে মাঠের একটা অগভীর খাঁজের মধ্যে শরীরটাকে মিশিয়ে দিয়ে ধার করা জামাগুলো দিয়ে নিজেকে ঢেকে ফেলল সে। দেখে মনে হবে কেউ যেন মরে পড়ে আছে। প্রায়ই সেটা ঘটে, কেউ তাই সন্দেহ করে না। যাই হোক, বিপদ-সঙ্কেত তো আর বেশিক্ষণ থাকবে না। গত কয়েক মাস ধরেই শহরটায় মাঝে-মাঝেই সাইরেন বেজেছে, কিন্তু কোনবারই কিছু ঘটেনি। বিমানগুলো প্রত্যেকবারেই হ্যানোভার আর বার্লিনের দিকে উড়ে গেছে।
ক্যাম্পের সাইরেনগুলোও বাজতে শুরু করল। তারপর খানিকক্ষণ পরে দ্বিতীয় বিপদ-সঙ্কেত। আর্তনাদটা বাড়তে-কমতে থাকে, যেন বিরাট আকারের গ্রামোফোনে পুরোনো ক্ষয়ে-যাওয়া রেকর্ড চলছে। বিমানগুলো শহরের দিকে এগিয়ে আসছে। ৫০৯- ও ব্যাপারটা দেখেছে। এতে তার কিছু মনে হয় না। যার ভয়ে শহরটা আর্ত চিৎকার করছে সে তার শত্রু নয়। প্রথম যে-মেশিনগানচালক ওকে দেখে বুঝবে যে ও মরেনি, সে-ই তার শত্রু। কাঁটাতারের ওপারে যা ঘটছে তাতে ওর কিছু আসে-যায় না।
অতিকষ্টে সে নিশ্বাস নেয়। কোটের নিচের বদ্ধ বাতাস যেন তার উপর ভারী হয়ে উঠেছে। তবুও গর্তটার মধ্যে সে এমনভাবে শুয়ে তাকে, যেন কবরের ভিতরে রয়েছে। ধীরে ধীরে তার মনে হয় এটাই বুঝি সত্যিকারের কবর। এখান থেকে আর কখনও সে উঠতে পারবে না। এই তার শেষ শোয়া, এখানে শুয়ে-শুয়েই তাকে মারতে হবে। যে কঠিন অবসন্নতার বিরুদ্ধে লড়াই করে সে এদ্দিন টিকে আছে তার কাছেই বুঝি শেষ পর্যন্ত সে হেরে যাচ্ছে। সে প্রতিরোধ করার চেষ্টা করতে থাকে, কিন্তু লাভ হয় না। নিজের ভিতরে যে রহস্যময় হাল ছেড়ে-দেওয়া প্রতীক্ষা তার মধ্যে ছড়িয়ে পড়ছিল সেটাই আরও বেশি করে সে অনুভব করে- যেন সব কিছুই প্রতীক্ষা করে আছে’ শহরটা প্রতীক্ষা করছে, বাতাস প্রতীক্ষা করছে, এমন কি আলোও যেন প্রতীক্ষা করে আছে। এ যেন এক সূর্যগ্রহণ; যখন চারদিকের যাবতীয় রঙ সীসার মতো বিবর্ণ হয়ে ওঠে আর দূর থেকে মৃত্যুর ইঙ্গিত পাওয়া যায়; যেন এক শূন্যতা- মৃত্যু আসবে, না আসবেনা? তারই জন্য শ্বাসরুদ্ধ প্রতীক্ষা!
আঘাতটা বড় রকমের নয়, কিন্তু অপ্রত্যাশিত। আর সেটা এল সেই দিক থেকে যেদিকটাকে বেশি সুরক্ষিত বলে মনে করেছিল। ৫০৯-এর মনে হল যেন মাটির গভীর থেকে পেটের উপর এক প্রবল ধাক্কা লাগল। সেই সঙ্গে প্রচণ্ড ইস্পাতের ঘড়ঘড় শব্দ যেন বাইরের আর্তনাদটাকে চিরে জেগে উঠল। শব্দটা দ্রুত বেড়ে উঠতে থাকে, সাইরেনের আওয়াজেরই মতো, কিন্তু সম্পূর্ণ ভিন্ন আঙ্গিকে। মাটির ভিতর থেকে ধাক্কাটা, না তারপরেই যে বিস্ফোরণ- কোনটা যে আগে হল ৫০৯ তা বুঝতে পারল না। কিন্তু এটুকু বুঝল যে আগের বিপদ-সঙ্কেতের সময় এর কোনটাই ছিল না। তারপর যখন সেটা আরও কাছে, আরও জোরে, বার বার হতে থাকল, তখন সেও বুঝল বিমানগুলো উড়ে চলে যায়নি। শহরে বোমা পড়ছে। প্রথমবারের মত।
আবার কেঁপে উঠল মাঠটা। ৫০৯-এর মনে হল মাটির নিচে থেকে ভারী রবারের মুগুর দিয়ে কেউ তাকে মারছে। হঠাৎ সে পুরো জেগে উঠল। ঝড়ের মুখে ধোঁয়ার মতো কোথায় মিলিয়ে গেছে অবসাদ। মাটির ভিতর থেকে আসা প্রতিটি ধাক্কা তার মস্তিষ্কে আঘাত করছে। কিছুক্ষণ সে স্থির হয়ে শুয়ে রইল, তারপর কি করছে না-বুঝেই, সাবধানে একটা হাত বাড়িয়ে মুখের সামনে থেকে কোটটা খানিক তুলে ধরল।
রেল স্টেশনটা যেন খেলার ছলে নিজেকে শূন্যে মেলে ধরল। সোনালী গম্বুজটা যখন শহরের পার্কের উপর দিয়ে উড়ে গেল। কি সুন্দরই না দেখতে লাগল! বিস্ফোরণের আওয়াজগুলোর সঙ্গে এর যেন কোন সম্পর্ক নেই। সবই যেন খুব ধীরে ধীরে হচ্ছে। গ্রেট-ডেন কুকুরের গম্ভীর গর্জনের মধ্যে টেরিয়ারে ঘেউ ঘেউ যেমন মিইয় যায় তেমনি বিমানধ্বংসী কামানের আওয়াজও মিলিয়ে গেল। পরের প্রচণ্ড বিস্ফোরণের সঙ্গে সঙ্গে সেন্ট ক্যাথেরিন গির্জার বুরুজগুলো বেঁকে যেতে শুরু করল। সেটাও মাটিতে পড়ল খুব ধীরে ধীরে, আর পড়তে-পড়তে কয়েক টুকরো হয়ে গেল; যেন বাস্তব নয়, একটা মন্থরগতি চলচ্চিত্র।
বাড়িগুলোর ফাঁক দিয়ে ধোঁয়ার ফোয়ারা ছাতার আকার নিতে থাকল। ধ্বংসের অনুভূতি ৫০৯-এর তখনও হয়নি। অদৃশ্য দৈত্যরা যেন খেলা করছে, আর কিছু নয়। শহরের যে-অংশটা রক্ষা পেয়েছে, সেখানের চিমনি থেকে শান্তভাবে ধোঁয়ার কুণ্ডলী উঠছে; মেঘগুলো আগের মতোই নদীর জলে ছায়া ফেলছে, আর বিমানধ্বংসী কামানের ধোঁয়ার কুণ্ডলীগুলো আকাশের ধার এমনভাবে মুড়ে দিয়েছে, যেন একটা নিরীহ কুশনের সেলাইগুলো ফেটে ধূসর-সাদা রঙের তুলোর আঁশ বেরিয়ে পড়ছে।
শহর থেকে অনেক দূরের মাঠে আরেকটা বোমা পড়ল। মাঠটা উঠে এসেছে ক্যাম্পের দিকে। তাতেও ৫০৯-এর ভয় করল না; একমাত্র যে সংকীর্ণ জগৎটুকু তার চেনা, এই সবকিছু তার থেকে অনেক অনেক দূরে। এখানের মানুষ ভয় করে চোখ আর অণ্ডকোষের উপর জ্বলন্ত সিগারেটের, উপোস-কুঠরিতে সপ্তাহের পর সপ্তাহ থাকার যেখানে না-যায় দাঁড়ানো, না-যায় শোয়া; সেই হাঁড়িকাঠের মতো যন্ত্রটার ভয়, যাতে শুইয়ে মূত্রাশয়গুলোকে থেঁতো করা হয়; ফটকের বাঁদিকের ধোলাই কামরার ভয়; স্টাইনব্রেনারের ভয়, ব্রয়রের ভয়, ক্যাম্প লীডারের ভয়। কিন্তু ছোট ক্যাম্পে ৫০৯-কে নিয়ে আসার পর থেকে এই ভয়টাও ফিকে হয়ে গেছে। বেঁচে থাকার মতো জোরের সন্ধান পেতে হলে তাড়াতাড়ি ভুলতে পারার ক্ষমতা থাকা চাই। তাছাড়া, দশ বছর মেলার্ন কনসেনট্রশন ক্যাম্পও যেন পীড়নের ব্যাপারে খানিকটা হাঁপিয়ে পড়েছে; এমন কি ঝটিকাবাহিনীর তরতাজা আদর্শবাদী লোকও কঙ্কালের উপর পীড়ন চালিয়ে-চালিয়ে এক সময় বিরক্ত হয়ে যায়। ওগুলো বেশি কিছু সহ্য করতে পারে না, আর যথেষ্ট প্রতিক্রিয়াও দেখা যায় না। কেবল যন্ত্রণা সহ্য করার উপযুক্ত শক্তসমর্থ নতুন কোন কয়েদির দল এলেই পুরোনো দেশপ্রেমের উৎসাহটা কখনও চাগিয়ে উঠে। তখন আবার রাতে সেই পরিচিত আর্তনাদ শোনা যায়, আর এস-এস স্কোয়াডগুলোকে ভরপেট আলু আর লাল বাঁধাকপি দিয়ে পর্করোস্ট খাওয়ার পর একটু বেশি প্রাণবন্ত দেখায়। যুদ্ধের দিনগুলোয় জার্মানিতে ক্যাম্পগুলো বরং বেশ দরদী হয়ে উঠেছিল। শুধু গ্যাস দেয়া হত, লাঠিপেটা করা হত আর গুলি করা হত। অথবা লোকগুলোকে খাটিয়ে অসাড় করে উপোসে মারা হত। ক্রিমেটারিয় ামে মাঝে মাঝে যে দু’একটা জীবন্ত মানুষকেও পুড়িয়ে ফেলা হত সেটা ইচ্ছে করে হত না, হত কোন কোন কঙ্কাল অনেকদিন ধরে নড়াচড়া করত না বলে। এটা কেবল তখনই ঘটত যখন পাইকারী হারে আসা নতুন কয়েদিদের জন্য জায়গা দরকার পড়ত। এমন কি মেলার্নেও? যারা কোন কাজও করতে পারত না তাদেরও খেতে না দিয়ে মেরে ফেলার কাজটা খুব বেশি হত না; ছোট ক্যাম্পে তখনও কিছু না কিছু খাদ্য পাওয়া যেত, আর তাই দিয়ে ৫০৯-এর মতো প্রাচীনরা বেঁচে থেকে নজির স্থাপন করতে পেরেছিল।
বোমাবর্ষণ থেমে যায় হঠাৎ। যদিও বিমানধ্বংসী কামানগুলো তখনও গজরাচ্ছে। ৫০৯ কোটটা আরও তুলে ধরে, যাতে সব থেকে কাছের মেশিনগানারকে সে দেখতে পায়। চৌকিটা ফাঁকা। খানিকটা ডান দিকে সে তাকায়; তারপর বাঁ দিকটায়। ওদিকটায় বুরুজগুলোতেও কোন প্রহরী নেই। সব জায়গা থেকেই এস-এস স্কোয়াডরা নেমে নিরাপদ আশ্রয় নিয়েছে; ব্যারাকের গায়েই তাদের জন্য বিমান-হামলা প্রতিরোধী আশ্রয় আছে। ৫০৯ কোটটা ছুঁড়ে ফেলে কাঁটাতারের দিকে আরও খানিকটা গুড়ি মেরে এগিয়ে উপত্যকার দিকে একদৃষ্টে তাকিয়ে রইল।
শহরের সর্বত্র আগুন। আগে যেটা খেলার মতো দেখাচ্ছিল এরই মধ্যে তা হয়ে উঠেছে আগুন আর ধ্বংস। দৈত্যকায় শামুকের মতো হলুদ আর কালো ধোঁয়া রাস্তাগুলোর উপর ঘুরে বেড়াচ্ছে আর বাড়িগুলোকে গিলে খাচ্ছে। আগুনের শিখা সর্বত্র দাউ দাউ করছে। রেলস্টেশন থেকে আগুনের ফুলকির একটা বিরাট শীষ লকলক করে উঠল। সেন্ট ক্যাথারিন গির্জার ভাঙ্গা বুরুজ জ্বলতে শুরু করেছে, আর সঙ্গে সঙ্গে বিদ্যুতের বিবর্ণ ঝিলিকের মতো আগুনের জিভগুলো লকলকিয়ে ওঠছে। কিন্তু এই সব কিছুর পিছনে সূর্যটা তার সোনালী মহিমায় দাঁড়িয়ে, যেন কিছুই হয়নি। আর নীল-সাদা আকাশটা ঠিক আগের মতোই। অরণ্য আর পর্বতের সারি শান্ত, অনাহত। যেন এক অজ্ঞাত ভীষণ বিচারে শহরটাকেই কঠোর দণ্ড দেয়া হয়েছে। গোটা দৃশ্যটাতেই এক ভৌতিক।
৫০৯ সমস্ত সতর্কতা ভুলে একদৃষ্টে নিচের দিকে তাকিয়ে থাকে। শহরটাকে সে কেবল কাঁতাতারের ফাঁক দিয়েই চেনে, কোনদিন যায়নি সেখানে। কিন্তু ক্যাম্পে যে দশটা বছর সে কাটিয়েছে?সেই দশ বছরে নিছক একটা শহর থেকেও বেশি কিছু একটা হয়ে উঠেছে ওটা।
প্রথম প্রথম এটা ছিল হারানো স্বাধীনতার অসহনীয় প্রতিরূপ। দিনের পর দিন ওর দিকে সে একদৃষ্টে তাকিয়ে থেকেছে। ক্যাম্প-লীডার হ্বেবারের এক বিশেষ আপ্যায়নের পর সে যখন আর হামাগুরি দিতেও আর পারে না সেই সময় নিশ্চিন্ত জীবনে ভরপুর শহরটার দিকে সে হিংসার চোখে তাকিয়ে থেকেছে; খুঁটি থেকে ঝুলন্ত অবস্থায় গম্বুজ আর বাড়ি ভরতি এই শহরকে সে অপলকে দেখেছে; থেঁতলানো মূত্রাশয়ের জন্য যখন তার রক্তস্রাব হচ্ছিল, বসন্তের সেই দিনগুলিতে এই শহরকে সে দেখেছে- নদীর বুকে সাদা নৌকা আর মোটরগাড়ির রাস্তা নিয়ে দাঁড়িয়ে থাকতে। এই শহরকে যখনই সে দেখেছে তখনই তার চোখ জ্বালা করেছে। সেটা এক আশ্চর্য যন্ত্রণা, ক্যাম্পের সব যন্ত্রণার ভিন্ন এক যন্ত্রণা।
এই শহরকে সে ঘৃণা করতে শুরু করে। দিন কেটে যায় অথচ শহরটা বদলায় না। এখানে যাই ঘটুক না কেন, শহরটার কিছুই যায় আসেনি তাতে। রোজকার মতই উনুনগুলো থেকে ধোঁয়া উঠেছে, ক্রিমেটারিয়ামের ধোঁয়ার ছোঁয়া তাতে লাগেনি; তার খেলার মাঠ আর পার্কগুলোতে লোকের ভিড়, অথচ এখানে গ্রীষ্মের ছুটির দিনে খুশিতে ভরপুর মানুষ বনে বনে ঘুরে বেড়াচ্ছে, আর পাথরের খাদ থেকে ফেরার সময় কয়েদিদের সারি তাদের মৃত আর খুন হওয়া সঙ্গীদের টানতে টানতে বয়ে আনছে ক্যাম্পে। এই শহরকে ও ঘৃণা করে, কারণ সে জানে, শহরটা তাকে ও অন্যান্য কয়েদিদের চিরকালের জন্য ভুলে গেছে।
শেষ পর্যন্ত এই ঘৃণাও মরে গেছে। একটুকরো রুটির জন্য মারামারি অন্য সব কিছুর থেকে বেশি দরকারী হয়ে পড়লে ঘৃণা আর স্মৃতিও যে মিলিয়ে যেতে পারে এই জ্ঞানটাও অর্জিত হলো। নিজেকে গুটিয়ে রাখতে, ভুলে যেতে, এবং প্রতিটি মুহূর্তে অস্তিত্ব রক্ষা ছাড়া বাকী সব বিস্মৃত হতে শিখেছিল ৫০৯। শহরটার সম্বন্ধে সে নিস্পৃহ হয়ে উঠল, আর মনটা এমন বিষন্নতায় স্থির হল যে তার ভাগ্য আর কোনদিন বদলাবে না।
সেই শহরটা এখন জ্বলছে। ৫০৯ বুঝতে পারে তার হাত কাঁপছে। কাঁপুনিটা সে থামাতে চেষ্টা করে, কিন্তু পারে না; বরং আরও বেড়ে ওঠে। তার ভিতরের সব কিছু শিথিল হয়ে গেছে, যেন সংযোগ নেই একটার সঙ্গে অন্যটার। তার মাথা ব্যথা করে, আর বুকের ভিতরে কেউ ঢাক বাজায়।
৫০৯ চোখ বোঁজে। সে চায়নি তার মধ্যে আবার কিছু জেগে উঠুক। সমস্ত আশা সে কবরচাপা দিয়েছিল। হাতদুটো সে মাটিতে পড়ে যেতে দেয়, তারপর মুখটা রাখে হাতদুটোর উপর। শহরটা নিয়ে তার কোন মাথাব্যথা নেই। তাকে নিয়েও শহরের যেন কোন মাথাব্যথা না থাকে, এটাই সে চায়। আগেকার মতোই নিস্পৃহ থেকে সে চায় যে, পচা পার্চমেণ্টের মতো যে-চামড়াটা তার মাথাটাকে ঢেকে রেখেছে. তার উপর রোদ পড়ুক। সে চায় নিশ্বাস নিতে, উকুন মারতে।
কিন্তু না, সে পারে না। ভিতরের কাঁপুনিটা থামে না তার। সে চিত হয়ে টান-টান শুয়ে পড়ল। উপরের আকাশে এখনো বিমান-ধ্বংসী কামানের গোলার ছোট ছোট ধোয়ার কুণ্ডলি। ধোয়াগুলো দ্রুতই বাতাসের সঙ্গে ভেসে চলে যায়। কিছুক্ষণ শুয়ে থাকার পরআকাশটাকেও আর সহ্য হয় না। মনে হয় তার আকাশটা যেন নীল আর সাদা অতল গহ্বর, আর সে সেখানে উড়ছে। সে উঠে বসে। শহরটার দিকে না তাকিয়ে সে চেয়ে থাকে ক্যাম্পের দিকে। আর এই প্রথম বার যেন সেখান থেকেই কোন সাহায্যের আশা করতে থাকে সে।
ব্যারাকগুলো সেই আগের মতোই রোদে পুড়ছে। গেটে সেই চারজন লোক এখনও খুঁটি থেকে ঝুলছে। স্কোয়াড লীডার ব্রয়ের উধাও, তবে ক্রিমেটারিয়াম থেকে ধোঁয়া উঠেই চলেছে, কেবল সেটা একটু হালকা হয়েছে। হয়তো ওরা ছোট কাউকে পোড়াচ্ছে, নয়তো কাজ বন্ধ রাখার হুকুম হয়েছে।
সব-কিছু খুঁটিয়ে দেখার জন্য ৫০৯ জোর চেষ্টা করতে থাকে। এই তার জগৎ। এখানে কোন বোমা পড়েনি। চিরকালের নিষ্করুণ ক্যাম্পটা আজও একাকী দাঁড়িয়ে। নি:সঙ্গতাই ওটাকে চালায়। কাঁটাতারের ওপারে যে দুনিয়া তার সঙ্গে ওর বিন্দু সংস্রব নেই।
বিমানধ্বংসী কামানটা বন্ধ হল। ৫০৯-এর মনে হল যেন তার চারদিকে কষে আঁটা কোলাহলের একটা বেল্ট হঠাৎ ছিঁড়ে গেছে। সেকেণ্ডের জন্য তার ভ্রম হল যেন সে এতক্ষণ স্বপ্ন দেখছিল ঘুম ভেঙ্গে চমকে সে পিছনে দেখল।
না, স্বপ্ন দেখেনি সে। ঐ তো শহরটা জ্বলছে। কেবল ধোঁয়া আর আগুনই চোখে পড়ছে, অন্য সবকিছু আবছা। কিন্তু তাতে কি এমন তফাত? যার ধ্বংস নেই, সেই শহরটাই তো জ্বলছে।
চমকে ওঠে সে। হঠাৎ মনে হয়, ক্যাম্পের প্রতিটি বুরুজের মেশিনগান বুঝি তার দিকেই তাক করা হয়েছে। চট করে চারদিক সে দেখে নেয়। না কিছুই হয়নি। বুরুজগুলো আগের মতোই ফাঁকা। রাস্তাগুলোতেও কেউ নেই। কিন্তু তাতে কোন লাভ নাই; প্রচণ্ড এক ভয় তার ঘাড় ধরে ঝাঁকুনি দিচ্ছে। মরতে সে চায় না! এখন নয়! কখনও নয়!
তাড়াতাড়ি পোশাকগুলো কুড়িয়ে গুড়ি মেরে ফিরে চলল সে। লেবেন্থালের কোটটা জড়িয়ে যায়, সে অভিশাপ দেয়, আবার হাঁটুর নিচ থেকে সেটা টেনে ব্যারাকের দিকে হামাগুড়ি দিতে থাকে। উত্তেজনায়, সব যেন গুলিয়ে যাচ্ছে। শুধু মৃত্যু নয়, আরও কিছুর হাত থেকে যেন সে ছুটে পালাচ্ছে।
২.
বাইশ নম্বর ব্যারাকের দুটি হল। প্রতিটি হল দুজন রুম সিনিয়রের হুকুমে চলে। দ্বিতীয় হলের দ্বিতীয় বিভাগে থাকে প্রবীণেরা। এটাই সব থেকে সংকীর্ণ আর স্যাঁতসেঁতে অংশ। কিন্তু তাতে ওদের বিশেষ দুশ্চিন্তা নেই। তারা যে একসঙ্গে থাকে, এটাই তাদের কাছে গুরুত্বপূর্ণ। এতে এরা আরও বেশি প্রতিরোধ-ক্ষমতা পায়। মরাটা ভাইরাস রোগের মতোই সংক্রামক; সার্বিক কাতরানির মধ্যে একা একা সহজেই ভেঙ্গে পড়তে হয়, তা সে চাক বা না চাক। কিন্তু কয়েকজন একত্রিত হলে নিজেদের আরও ভালোভাবে রক্ষা করা সম্ভব। একজন যদি হাল ছেড়ে দেয়ার কথা ভাবে, তার সাথীরা বাঁচার লড়াই চালিয়ে যেতে সাহায্য করে। ছোট ক্যাম্পের প্রবীণেরা বেশি খাদ্য পেত বলে বেশি দিন বাঁচত তা নয়, প্রতিরোধের এক মরিয়া ইচ্ছা তারা টিকিয়ে রেখেছিল বলেই তারা বেঁচে ছিল।
প্রবীণদের সেই ডেরায় একশ চৌত্রিশটা কঙ্কাল থাকত। যদিও জায়গাটা মাত্র চল্লিশ জনের পক্ষে উপযুক্ত ছিল। বাঙ্কগুলো খালি তক্তার খালি নয়তো পুরোনো পচা খড় বিছানো। কেবল নোংরা কম্বল ছিল কয়েকটি।
কেউ একজন মারা গেলে তাই নিয়ে কামড়াকামড়ি চলত প্রত্যেকবার। প্রত্যেকটা বাঙ্কে অন্তত তিন জন শোয়। এমন কি কঙ্কালদের পক্ষেও খুব ঠাসাঠাসি সেটা; কারণ কাঁধ আর বস্তির হাড় ছোট হয়ে যায় না। সার্ডিন মাছ যেভাবে কৌটায় ঠাসা হয় সেরকম পাশ ফিরে শুলে অবশ্য একটু জায়গা হয়, কিন্তু তাও ঘুমের ঘোরে প্রায়ই শোনা যায় কারও ধুপ করে পড়ে যাওয়ার শব্দ। কেউ কেউ উবু হয়ে ঘুমোয়। আর কারও শয্যাসঙ্গী যদি সন্ধ্যা বেলায় মারা যায় তো তার খুবই সৌভাগ্য ধরা হয়। মৃতদেহটা সরিয়ে নেয়া হয়, বলে অন্তত একটা রাত সে বেশ হাত-পা ছড়িয়ে শুতে পারে।
দরজার বাঁ দিকের কোণটা প্রবীণেরা নিজেদের জন্য বাগিয়েছিল। ওরা তখনও বারো জন। দু’মাস আগে ওরা ছিল চুয়াল্লিশ। শীত বাকিদের শেষ করেছে। ওরা সকলেই জানত তারা শেষ দশায় পৌঁছে গেছে। রেশন কমিয়ে দেয়া হয়েছে ধীরে ধীরে। মাঝে মাঝে দু-এক দিন তো খাওয়ার মতো কিছুই থাকে না। তারপর বাইরে সার দিয়ে মৃতদেহ রেখে দেয়া হয়।
বারো জনের মধ্যে একজন উন্মাদ, নিজেকে সে জার্মান মেষরক্ষী কুকুর ভাবত। তার একটাও কান ছিল না। ঝটিকাবাহিনীর কুকুর প্রশিক্ষণের সময় সে দুটো ছিঁড়ে নেয়া হয়েছে। সবথেকে কমবয়সী প্রবীণটির নাম কারেল। চেকোে াভিয়া থেকে আসা একটি বালক। মা-বাপ মারা গেছে; ওয়েস্টলাগ গ্রামের এক ধার্মিক কৃষকের আলুর ক্ষেতের সার হয়েছে তারা; কারণ সৎকার-হওয়া মানুষের ছাই ক্রিমেটারিয়ামে বস্তাবন্দী করে কৃত্রিম সার হিসেবে বিক্রি করা হয়। ফসফরাস আর ক্যালসিয়ামের ভাগ তাতে খুব বেশি। কারেল পরে রাজনৈতিক বন্দীদের লাল ব্যাজ। তার বয়স এগারো।
জ্যেষ্ঠ প্রবীণের বয়স বাহাত্তর। একজন ইহুদি। দাড়ির জন্য প্রাণপণ লড়াই করে সে। দাড়ি তার ধর্মের অঙ্গ। এস-এস.রা সেটা নিষিদ্ধ করেছে, কিন্তু লোকটা দাড়ি রাখার চেষ্টা চালিয়েই যায়। এ জন্য লেবার ক্যাম্পে কাঠগড়ায় তুলে আচ্ছা করে চাবকানো হয়েছে তাকে। ছোট ক্যাম্পে এসে তার বরাত একটু খুলেছে। এস. এস’রা এখানে নিয়মকানুন অত খুঁটিয়ে মানে না। উকুন, আমাশয়, টাইফয়েড আর যক্ষার খুব ভয় তাদের। পোলদেশী জুলিয়াস মিলবার ওর নাম দিয়েছিল অবিনশ্বর। কারণ বৃদ্ধ প্রায় এক ডজন ডাচ, পোলিশ, অস্ট্রীয় আর জার্মান কনসেনট্রেশন ক্যাম্প পার হয়ে এসেছিল। ইতিমধ্যে মিলবার টাইফয়েডে মারা গিয়ে নয়েবাউয়ের বাগানে বাসন্তফুল হয়ে ফুটেছে। মৃতদের ছাই নয়েবাউয়ের পায় বিনামূল্যে। যাই হোক অবিনশ্বর নামটা থেকেই গেছে। ছোট ক্যাম্পে এসে বৃদ্ধের দাড়িটা বেড়েছে আর উকুনের নিরাপদ প্রজননস্থল হয়ে উঠেছে।
এই বিভাগের রুম সিনিয়র ভূতপূর্ব চিকিৎসক ডা: এফ্রায়িম বার্জার। ব্যারাকটার শিয়রে দাঁড়িয়ে থাকা মৃত্যুর বিরুদ্ধে লড়াইয়ে তার ভূমিকা গুরুত্বপূর্ণ। শীতকালে বরফে পিছলে গিয়ে কঙ্কালরা যখন হাড় ভাঙ্গত সে তখন স্প্লিন্ট বেঁধে তাদের বাঁচাত। ছোট ক্যাম্পের কাউকে হাসপাতালে নিত না; কেবল যারা কাজ করতে পারে অথবা বেশ হোমরা-চোমরা ধরনের তাদের জন্যই হাসপাতালটা। বড় ক্যাম্পে শীতের বরফটাও কম বিপজ্জনক; খুব খারাপ আবহাওয়ার সময় শ্মশান থেকে ছাই এনে রাস্তায় ছড়িয়ে দেওয়া হত। কয়েদিদের কথা ভেবে যে এটা করা হত তা নয়, করা হত দরকারী মানব শ্রমশক্তি রক্ষা করার জন্য। সাধারণ শ্রমভাণ্ডারের সঙ্গে কনসেনট্রেশন ক্যাম্প সংযুক্ত হওয়ার পর থেকে এদিকে আরও বেশি গুরুত্ব দেওয়া হয়েছিল। ক্ষতিপূরণ হিসেবে অবশ্য কয়েদিদের আরও বেশি খাটিয়ে মৃত্যুর দিকে ঠেলে দেয়া হত। শ্রমিক মারা গেলে কিছু আসে যায় না। কারণ রোজই যথেষ্ট নতুন লোককে গ্রেপ্তার করা হয়।
বার্জার সেই অল্প কয়েক জন কয়েদিদের একজন। যার ছোট ক্যাম্পের বাইরে যাওয়ার অনুমতি ছিল। কয়েক সপ্তাহ ধরে তার কাজ পড়েছে শ্মশানের লাশরাখা ঘরে। রুম-সিনিয়রদের সাধারণত কোন কাজ করতে হয় না, কিন্তু চিকিৎসকের টানাটানি পড়েছে, সেইজন্য তাকে তলব করা হয়েছে। এতে ব্যারাকের সুবিধা হয়েছে; কুষ্ঠরোগাক্রান্ত কাপোর মারফত কঙ্কালদের জন্য সে লাইজল, তুলো, অ্যাসপিরিন জাতীয় কিছু আনাতে পারত। কাপোটি আগে থেকেই বার্জারকে চিনত। এক বোতল আয়োডিনও বার্জার জোগাড় করেছিল, সেটা থাকত তার খড়ের তলায় লুকানো।
অবশ্য সবথেকে গুরুত্বপূর্ণ প্রবীণ হল লিও লেবেন্থাল। লেবার ক্যাম্পের কালোবাজারের সঙ্গে তার গোপন যোগাযোগ। আর গুজব ছিল বাইরের জগতের সঙ্গেও তার আতাত। কি করে যে সে যোগাযোগ রাখত তা কেউ জানত না। শুধু এটুকু জানা ছিল যে শহরের বাইরের ‘দি ব্যাট’ থেকে আসা দুজন গণিকা এর সঙ্গে যুক্ত ছিল। এমন কি ঝটিকাবাহিনীর একজন লোকও এর সঙ্গে আছে বলে মনে করা হত, তবে সে-সম্বন্ধে সত্যি-সত্যি কেউ কিছু জানত না। আর লেবেন্থাল তো কিছুই বলে না।
সব জিনিসেরই সে ব্যবসা চালায়। সিগারেটের টুকরো, গাজর, আলু, উদ্বৃত্ত খাদ্য, হাড়। কখনও-কখনও এক টুকরো রুটি তার মারফত পাওয়া যায়। কাউকে সে ঠকায় না, শুধু ব্যবসাটা চালু রাখে।
লেনদেনই তাকে বাঁচিয়ে রেখেছে, কিসের লেনদেন সে-কথাটা বড় নয়। গোপনে নিজের জন্য সঞ্চয় করার চিন্তাও তার মাথায় আসেনি কখনও।
গুড়ি মেরে দরজা দিয়ে ঢুকল ৫০৯। পিছনের পড়ন্ত রোদ তার কানের ভিতর দিয়ে আসছে। ওর কালো মাথাটার দুধারে মুহূর্তের জন্য চকচক করে উঠল হলুদ রঙ। হাঁপাতে হাঁপাতে সে বলল, ‘শহরে ওরা বোমা ফেলেছে।’
কেউ জবাব দেয় না। এখনও চোখে কিছু দেখতে পায় না ৫০৯। বাইরের তীব্র আলোর পরে ব্যারাকের ভিতরটা এখানো অন্ধকার লাগছে। চোখদুটো বুঁজে আবার সে তাকায়। আবার বলে, ‘শহরে বোমা ফেলেছে ওরা। শুনতে পাওনি তোমরা?’
এবারেও কেউ কিছু বলে না। এইবার ৫০৯ অবিনশ্বরকে দেখতে পেল। দরজার কাছে মেষরক্ষী কুকুরকে সে চাপড়াচ্ছে। কুকুরটা ভয় পেয়ে ঘেউ-ঘেউ করে উঠল। তার ক্ষত-চিহ্নে-ভরা মুখের উপর জটপড়া চুলের ফাঁক দিয়ে ভয়ার্ত চোখদুটো জ্বলজ্বল করছে। অবিনশ্বর বিড়বিড় করে বলল, ‘ঝড়-বিজলি। ঝড়-বিজলি ছাড়া অন্য কিছু না। চুপ, নেকড়ে চুপ করো।’
৫০৯ হামা দিয়ে ব্যারাকের আরও ভিতর দিকে গেল। অন্যদের এত নিস্পৃহতা কেন তা সে বুঝতে পারে না। ‘বার্জার কোথায়?’ সে প্রশ্ন করে।
‘এখনও শ্মশানে।’
কোট আর জ্যাকেটটা সে মেঝেয় রাখে। ‘কেউ বাইরে যেতে চাও না?’
ওয়েস্টহফ আর বুচারের দিকে তাকায়। ওরা জবাব দেয় না।
শেষ পর্যন্ত অবিনশ্বর বলল, ‘কাজটা বেআইনি। বিপদ-সঙ্কেত যতক্ষণ থাকবে ততক্ষণ নিষেধ।’
‘বিপদ-সঙ্কেত শেষ হয়ে গেছে।’
‘এখনও হয়নি।’
‘হয়েছে। বিমানগুলো চলে গেছে। শহরে বোমা ফেলেছে ওরা।’
অন্ধকারের ভিতর থেকে একজন গরগর করে উঠল, ‘অনেকবার তো বলা হল।’
অবিনশ্বর চোখ তুলে তাকাল। ‘তার শাস্তি হিসেবে হয়ত আমাদের কয়েক জনকে গুলি করা হবে।’
‘গুলি?’ ওয়েস্টহফ কাশল। ‘এখানকার লোককে ওরা আবার গুলি করে কবে থেকে?’
মেষরক্ষী কুকুরটা ডেকে উঠল। আবিনশ্বর তাকে জোরে চেপে থাকে। ‘হল্যাণ্ডে বিমান-আক্রমণের পর দশ থেকে কুড়িজন রাজনৈতিক বন্দীকে ওরা গুলি করে মারত?যাতে তারা ভুল ধারণা গড়ে না তোলে। ওরা এইরকমই।’
‘আমার হল্যাণ্ডে থাকি না।’
‘জানা আছে আমার। হল্যাণ্ডে ওরাই গুলি করে মারত।’
‘গুলি!’ ওয়েস্টহফ ঘৃণাভরে ঘোঁতঘোঁত করে। ‘তুমি কি ফৌজি নাকি যে এই ধরনের আবদার করবে ? এখানে এরা ফাঁসিতে লটকায়, পিটিয়ে মেরে ফেলে।’
‘মুখ বদলাবার জন্যেও তো গুলি চালাতে পারে।’
‘তোমার ওই পোড়া-মুখ বন্ধ করো, ’অন্ধকারের ভেতরের লোকটা বলে উঠল।
৫০৯ বুচারের পাশে বসে চোখ বন্ধ করে। জ্বলন্ত শহরের উপরকার ধোঁয়াটা এখনও সে দেখতে পায়, আর বিস্ফোরণের ফাঁকা গর্জন অনুভব করতে থাকে।
‘তোমার কি মনে হয় আজ রাতে আমরা খেতে পাব কিছু ?’ অবিনশ্বর প্রশ্ন করে।
‘চুলোয় যাও, ’অন্ধকার থেকে আওয়াজ আসে, ‘আর কি চাই তোমার? প্রথমে চাইলে গুলি খেতে, তারপর চাইছ খাবার?’
‘ইহুদিকে আশা রাখতে হয়?’
‘আশা?’ ওয়েস্টহফ চাপা ঠাট্টার সুরে বলে।
‘তা ছাড়া আর কি?’ অবিনশ্বর শান্তভাবে বলে।
ওয়েস্টহফ ঢোঁক গিলল তারপর ফুঁপিয়ে কাঁদতে শুরু করল। কয়েকদিন ধরে সে জেলখ্যাপা হয়ে আছে।
৫০৯ চোখ খুলল। তারপর বলল, ‘চুলোয় যাও তুমি আর তোমার বোমাপড়া। ঈশ্বরের দোহাই, থামো।’
‘খাবার জিনিস কারও কাছে কিছু আছে নাকি?’ আবিনশ্বর প্রশ্ন করে।
‘হা ঈশ্বর!’ এই নতুন বোকামিতে লোকটার বুঝি দম বন্ধ হওয়ার উপক্রম।
অবিনশ্বর পাত্তা দেয় না। ‘থেরেসিনণ্টাটে একবার একজনের কাছে একটা চকোলেট ছিল। সে তো এদিকে ভুলে গেছে। সেখানে যখন তাকে বাসে আনা হয় সেটা সে লুকিয়ে রাখে, তারপর ব্যাপারটা ভুলে যায়। পয়সা-ফেলা মেশিন থেকে কেনা দুধের চকোলেট। মোড়কটার উপর হিণ্ডেনবার্গের ছবিও ছিল।’
পিছন থেকে আওয়াজটা লাফিয়ে উঠল, ‘আর কি ছিল? একটা পাসপোর্ট ছিল না?’
‘না, তবে চকোলেটটা খেয়ে আমরা দুদিন বেঁচে ছিলাম।’
‘চিৎকার করে কাঁদছে কে?’ ৫০৯ জিজ্ঞাসা করে বুচারকে।
‘গতকাল যারা এসেছে তাদের একজন। নতুন। শীগগিরই চুপ করে যাবে।’
অবিনশ্বর হঠাৎ মন দিয়ে শোনে, ‘শেষ-’
‘কি?’
‘বাইরে, বিপদ কেটে গেছে। শেষ সঙ্কেত।
হঠাৎ খুব চুপচাপ হয়ে গেল। তারপর শোনা গেল পায়ের শব্দ। ‘কুকুরটাকে লুকোও, ’বুচার ফিসফিস করে বলে।
উন্মাদ লোকটাকে অবিনশ্বর বাক্সগুলোর ফাঁকে ঠেলে ঢুকিয়ে দিল। ‘শুয়ে পড়ো। চুপ!’ তাকে ও হুকুম মানতেও শিখিয়েছিল। ঝটিকাবাহিনীর লোকেরা দেখতে পেলে ওকে তৎক্ষণাৎ পাগল বলে ইনজেকশন দিয়ে শেষ করে দেবে।
বুচার ফিরে এল দরজার কাছ থেকে। ‘বার্জার আসছে।’
* * *
ড. এফ্রায়িম বার্জার লোকটি ছোটখাট, গড়ানো কাঁধ, ডিমের মতো মাথার সবটাই টাকা। চোখগুলো ফোলা-ফোলা, সারাক্ষণ পানি পড়ে।
‘শহরটা জ্বলছে, ’ঢুকতে ঢুকতে বলে সে।
৫০৯ উঠে বসল, ‘ওখানে ওরা কি বলছে এই ব্যাপারে?’
‘জানি না।’
‘জান না কেন? নিশ্চয়ই কিছু শুনেছ তুমি।’
‘শুনিনি, ’ক্লান্তভাবে জবাব দিল বার্জার। ‘বিপদ-সঙ্কেত বাজতে ওরা ক্রিমেটারিয়াম বন্ধ করে দেয়।’
‘কেন?’
‘আমি কি করে জানব? হুকুম হল, ব্যাস।’
‘আর এস.এস’রা? ওদের কাউকে দেখলে?’
‘না।’
তক্তার সারিগুলোর ফাঁক দিয়ে বার্জার পিছন দিকে চলে গেল। বার্জারের সঙ্গে কথা বলার জন্য ও অপেক্ষা করেছিল, আর এখন দেখা যাচ্ছে অন্যদের মতো সেও বীতশ্রদ্ধ। ব্যাপারটা সে বুঝতে পারে না। বুচারকে জিজ্ঞাসা করে, ‘বাইরে যাবার ইচ্ছে নেই?’
‘না।’
বুচারের বয়স পঁচিশ বছর। ক্যাম্পে সে আছে সাত বছর। তার বাবা ছিল সোশ্যাল-ডেমোক্রেটিক কাগজের সম্পাদক; ছেলেকে রাখার পক্ষে কারণটা যথেষ্ট। ৫০৯ ভাবতে থাকে?ও যদি কখনও এখান থেকে বেরোতে পারে তাহলে আরও বছর চল্লিশেক বাঁচতে পারে। চল্লিশ বা পঞ্চাশ বছর। আর আমার বয়স পঞ্চাশ। আমি হয়ত বছর দশেক বাঁচব, বড়জোর কুড়ি বছর। পকেট থেকে একটা কাঠের টুকরো বের করে সে চিবোতে থাকে। এ কথা আমি হঠাৎ ভাবছি কেন?
বার্জার ফিরে এল। ‘লোহমান তোমার সঙ্গে কথা বলতে চায়, ৫০৯।’
ব্যারাকের পিছন দিকের অংশটার নিচের দিকের একটা খড়হীন বাঙ্কে লোহমান শুয়ে আছে। এইটাই ওর ইচ্ছা। প্রচণ্ড আমাশার ভুগছে সে, আর উঠতে পারে না। এইভাবেই অনেকটা পরিচ্ছন্ন থাকা যায়। পরিচ্ছন্ন অবশ্য নয়। কিন্তু এসব জিনিসে ওদের সকলেরই অভ্যাস হয়ে গেছে। কমবেশি সকলেই প্রায় পেটের অসুখে ভোগে। লোহমানের পক্ষে এটা যন্ত্রণা। মৃত্যুর মুখে ও পৌঁছে গেছে পেটের ভিতর যতবার মোচড় দিয়ে ওঠে ততবারই ও কুণ্ঠিত হয়ে ক্ষমা চায়। মুখটা এত ফ্যাকাশে যে রক্তহীন নিগ্রোর মতো দেখায় তাকে। একটা হাত নাড়ল সে। ৫০৯ ওর দিকে ঝুঁকে পড়ল। লোহমানের চোখের গুলিদুটো হলদেটে হয়ে গেছে। ফিসফিস করে বলল, ‘এটা দেখছ?’ তারপর বড় করে হাঁ করল।
‘কি?’ নীল মাড়িগুলোর দিকে ৫০৯ তাকিয়ে থাকে।
‘পিছন দিকে, ডান দিকে- একটা সোনার ক্রাউন রয়েছে ওখানে।’
সরু জানালাটার দিকে লোহমান তার মাথাটা ঘোরাল। জানালার পিছনে সূর্যটা এখন রয়েছে, আর ব্যারাকের এই দিকটায় এখন একটা গোলাপী আলো পড়ছে।
‘হ্যাঁ, দেখেছি, ’৫০৯ বলল। সে কিছু দেখতে পায়নি।
‘ওটা বার করে নাও।’
‘কি?’
‘বার করে নাও’ অধীরভাবে ফিসফিস করে বলে লোহমান।
৫০৯ বার্জারের দিকে মুখ তুলে তাকায়। বার্জার মাথা নাড়ে। ‘কিন্তু ওটা যে শক্ত করে আঁটা,’ ৫০৯ বলে।
‘তাহলে দাঁতটা তুলে দাও। ওটা খুব শক্ত নয়। বার্জার এটা পারে। ক্রিমেটারিয়ামে এই কাজই ও করে। তোমরা দুজনে মিলে ঠিক পারবে।’
‘ওটা তুলতে চাইছ কেন?’
লোহমানের চোখের পাতাগুলো ধীরে ধীরে ওঠানাম করে। কাছিমের মতো দেখায় ওগুলোকে। পাপড়িগুলো আর নেই।
‘জানই তো কেন! সোনা। ওই দিয়ে তোমাদের খাবার কিনতে হবে। লেবেন্থাল ওটার ব্যবস্থা করতে পারবে।’
৫০৯ জবাব দেয় না। সোনার ক্রাউন লেনদেন করার কাজটা বিপজ্জনক। নিয়মমাফিক ক্যাম্পে আসার সঙ্গে সঙ্গে দাঁত-বাঁধানো সোনা তালিকাভুক্ত করা হয়, পরে তুলে নিয়ে ক্রিমেটারিয়ামে জমা করা হয়। তালিকাভুক্ত কোন দাঁত-বাঁধানো সোনার যদি সন্ধান না পায় ওরা, তাহলে গোটা ব্যারাককে দায়ী করা হয়। যতক্ষণ না সোনাটা ফেরত দেয়া হয়, ততক্ষণ কয়েদিদের খেতে দেয়া হয় না। যার কাছে ওটা পাওয়া যা তার ফাঁসি হয়।
‘তুলে নাও ওটা, ’লোহমান হাঁপাতে থাকে। ‘খুব সোজ। সাঁড়াশি বা তার হলেও চলবে!’
‘সাঁড়াশি নেই এখানে।’
‘তার! একটুকরো তার বেঁকিয়ে মাপমতো করে নাও।’
‘তারও নেই।’
লোহমান চোখ বোজে। সে শ্রান্ত হয়ে পড়েছে, ঠোঁটদুটো নড়ে, কিন্তু কথা বেরোয় না আর। দেহটা স্থির আর খুব পাতলা হয়ে গেছে, কেবল শুকনো ঠোঁট দুটোয় বাঁকা ভাবটা তখনও রয়েছে- প্রাণের একটি ছোট্ট কেন্দ্র, যার মধ্যে সীসার প্রবাহের মতো মৃত্যু নেমে আসছে।
৫০৯ খাড়া হয়ে দাঁড়ায়, বার্জারের দিকে তাকায়। লোহমান ওদের মুখ দেখতে পাচ্ছে না, উপরে বাক্সগুলোর তক্তায় আড়াল পড়েছে।
‘কি অবস্থার ওর?’
‘আর কিছু করার নেই। শেষ।’
৫০৯ ঘাড় নাড়ল। এইরকম ব্যাপার এতবার ঘটেছে যে ওর আর হৃদয়ে লাগে না। সবথেকে উপরের বাঙ্কে যে পাঁচজন মানুষ শুকিয়ে-যাওয়া বানরের মতো উবু হয়ে বসে আছে, পড়ন্ত রোদ এসে পড়েছে তাদের গায়ে। ওদের একজন বগল চুলকোতে চুলকোতে আর হাই তুলতে তুলতে জিজ্ঞাসা করল, ‘এখনই পটল তুলবে নাকি?’
‘কেন?’
‘ওর বাঙ্কটা আমরা নেব, কাইজার আর আমি।’
‘তোমরাই ওটা পাবে।’
যে আলোটা ইতস্ততা ঘুরে বেড়াচ্ছে তার দিকে একমুহূর্ত তাকায় ৫০৯। যে-লোকটা প্রশ্ন করেছিল পড়ন্ত আলোয় তার চামড়া চিতাবাঘের মতো দেখায়; কালো-কালো চাকা দাগ যেন সেলাই করে দেয়া হয়েছে। পচা খড়ই চিবাতে থাকে লোকটা। আরও কয়েকটা বাঙ্কের পরে দুজন লোক তীব্র কলহ করছে। মৃদু চড়-চাপড়ের শব্দ পাওয়া যায়।
৫০৯ টের পায় তার পায়ে আস্তে আস্তে টানা দিচ্ছে কে ; লোহমান তার প্যান্ট ঘরে টানছে। আবার ঝুঁকে পড়ে সে।
‘তুলে নাও, ’লোহমান ফিসফিস করে বলে।
বাঙ্কের কিনারায় বসে ৫০৯। ‘কোন কিছুর সঙ্গে এটা বদল করা যাবে না। খুবই বিপদের কাজ। কেউ ঝুঁকি নেবে না।’
লোহমানের মুখটা কেঁপে উঠল। কোনমতে সে বলল, ‘ওদের হাতে যেন না পড়ে। না না, ওদের হাতে নয়। পঁতাল্লিশ মার্ক দিয়ে কিনেছি এটা সেই ১৯২৩-এ। ওদের হাতে যেন না পড়ে! তুলে নাও দাঁতটা!’
হঠাৎ দুমড়ে গিয়ে সে কাতরাতে লাগল। কেবল ঠোঁট আর চোখের কাছের চামড়াটা গুটিয়ে গেল- যন্ত্রণা দেখতে পাওয়ার মতো অন্য কোন পেশী তার শরীরে নেই।
একটু পরেই সে পা ছড়িয়ে দিলো। বুকের থেকে হাওয়াটা চাপে বেরিয়ে আসার সময় একটা করুণ শব্দ হল।
‘ও নিয়ে দুশ্চিন্তা করো না, ’বার্জার তাকে বলল। ‘ঘরে এখনও খানিকটা পানি আছে। তবে কি আমরা সরিয়ে ফেলব ওটা?’
কিছুক্ষণ চুপ করে শুয়ে রইল লোহমান। ‘কথা দাও তোমরা ওটা সরিয়ে ফেলবে -ওরা আমাকে নিয়ে যাওয়ার আগেই।’ ফিসফিস করে সে বলল। ‘আমি চলে গেলে। তখন কাজটা সহজ হবে।’
‘বেশ।’ ৫০৯ বলল, ‘যখন এসেছিলে তখন ওটা তালিকায় ওঠেনি তো?’
‘না। কথা দাও, ঠিক ঠিক করবে!’
‘করব।’
লোহমানের চোখের উপর একটা পর্দা নেমে এসে সে দুটো শান্ত হয়ে গেল। ‘কি হচ্ছে ওখানে বাইরে?’
‘বোমা পড়ছে। বার্জার বলল, ‘শহরে বোমা ফেলা হয়েছে। এই প্রথম। আমেরিকান প্লেন।’
‘ওহ্-’
‘হ্যাঁ।’ বার্জার বলল নিচু গলায় দৃঢ় স্বরে, ‘সময় এগিয়ে আসছে। তোমার বদলা নেয়া হবে, লোহমান।’
৫০৯ চট করে মুখ তুলে তাকাল। বার্জার তখনও দাঁড়িয়ে, তার মুখটা ও দেখতে পায় না। কেবল ওর হাতদুটো দেখতে পায়। হাতদুটো একবার মুঠো হচ্ছে, একবার খুলছে। যেন কোন অদৃশ্য গলাকে টিপে ধরছে, আবার ছেড়ে দিচ্ছে।
লোহমান শুয়ে আছে শান্তভাবে। তার চোখদুটো বুঁজে গেছে, নিশ্বাসের গতি স্তিমিত। বার্জার-এর কথার মানে এখনও ও ঠিক বুঝেছে কিনা নিশ্চিন্ত হতে পারে না ৫০৯।
সে সোজা হয়ে দাঁড়াল। উপরের বাঙ্কের লোকটা জিজ্ঞাসা করে, ‘মরেছে নাকি?’ লোকটা তখনও গা চুলকাচ্ছে নিজের। বাকি চারজন কলের পুতুলের মতো বসে আছে। চোখের দৃষ্টি শূন্য।
‘না।’
৫০৯ বার্জারের দিকে ফিরল। ‘ওকে ও-কথা বললে কেন?’
‘কেন?’ বার্জারের মুখটা কুঁচকিয়ে উঠল। ‘কারণ, কারণ বুঝতে পারছ না সেটার?’
তার ডিমের মতো মাথাটাকে গোলাপী মেঘে ঢেকে দিল আলোটা। দুষিত ভারী আলোয় যেন ও ঘামছে। চকচকে চোখদুটো পানিতে ভরে গেছে; অবশ্য বেশির ভাগ সময়ই সে দুটো ওইরকমই থাকে; দুরারোগ্য সংক্রমিত চোখ ওর।
বার্জার কেন ও-কথা বলল, ৫০৯ কল্পনা করতে পারে। কিন্তু সে-কথা জেনে একজন মরতে-বসা লোকের কি লাভ? জেনে হয়ত তার পক্ষে ব্যাপারটা আরও কঠিন হয়ে উঠতে পারে। সে লক্ষ্য করল, মানুষটার চোখের পাতার উপর মাছি বসার উপক্রম করছে। কিন্তু লোকটার চোখের পাতা কাঁপে না।
বার্জার ঘুরে নিজেকে দরজার দিকে নিজেকে ঠেলে নিয়ে চলল। মাটিতে-শুয়ে-থাকা লোকদের মাড়িয়ে তাকে বাঙ্কে চড়তে হবে। দেখে মনে হয় যেন জলার মধ্য দিয়ে ছপছপ করে চলেছে একটা সারস। ৫০৯ চলল পিছু-পিছু।
দালান পার হয়ে ও চুপিচুপি ডাকল, ‘বার্জার?’ বার্জার স্থির হয়ে দাঁড়িয়ে পড়ল। ৫০৯-এর হঠাৎ যেন দম ফুরিয়ে যায়। ‘তুমি কি সত্যিই বিশ্বাস কর?’
‘কি?’
আবার কথাটা বলবে কিনা ৫০৯ মন স্থির করতে পারে না। বললে বুঝি কথাটা বাতাসে উড়ে যাবে। ‘লোহমানকে তুমি যা বললে?’
বার্জার তাকাল ওর দিকে। তারপর বলল, ‘না।’
‘না?’
‘না। আমি বিশ্বাস করি না।’
‘কিন্তু-’। সবথেকে কাছের পার্টিশনটায় ঠেস দিয়ে দাঁড়াল ৫০৯। ‘তাহলে তুমি ও-কথা বললে কেন?’
‘লোহমানের জন্য বললাম। কিন্তু আমি নিজে বিশ্বাস করি না। কারও বদলা নেয়া হবে না; কারও না, কারও না’
‘আর শহরটা? শহরটা যে জ্বলছে শেষ পর্যন্ত!’
‘শহরটা জ্বলছে। অনেক শহরই এর মধ্যে পুড়েছে। ওর কোন অর্থ নেই, নেই।’
‘আছে! থাকতেই হবে।’
প্রচণ্ড আশা চাপা দিয়ে দেয় আবেগের সঙ্গে বার্জার ফিসফিস করে, ‘কিছু না, কিছু না।’ বিবর্ণ করোটিটা এদিক-ওদিক দোলে আর লাল চোখের কোটর থেকে জল বেরিয়ে আসে। ‘একটা ছোট্ট শহর জ্বলছে। আমাদের সঙ্গে তার কিসের সম্পর্ক? কিছু না। কিচ্ছুই বদলাবে না। কিচ্ছু না!’
মেঝে থেকে অবিনশ্বর বলল, ‘কয়েকজনকে ওরা গুলি করে মারবে।’
অন্ধকারের মধ্য থেকে সেই কণ্ঠস্বর বলে উঠল, ’চুপ করো! তোমার ওই সর্বনেশে মুখটা কি একবারও বন্ধ করতে পার না!’
দেয়ালের কাছে নিজের জায়গায় ৫০৯ উবু হয়ে বসে থাকে। মাথার উপর ব্যারাকের অল্প কয়েকটা জানালার মধ্যে একটা জানালা ছোট আর অনেক উঁচু। অল্প একটু রোদ এসে পড়ছে সেখানে। আলোটা গিয়ে পড়ল বাঙ্কের তক্তাগুলোর তিন নম্বর সারিতে। তারপর চির অন্ধকার!
৩.
ব্যারাকটা তৈরি হয়েছে মাত্র এক বছর আগে। এটা খাড়া করার সময় ৫০৯ হাত লাগিয়েছিল। তখনও লেবার ক্যাম্পের বাসিন্দা ও। পোল্যাণ্ডের পরিত্যাক্ত কনসেনট্রেশন ক্যাম্পের কাঠের ব্যারাক ছিল এটা। একদিন তারই চারটে টুকরা এসে পৌঁছল শহরের রেলস্টেশনে। তারপর লরি বোঝাই হয়ে এই ক্যাম্পে। সেগুলো খাড়া হল। ছারপোকা, ভয়, নোংরা আর মৃত্যুর গন্ধ ছিল তাতে। সেগুলো থেকেই ছোট ক্যাম্পটা গড়ে ওঠে। প্রাচ্য দেশ থেকে এরপর যে পঙ্গু, মুমূর্ষু কয়েদির চালান এল?তাদের এখানে ঠেসে দেয়া হল জাহান্নামে যাওয়ার জন্য। কয়েকদিন গেল ওদের সাফ করতে। তারপর আরও আরও পঙ্গু, অসুস্থ, ভেঙ্গে-পড়া ও অথর্ব মানুষদের গাদাগাদি করে রাখা হল। পাকাপাকি মৃত্যুর প্রতিষ্ঠান হয়ে উঠল এটা।
জানালার ডান দিকের দেয়ালের উপর একটা বাঁকাচোরা চৌকা পড়েছে রোদের। আবছা লেখা আর নামগুলো পড়া যাচ্ছে সেই আলোয়। পোল্যাণ্ড ও জার্মানির পূর্ব অঞ্চলের ব্যারাকের ভূতপূর্ব কয়েদিদের নাম। কাঠের উপর পেন্সিল দিয়ে তাড়াহুড়ো করে লেখা, নয়তো তারের ডগা আর পেরেক দিয়ে আঁচড় কাটা।
নাম গুলোর কয়েকটা ৫০৯-এর চেনা। ওই চৌকা আলোটার কোণের দিকে অন্ধকারের মধ্য থেকে একটা নাম ধীরে ধীরে মাথা তুলছে, এ-কথা ও জানে। নামটার চারদিকে মোটা দাগ কাটা- ‘চেইম উল্ফ, ১৯৪১।’ চেইম উল্ফ এটা লিখেছিল যখন সে বুঝে গিয়েছিল যে তাকে মরতেই হবে। নামটার চারদিকে লাইনগুলো টেনেছিল যাতে তার পরিবারের অন্য কারও নাম যুক্ত না হতে পারে। এটাকে সে চূড়ান্ত রূপ দিতে চেয়েছিল, যাতে একমাত্র সে-ই এটা হয়, আর একমাত্রই থাকতে পারে। চেইম উল্ফ, ১৯৪১। চারপাশের লাইনগুলো শক্ত হাতে আঁটো করে টানা শক্ত হাতে, ছেলেরা যাতে রক্ষা পায় সেই আশায় ভাগ্যের কাছে বাপের শেষ মিনতি। কিন্তু নিচেই, লাইনগুলোর তলায় ঘেঁষাঘেঁষি করে রয়েছে আরও দুটি নাম, যেন সেগুলো ওর সঙ্গে লেপটে থাকতে চায়- রুবেন উল্ফ, আর ময়শে উল্ফ। প্রথমটা খাড়াখাড়া, নড়বড়ে অক্ষরে স্কুলের ছাত্রের হাতের লেখা ; দ্বিতীয়টা হেলানে আর ঝরঝরে, আত্মসমর্পিত আর দৃঢ়তাহীন। এগুলির ঠিক পরেই অন্য হাতের লেখায়- ‘সকলকেই গ্যাস দিয়ে মারা হয়েছে।’
কোনাকুনি ভাবে নিচের দেয়ালের গায়ের একটা গাঁটের ছেঁদার উপর পেরেক দিয়ে আঁচড় কেটে লেখা ‘জোস মেয়ার’, তার পাশে এল.টি.ডি. আর.ই.কে ১ ও ২’। অর্থ হল, ‘জোসেফ মেয়ার রিজার্ভ বাহিনীর লেফটেনান্ট, লৌহ ক্রশ প্রথম ও দ্বিতীয় শ্রেণী। দেখে মনে হয় মেয়ার কথাটা ভুলতে পারেনি। এমন কি তার শেষ দিনগুলিতেও কথাটা তাকে বিষিয়ে রেখেছিল। প্রথম মহাযুদ্ধে সে ফ্রণ্টে গিয়েছিল ; তাকে অফিসার করা হয়েছিল, আর সে ঐ গৌরব অর্জন করেছিল।
ইহুদি বলে তাকে অন্যদের দ্বিগুণ কৃতিত্ব দেখাতে হয়েছিল। পরে আবার ইহুদি বলেই তাকে কীটের মতো বিনষ্ট হতে হয়েছিল। প্রথম যুদ্ধে তার কৃতিত্বের জন্যই অন্যদের থেকে তার উপর বেশি অবিচার করার হয়েছিল এই বিষয়ে সে নি:সন্দেহ ছিল। ভুল করেছিল জোসেদ। এতে তার মরাটা আরও কষ্টকর হয়েছিল শুধু। তার নামের সঙ্গে সে যে-অক্ষরগুলো জুড়ে দিয়েছিল, অবিচারটা সেই অক্ষরগুলোর মধ্যে নয়?ওগুলো শুধু বিদ্রƒপ!
রোদের খুপ্পিটা ধীরে ধীরে সরে সরে যায়। চেইম, রুবেন আর ময়েশে উল্ফ, শুধু একটা কোনা দিয়ে রোদটা যাদের ছুঁয়েছিল, তারা আবার অন্ধকারে চলে গেল। দুটো নতুন লিপি তার জায়গায় আলোতে উঠে এল। একটায় কেবল দুটি বর্ণ, ‘এফ. এম’- পেরেক দিয়ে এইগুলো যে আঁচড় কেটেছিল, মেয়ারের মতো নিজেকে অত বড় ভাবত না সে। এমন কি নিজের নামটাও তার কাছে তুচ্ছ হয়ে গিয়েছিল। অবশ্য একটা চিহ্ন না রেখে সেও মরতে চায়নি। কিন্তু তার নিচেই একটা পুরো নাম ভেসে উঠল আবার। পেন্সিলে লেখা ‘তেভিয়ে লিবেশ ও তার পরিবার’। তারপরেই আরও তড়িঘড়ি করে লেখা ইহুদিদের শোকসূচক প্রার্থনার প্রথম কথাগুলো? ইয়িস গদলঃ
কয়েক মিনিটের মধ্যেই আর একটা অস্পষ্ট লেখার উপর আলোটা এসে পড়বে এ কথা ৫০৯ জানে। ‘লেহ সণ্ডকে খবর দিও। নিউইয়র্ক-’ রাস্তার নামটা আর পড়া যাচ্ছে না, তারপরেই লেখা ‘বা’। খানিকটা পচা কাঠের জায়গা, তারপরে লেখা ‘মারা গেছে। লিওর খোঁজ নিও।’ লিও মনে হয় পালিয়েছে; কিন্তু লেখাটা বৃথাই। ব্যারাকের অত বাসিন্দার মধ্যে কেউই নিউইয়র্কে লেহ স্যাণ্ডার্সকে খবরটা জানাতে পারেনি। ক্যাম্পটা থেকে কেউই বেঁচে ফেরেনি।
* * *
৫০৯ দেয়ালটার দিকে অন্যমনস্কভাবে চেয়ে থাকে। পোল-দেশীয় সিলবার ব্যারাকে শুয়ে থাকতে থাকতে দেয়ালটার নাম দিয়েছিল ‘কান্নার দেয়াল’। তখনও বেঁচেছিল ও আর পেট থেকে রক্ত বেরুচ্ছিল সমানে। নামগুলোও মুখস্থ ছিল ওর, প্রথমদিকে কোন একদিন সিলবার মারা যায় ; কিন্তু পরের দিনগুলোতেও নামগুলো ভূতুড়ে আলোয় জেগে উঠত আর অন্ধকারে মিলিয়ে যেত। গ্রীষ্মের দিনে সূর্য আরও উপরে উঠত। আরও নিচে লেখা অন্য নামগুলো তখন দৃষ্টিগোচর হত। শীতকালে আলোর চুকরোটা উপরের দিকে উঠে যেত এবং আরও অনেক নাম? রুশ, পোলদেশীয়, ইদ্দিশ চিরকালই থেকে যেত অন্ধকারে। কারণ সূর্যের আলোটা সেখানে পৌঁছাত না। এত তাড়াতাড়ি করে ব্যারাকটা খাড়া করতে হয়েছিল যে দেয়ালগুলো চেঁছে নেয়া নিয়ে এস.এস’রা মাথাই ঘামায়নি। কয়েদিদের তো কথাই নেই। আর দেয়ালের অন্ধকার অংশটায় লেখা নামগুলোকে পড়ার চেষ্টাও কেউ করেনি। কেবল শব্দ পড়ার জন্য কেউ কখনও বোকার মত দামী দেশলাইকাঠি খরচ করে না।
৫০৯ মুখ ফেরাল। ওসব জিনিস এখন সে দেখতে চায় না। নিজেকে তার ভীষণ একা মনে হল- যেন কোন অদ্ভুত উপায়ে হঠাৎ সবাই পর হয়ে গেছে। আরও খানিকক্ষণ সে অপেক্ষা করে থাকল; তারপর সহ্য করতে না পেরে দরজার দিকের পথটা হাতড়ে বাইরে চলে গেল।
নিজের ছেঁড়া জামাকাপড়গুলো শুধু এখন ওর গায়ে। ভীষণ শীত। বাইরে এসে ও ওঠে দাঁড়ায়। আর চারপায়ে হাঁটতে চায় না, ও চায় দাঁড়াতে। বুরুজের প্রহরীরা এখনও ফেরেনি। এদিকটায় কোন সময়েই পাহারার বেশি কড়াকড়ি ছিল না। যারা প্রায় হাঁটতেই পারে না? তারা আর পালাবে কোথায়!
৫০৯ দাঁড়িয়ে ছিল ব্যারাকটার ডান দিকের কোণে। পাহাড়ের সারিগুলোর একটা বাঁকে ব্যারাকটা সাজানো। এখান থেকে কেবল শহরটাই নয়, এস.এস বাহিনীর কোয়ার্টারগুলোও দেখতে পাচ্ছে সে। ওগুলো কাঁটাতারের বাইরে একসারি গাছের পিছনে। গাছগুলোর এখনও পাতা গজায়নি। সেগুলোর সামনে দিয়ে বেশ কিছু এস.এস বাহিনীর লোক এদিক ওদিক ছোটাছুটি করছে। অন্যরা এক জায়গায় উত্তেজিতভাবে দাঁড়িয়ে শহরের দিকে একদৃষ্টে তাকিয়ে আছে।
একটা ধূসর মোটরগাড়ি দ্রুতবেগে উপরে উঠে এল। কমাণ্ডারের বাড়ির সামনে এসে দাঁড়াল গাড়িটা। এস.এস কোয়ার্টারগুলো থেকে অল্প একটু দূরেই। নয়েবাউয়ের ইতিমধ্যেই বাইরে এসে দাঁড়িয়েছে। তৎক্ষণাৎ ও গাড়িতে উঠল। ছুটে বেরিয়ে গেল গাড়িটা।
ক্যাম্পে থাকার সময় থেকেই ৫০৯ জানে, শহরে কমাণ্ডারের একটা বাড়ি আছে। সেখানে তার পরিবার থাকে। ওর চোখদুটো এত মনোযোগ দিয়ে গাড়িটাকে অনুসরণ করে যে ব্যারাকগুলোর মাঝখানের রাস্তা দিয়ে একজন যে ধীরেসুস্থে এগিয়ে আসছে তা ওর নজরে পড়ে না। ও হল হাণ্ডকে, বাইশ নম্বরের ব্লক-সিনিয়র। লোকটা গাঁট্টাগোট্টা, রবার সোল জুতো পরে সর্বদাই গুরে বেড়ায়। ওর পরনে অপরাধীদের সবুজ ত্রিভুজ চিহ্ন দেয়া পোশাক। খুনের অভিযোগে ক্যাম্পে এসেছে। বেশির ভাগ সময়েই নিরীহ, কিন্তু মাঝে মাঝে খেপে গিয়ে লোককে এমন পিটিয়েছে যে তারা পঙ্গু হয়ে গেছে।
পায়চারি করতে করতে ও এগিয়ে আসে। ৫০৯ তখনও ওর পথ ছেড়ে চুপিসারে সরে পড়ার চেষ্টা করতে পারত। ভয় পাওয়ার চিহ্ন দেখলে সাধারণত ও খুশি হয়; নিজের গুরুত্ব বোঝানোর জন্য। কিন্তু ৫০৯ তা না করে দাঁড়িয়ে রইল।
‘কি করা হচ্ছে এখানে?’
‘কিছু না।’
‘বটে! কিছু না।’ ৫০৯-এর পায়ের কাছে ও থুথু ফেলল।
‘বেটা ছারপোকা, খোয়াব দেখছ? অ্যাঁ।’ ওর শনের মতো ভ্রুদুটো উঁচু হয়ে উঠল। ‘মুণ্ডু ঘুরে যায় না যেন? এখান থেকে আর বেরুতে হচ্ছে না, বাছা। তোমাদের মত রাজনৈতিক বন্দীদেরকেই ওরা আগে চুল্লিতে পুরবে।
আবার থুথু ফেলে চলে যায় ও।
দম বন্ধ করে থাকে ৫০৯। কপালের পিছন দিকটায় একটা কালো পরদা সেকেণ্ডের জন্য কেঁপে ওঠে। হাণ্ডকে ওকে সহ্য পারে না। ৫০৯ সাধারণত ওকে এড়িয়ে চলে। এবারেও নিজের কোট ধরে চুপচাপ দাঁড়িয়ে রইল। পায়খানার পিছন দিক দিয়ে যতক্ষণ না ও মিলিয়ে গেল ততক্ষণ সে ওকে দেখতে থাকল। হুমকিতে সে ভয় পেল না; ক্যাম্পে হুমকি শোনা নিত্য ব্যাপার। কথাগুলোর আড়ালে কি রয়েছে সেই কথাই শুধু ভাবতে থাকে সে। হাণ্ডকেও নিশ্চয়ই কিছু আঁচ করেছে। নাহলে এ-কথা বলত না। হয়ত এস-এস.দের ওখানেই কিছু শুনে।
৫০৯ আরও একবার শহরটার দিকে তাকাল। ধোঁয়াটা এখনো ছাদের কাছে লেপ্টে রয়েছে। দমকল-বাহিনীর ঘন্টার আওয়াজ কমে এসেছে। রেলস্টেশন থেকে অনিয়মিত চিড়চিড় শব্দ আসছে, যেন গোলাবারুদের বিস্ফোরণ হচ্ছে। পাহাড়ের ঢাল বেয়ে ক্যাম্পের অধিনায়কের গাড়িটা এত জোরে বাঁক নিল যে গাড়িটা খানিক হড়কে গেল। ৫০৯ সেটা দেখতে পেল আর হঠাৎ ওর মুখটা পাকিয়ে হাসি হয়ে উঠল। ও হাসতে থাকে, নিঃশব্দে, কেঁপে কেঁপে। হাসি থামাতে পারে না সে, অথচ আনন্দও নেই ওর ভিতরে। ও হাসতে থাকে, তারপর সাবধানে চারদিকে তাকায়। তারপর আবার দুর্বল মুঠিটা শক্ত করে পাকিয়ে হাসতে থাকে। হাসতে হাসতে প্রচণ্ড কাশির দমকে শেষ পর্যন্ত মাটিতে বসে পড়ে।
৪.
মার্সিডিজ গাড়িটা তীরের মতো উপত্যকায় নেমে গেল। ঝটিকাবাহিনীর অধিপতি নয়েবাউয়ের ড্রাইভারের পাশেই বসে আছে। ভারী চেহারার লোক। অতিরিক্ত বিয়ার পানের ফলে মুখ ফোলা-ফোলা দেখাচ্ছে। চওড়া হাতে সাদা দস্তানাগুলো রোদে চকচক করে। সেটা নজরে পড়তে দস্তানা খুলে ফেলে সে। সেলমা ফ্রেইয়া বাড়িটা। ভাবতে ভাবতেই আগুনের গন্ধ পায় তারা। যতই সামনে যায় ততই চোখ জ্বালা করতে থাকে। ধোঁয়াটা ঘন হয়ে ওঠে। নিউ মার্কেটের কাছে প্রথম বোমার গর্তটা ওদের চোখে পড়ল। সেভিংস ব্যাঙ্কটা জ্বলছে। আশপাশের বাড়িগুলো বাঁচাতে চেষ্টা করছে দমকল। কিন্তু পানির প্রবাহে কোন কাজ হচ্ছে বলে মনে হয় না। চারদিক থেকে গন্ধক আর অ্যাসিডের গন্ধ আসছে। নয়েবাউয়েরের পেটটা মুচড়ে উঠতে থাকে। ‘হাকেনস্ট্রাস দিয়ে চালাও আলফ্রেড।’ ও বলে, ‘এখান দিয়ে আমার বেরোতে পারব না।’
ড্রাইভার মোড় ফিরল। শহরের দক্ষিণ দিক পরিক্রম করল গাড়িটা। ছোট ছোট বাগানওয়ালা বাড়িগুলো শান্তিতে রোদ পোহাচ্ছে। হাওয়া উত্তরমুখো। বাতাস পরিষ্কার। নদীটা পার হতেই পোড়া গন্ধটা আবার পাওয়া গেল। গন্ধটা বাড়তে থাকে, আর হেমন্তের গাঢ় কুয়াশার মত রাস্তার উপর ধোঁয়া জমে থাকতে দেখা গেল।
গোঁফে তা দেয় নয়েবাউয়ের। ফ্যুয়েরার৩-এর মতো সেটা ছোট করে ছাঁটা। একসময় দ্বিতীয় উইলিয়ামের মতো উপর দিকে পাকানো গোঁপ রাখত সে। পেটের এই খিল ধরাটা! সেলমা! ফ্রেইয়া! সুন্দর বাড়িটা! গোটা তলপেট বুজে সবটাই যেন পেট হয়ে গেছে।
শেষ পর্যন্ত গাড়িটা লিবিগস্ট্রাসের দিকে মোড় ফিরল। নয়েবাউয়ের বাইরের দিকে ঝুঁকে পড়ে। ওই তো বাড়িটা! সামনের বাগান! লনের উপর পোড়ামাটির বাসন আর লাল চীনেমাটির ভাল্লুকমুখো কুকুরটা। কোনও ক্ষতি হয়নি। সবগুলো জানালাই আস্ত! পেটের খিল ধরাটা ছেড়ে যায় তার। সিঁড়ি বেয়ে উঠে দরজাটা খোলে ও। ভাগ্য কি ভীষণ ভালো! তাই তো হবার কথা?শুধু তারই কিছু হতে যাবে কেন ?
হরিণের শিঙের টুপি রাখার তাকে চুপিটা ঝুলিয়ে রেখে বসার ঘরটায় ও ঢোকে। ‘সেলমা, ফ্রেইয়া, কোথায় তোমরা?’
কেউ সাড়া দেয় না। জানালাটার দিকে এগিয়ে গিয়ে টেনে খুলে দেয়। বাড়ির পিছন দিকটার বাগানে দুজন রুশ বন্দী কাজ করছে। তারা তাড়াতাড়ি একবার চোখ তুলে তাকিয়েই ব্যগ্রভাবে মাটি কোপাতে থাকে।
‘অ্যাই, অ্যাই? ব্যাটা বলশেভিক।’
একজন রুশ কাজ থামায়।
‘আমার বাড়ির লোকরা কোথায়?’ নয়েবাউয়ের হাঁক পাড়ে।
লোকটা রুশভাষায় কি যেন জবাব দিল।
‘চোপরাও গাধা, তোর ঐ শুয়োরের ভাষা ছাড়। জার্মান জানিস তুই, না কি বাইরে গিয়ে শিখিয়ে দেব?’
রুশ দুজন ওর দিকে একদৃষ্টে তাকিয়ে থাকে। নয়েবাউয়েরের পিছন দিকে কে যেন বলে ওঠে, ‘আপনার স্ত্রী পাতালকুঠরিতে।’
ও ফিরে তাকায়। দাসী মেয়েটা। ‘পাতালকুঠরিতে? ওহো, হ্যাঁ হ্যাঁ, বটেই তো। তুমি কোথায় ছিলে?
‘বাইরে, এই একটুর জন্যে।’ মেয়েটা দরজার কাছে লাল-মুখে দাঁড়িয়ে, চোখ দুটো চকচক করছে?যেন বিয়ের আসর থেকে আসছে। ‘এর মধ্যেই নাকি শ খানেক মরেছে, ওরা বলছে।’ বকবক করতে শুরু করে মেয়েটি, ‘স্টেশনের ওখানে, তারপর তামা গালাইয়ের ওখানে, গির্জাতে’
‘চুপ কর!’ নয়েবাউয়ের ওকে বাধা দেয়, ‘কে বলল এসব কথা?’
‘ওই বাইরে, ওরা’
‘কারা?’ নয়েবাউয়ের এক পা এগিয়ে গেল। ‘এসব রাষ্ট্র-বিরোধী কথা কে বলল?’
মেয়েটি পিছিয়ে যায়। ‘ওই তো, আমি বলিনি- কে যেন বলল, সবাই’
‘বিশ্বাসঘাতক। জানোয়ার।’ নয়েবাউয়ের খেপে ওঠে। চেপে রাখা উত্তেজনাটা শেষ পর্যন্ত প্রকাশ করতে পারে। ‘শুয়োরের বাচ্চা। আতঙ্ক ছড়ানে ওয়ালা! তুমি বাইরে গিয়েছিলে কি করতে?’
‘আমি আমি কিছু করিনি’
‘কাজে ফাঁকি দেয়া হচ্ছে অ্যাঁ? মিথ্যা গুজব আর আতঙ্ক ছড়াচ্ছ, তাই না? দাঁড়াও এখুনি খুঁজে বার করছি। ব্যবস্থাও নেয়া হবে। কড়া ব্যবস্থা। যাও, রান্নাঘরে যাও।’
মেয়েটি ছুটে বেরিয়ে গেল। নয়েবাউয়ের হাঁফাতে থাকে। জানালাটা বন্ধ করে দেয়। না, কিছুই হয়নি, ভাবতে থাকে। ওরা তো পাতালকুঠুরিতেই রয়েছে। কথাটা আগেই ভাবা উচিত ছিল।
পকেট থেকে একটা চুরুট বার করে ধরায় সে। তারপর কোটটা টেনে-টুনে নিয়ে বুকটা টান করে আয়নায় একঝলক তাকিয়ে নেমে যায় সিঁড়ি বেয়ে।
দেয়ালে ঠেস-দেয়া কৌচে ওর স্ত্রী আর মেয়ে পাশাপাশি বসেছে। ওদের মাথার উপরে চওড়া সোনার ফ্রেমে ফ্যুয়েরার-এর একটা রঙিন ছবি।
যুদ্ধের আগে মদ রাখার পাতালকুঠুরিটাকে বিমান আক্রমণ-রোধী করে নেয়া হয়েছিল। স্টীলের কড়ি, কংক্রীটের ছাদ আর বড় বড় দেয়াল দেয়া ছিল। নয়েবাউয়ের সেই সময় ওটা তৈরি করিয়েছিল শুধু লোককে দেখানোর জন্য, প্রতিরক্ষার ব্যাপারে একটা ভালো দৃষ্টান্ত দেখানো দেশ প্রেমিকের কাজ হিসেবে। কেউ গুরুত্ব দিয়ে ভাবেনি জার্মানিতে বোমাবর্ষণ করা যাবে। জার্মান-বাহিনীর মুখে দাঁড়িয়ে শত্রুপক্ষের বিমান সেই কাজ কখনও যদি করতে পারে? লোকে যেন তাকে চাষা বলে ডাকে; মার্শাল গোয়েরিঙের এই ঘোষণা যে-কোন সৎ জার্মানের কাছে যথেষ্ট। দুর্ভাগ্যক্রমে ব্যাপারটা অন্যরকম দাঁড়িয়েছে। প্রকৃতই তারা যতটা দুর্বল?থেকে বেশি দুর্বল ভান করা হল ধনি আর ইহুদিদের বিশ্বাসঘাকতার প্রকৃষ্ট উদাহরণ।
‘ব্রুনো!’ সেলমা নয়েবাউয়ের দাঁড়িয়ে ফোঁপাতে শুরু করে।
ও বেশ ফরসা আর মোটা। লেস-বসানো স্যামন রঙের ফরাসী সিল্কের একটা ড্রেসিংগাউন পরে আছে। ১৯৪১-এ ছুটি কাঠাতে প্যারিস গিয়েছিল নয়েবাউয়ের। ফিরে আসার সময় নিয়ে এসেছিল। সেলমার পাংশুটে গালদুটো কাঁপছে।
‘ওটা শেষ হয়ে গেছে সেলমা, শান্ত হও।’
‘শেষ’ ও চিবিয়েই চলে, যেন কথাগুলো কোনিগ্সবার্গার মাংসের গুলি? ‘কতক্ষণের-কতক্ষণের জন্য?’
‘একেবারেই। ওরা চলে গেছে। আক্রমণটা প্রতিহত করা হয়েছে। ওরা আর ফিরে আসবে না।’
বুকের উপর ড্রেসিংগাউনটা শক্ত করে ধরে থাকে সেলমা নয়েবাউয়ের। ‘এ-কথা কে বলল ব্রুনো? কি করে জানলে তুমি?’
‘ওদের অন্তত অর্ধেকগুলো আমরা গুলি করে নামিয়েছি, এবার ফিরে আসতে হলে ওদের ভালো করে ভেবে দেখতে হবে।’
‘তুমি জানলে কি করে?’
‘আমি জানি। আগেরটা আচমকা এসে পড়েছিল। পরের বার রীতিমতো সতর্ক থাকব আমরা।’
মহিলাটি চিবানো বন্ধ করে প্রশ্ন করে, ‘শুধু এইটুকুই তোমার বলার?’
নয়েবাউয়ের বোঝে যে এ সান্তনা কিছুই নয়। সে কর্কশভাবে বলে, ‘এইটুকুই যথেষ্ট?’
স্ত্রী একদৃষ্টে চেয়ে থাকে ওর দিকে। চোখদুটো তার ফ্যাকাশে নীল। ‘না?’ হঠাৎ সে চেঁচিয়ে ওঠে। ‘এটুকুই যথেষ্ট নয়। ওটা বাজে কথা ছাড়া আর কিছু নয়! ওর কোন মানে হয় না। অসংখ্য বানানো গপ্প এত দিন আমরা শুনেছি। প্রথমে আমাদের শোনানো হল, আমরা এত শক্তিশালী যে কোন শত্রু বিমান কখনও জার্মানিতে ঢুকতে পারবে না। হঠাৎ দেখা গেল ওরা হাজির হয়েছে। বলা হল ওরা আর ফিরে আসবে না, কারণ সীমান্ত এলাকায় ওদের সব কটাকে গুলি করে আমরা নামিয়ে দেব। কিন্তু ওরা আরও দশগুণ শক্তিতে ফিরে এল। আর তুমি কিনা মেজাজের সাথে বলছ?ওরা আর ফিরে আসবে না। আমরা ওদের ঠিক আটকে দেব। একথা বিশ্বাস করবে বলে তুমি আশা কর?’
‘সেলমা।’ অনিচ্ছাকৃতভাবে নয়েবাউয়ের একবার ফ্যুয়েরার-এর ছবিটার দিকে তাকায়। তারপর লাফিয়ে গিয়ে দরজাটা দড়াম করে বন্ধ করে দেয়। ‘চুলোয় যাও, সাবধানে কথা বলো।’ হিশ হিশ করে বলে সে, ‘তুমি কি চাও আমরা সবাই ঝামেলায় পড়ি? পাগল হয়ে গেলে নাকি যে এইরকম জোরে জোরে চেঁচাচ্ছ?’
স্ত্রীর সামনে এসে দাঁড়ায় ও। স্ত্রীর কাঁধের উপর বের্কটেসগাডেনের নিসর্গচিত্রের দিকে একদৃষ্টে তাকিয়েই থাকেন ফ্যুয়েরার। মুহূর্তের জন্য নয়েবাউয়ের প্রায় বিশ্বাস হতে চলছিল যে ফ্যুয়েরার বুঝি সব কথা শুনছেন।
সেলমা দেখতে পায় না ফ্যুরেরকে। ‘পাগল?’ আর্তনাদ করে ওঠে ও,’ কে পাগল? আমি? যুদ্ধের আগে কি সুন্দর জীবন ছিল আমাদের; আর এখন? এখন? এখানে পাগলে কে সেটাই আমি জানতে চাই?’
নয়েবাউয়ের দুহাত দিয়ে তার হাতদুটো ধরে তাকে এমন ঝাঁকুনি দেয় যে তার মাথাটা লটপট করতে থাকে আর স্ত্রীকে চিৎকার বন্ধ করতে হয়। পর চুলটা খুলে যায়, ক্লিপ ও চিরুনি পড়ে যায় মাটিতে, ঢোঁক গিলতে গিয়ে ভুল করে কাশতে থাকে। নয়েবাউয়ের ওকে ছেড়ে দেয়। থপ করে সেলমা কৌচের উপর বসে পড়ে।
‘কি, ব্যাপার কি ওর?’ নয়েবাউয়ের জিজ্ঞাসা করে মেয়েকে।
‘বিশেষ কিছু নয়। মা খুব উত্তেজিত হয়ে পড়েছে।’
‘কেন? কিছু তো হয়নি।’
‘কিছু হয়নি?’ স্ত্রী আবার শুরু করে। ‘তুমি ওখানে পাহাড়ে থাক, তোমার কাছে তো কিছুই হয়নি। কিন্তু এখানে নিচে আমার একা একা থাকি, আমাদের কথাটা ভেবেছ’
‘আস্তে। চুলোয় যাক সব; অত চেঁচিয়ো না। তোমার জন্যে পনেরো বছর ধরে মুখে রক্ত তুলে খাটছি কি এক রাত্তিরে সব খোয়াবার জন্যে? তুমি কি মনে কর আমার চাকরিটা খতম করার জন্য অনেক লোক মুখিয়ে নেই?’
‘এই প্রথম বোমা পড়ল যে, বাবা, ’ফ্রেইয়া নয়েবাউয়ের শান্ত স্বরে বলল। আজ পর্যন্ত শুধু সঙ্কেতই বেজেছিল। মায়ের ওটা সয়ে যাবে কদিন গেলেই।’
‘প্রথম? বটে, প্রথমই তো। এখনও পর্যন্ত কিছু যে ঘটেনি এই জন্য কোথায় আমাদের খুশি থাকা উচিত, তা না আজেবাজে চেঁচামেচি।’
মা অল্পতেই ঘাবড়ে যায়। ঠিক অভ্যাস হয়ে যাবে।’
‘ঘাবড়ে যায়।’ মেয়ের শান্ত ভাব দেখে নয়েবাউয়ের চটে যায়। ‘কে নার্ভাস হয়নি? তুমি কী ভাব আমি নার্ভাস হইনি? নিজেদের শক্ত করতে হবে আমাদের। না যদি করি তাহলে কি হবে ভেবে দেখ।’
‘সেই এক কথা।’ তার কৌটে শুয়ে স্ত্রী হেসে ওঠে। ‘নার্ভাস। মানিয়ে নিতে হবে? বলা খুব সোজা তোমার পক্ষে।’
‘আমার পক্ষে? কেন?’
‘তোমার তো আর কিছু হয় না।’
‘কি?’
‘তোমার তো আর কিছু হয় না। কিন্তু আমরা এখানে যেন যাঁতায় পড়ে আছি।’
‘ডাহা মিথ্যে কথা! সব জায়গাই সমান। আমার কিছু হতে পারে না? কি বলতে চাও তুমি?’
‘ওখানে তোমার ক্যাম্পে তো তুমি নিরাপদ আছ।’
‘কি?’ নয়েবাউয়ের চুরুটটা মেঝে ছুঁড়ে ফেলে দিয়ে পায়ে সেটাকে মাড়ায়। ‘তোমাদের এখানে যে-রকম পাতালকুঠরি আছে, আমাদের তাও নেই।’ মিথ্যা কথাটা অবলীলায় ঝেড়ে দেয় সে।
‘কারণ তোমাদের দরকার নেই। তোমরা শহরের বাইরে থাক।’
‘যেন তাতে কোন ফারাক হয়! বোমা যেখানে পড়ার সেখানেই পড়ে।’
‘ক্যাম্পে বোমা ফেলা হবে না।’
‘সত্যি? জানলে কি করে? আমেরিকানরা বুঝি খবর পাঠিয়েছে? নাকি রেডিওতে বিশেষ সংবাদ দিয়েছে তোমায়?’
নয়েবাউয়ের মেয়ের দিকে এক নজর তাকায়। ও আশা করেছিল মেয়ে তার রসিকতাটা সমর্থন করবে। কিন্তু ফ্রেইয়া কৌচের পাশের টেবিলে পাতা লেস-দেয়া কাপড়ের পাড় নিয়ে নাড়াচাড়া করতে থাকে। বদলে ওর স্ত্রীই জবাব দিল, ‘ওরা তো আর নিজেদের লোকের ওপর বোমা ফেলবে না।’
‘কি বাজে বকছ! আমাদের ওখানে আমেরিকান আছে নাকি! ইংরেজও নেই। কেবল রুশ, পোল আর বলকান হতভাগাগুলো। আর আছে পিতৃভূমির জার্মান শত্রুরা? ইহুদি, বিশ্বাসঘাতক আর অপরাধীরা।’
সেলমা জোড় তর্ক করে বোঝাতে চায়, ‘রুশ, পোল আর ইহুদিদের ওপর ওরা বোমা ফেলবে না।’
নয়েবাউয়ের ঝাঁ করে ঘুরে দাঁড়ায়। চাপা গলায় বলে, ‘অনেক কিছু জান দেখছি। এবার আমি তোমায় দু-একটি কথা বলতে চাই। ওখানে পাহাড়ের গায়ে কি ধরনের ক্যাম্প আছে সে-বিষয়ে ওদের কিছুমাত্র ধারণা নেই, বুঝেছ? যা দেখা যায় তা হল ব্যারাক। সেগুলোকে সহজেই মিলিটারি বলে ভুল করা যায়। আর যেগুলো ওরা বাড়ি দেখতে পায়? সেগুলো আমাদের এস-এস কোয়ার্টার। ওরা দেখতে পাচ্ছে বাড়িতে লোকে কাজ করছে। ওদের লক্ষ্যে হল ফ্যাক্টরি। উঁচুতে এখানকার থেকে বিপদের আশঙ্কা একশো গুণ। সেই জন্যেই আমি চাইনি তুমি ওখানে থাক। এখানে নিচে ব্যারাক নেই, ফ্যাক্টরি নেই। বুঝতে পারছ কথাটা?’
‘না।’
নয়েবাউয়ের স্ত্রীর দিকে একদৃষ্টে তাকিয়ে থাকে। ওর স্ত্রী আগে কখনও এরকম ছিল না। কি যে তার মাথায় ঢুকেছে ঈশ্বর জানেন। হঠাৎ ওর মনে হয়?ওর পরিবারের লোকেরা ওকে ত্যাগ করেছে। ঠিক তখনই যখন একসঙ্গে দাঁড়াবার দরকার সব থেকে বেশি। বিরক্ত হয়ে আবার সে মেয়ের দিকে তাকায়। ‘আর তুমি, তুমি কি ভাবছ এ নিয়ে? কথা বলছ না কেন?’
ফ্রেইয়া নয়েবাউয়ের উঠে দাঁড়াল। বছর কুড়ি বয়স। পাতলা চেহারা। মুখটা হলদেটে, কপালটা এগিয়ে এসেছে। সেলমার মতোও দেখতে নয়, আবার বাবার মতোও দেখতে নয়। বলল, ‘আমার মনে হয়, মা এখনই শান্ত হয়ে যাবে।’
‘কি? কেন?’
‘আমার মনে হয় শান্ত হয়েই গেছে।’
নয়েবাউয়ের চুপ করে থাকে। ওর স্ত্রী কিছু বলবে বলে ও অপেক্ষা করছিল। শেষ পর্যন্ত বলল, ‘আচ্ছা, ঠিক আছে তাহলে।’
‘আমরা ওপরে যেতে পারি?’ ফ্রেইয়া প্রশ্ন করল।
নয়েবাউয়ের সন্দেহের দৃষ্টিতে তাকাল সেলমার দিকে। এখনও ওকে বিশ্বাস করা যায় না। এটা ওকে স্পষ্ট করে বোঝাতে হবে যে কোন অবস্থাতেই কারও সঙ্গে ওর কথা বলা চলবে না। এমন কি দাসী মেয়েটার সঙ্গেও না। মেয়ের সঙ্গে তো নয়ই। মেয়ে ওর থেকে আগে বুঝতে পারে সব। ‘ওপরতলাতেই ভালো, বাবা। বেশ হাওয়া আছে।’
মন স্থির করতে পারে না ও। ময়দার বস্তার মতো স্ত্রী পড়ে রয়েছে কৌচে। অন্তত একবারও কি বুদ্ধিমানের মতো কথা বলতে পারে না ও ? এখন টাউন হলে যেতে হবে। ছটার সময়। ডিৎস ফোন করেছে, পরিস্থিতিটা নিয়ে আলোচনা করতে হবে।
‘কিছু হবে না বাবা, সব ঠিক আছে। তাছাড়া ডিনারের ব্যবস্থাও করতে হবে।’
‘ঠিক আছে তাহলে।’ নয়েবাউয়ের মন স্থির করে ফেলেছে। অন্তত মেয়ে তার মাথাটা ঠিক রেখেছে মনে হয়। ওর উপর সে বিশ্বাস রাখতে পারে। নিজেরই তো রক্তমাংস। স্ত্রীর দিকে সে এগিয়ে যায়। ‘ঠিক আছ তাহলে। এসব কথা এখন ভুলে যাওয়া যাক, কি বল সেলমা? এরকম তো ঘটতেই পারে। সত্যি সত্যি বিপজ্জনক কিছু নয়।’ মৃদু হেসে স্ত্রীর দিকে তাকায় সে। দৃষ্টিটা অবশ্য নিরুত্তাপ। ‘কি বল?’ সে আবার বলে।
স্ত্রী জবাব দেয় না।
স্ত্রীর কাঁধদুটো দুহাত দিয়ে জড়িয়ে ধরে আদর করে বলে সে, ‘তাহলে যাও, ছুটে গিয়ে ডিনারটা বানিয়ে ফেল। আর, ভয়টা যখন কেটে গেছে, ভালো দেখে কিছু একটা রাঁধ তো দেখি, অ্যাঁ?
স্ত্রী উদাসীন ঘাড় নাড়ে।
নয়েবাউয়ের বুঝতে পারে আর বাজে কথা বলবে না সেলমা। ‘বেশ খাসা করে একটা কিছু রাঁধ দেখি, সোনারা। যাই বল সেলমা, আমি এসব করছিতো তোমারই জন্যে। যাতে ওই নোংরা ডাকাতদের কাছে না থেকে এখানে এই সুন্দর বাড়িটায় তোমরা থাকতে পার। আর এ-কথা ভুলে যেও না যে প্রত্যেক সপ্তাহে আমি কয়েক রাত্তির এখানেই কাটাই। দেখতে হবে তো সকলেই এক নৌকার যাত্রী আমরা। তাহলে ওই কথাই রইল, রাতের জন্যে মুখরোচক কিছু একটা বানিও! এই ব্যাপারে তোমার ওপর আমার খুব আস্থা। আর এক বোতল ফরাসী শ্যাস্পেন হলে কেমন হয় ? এখনও যথেষ্ট আছে না আমাদের?’
‘হ্যাঁ।’ স্ত্রী জবাব দেয়, ‘ওই জিনিসটা এখনও আমাদের যথেষ্ট আছে।’
‘আর একটা কথা?’ গ্রুপ-লীডার ডিৎস কর্কশ স্বরে বলে, ‘কোন কোন ভদ্রলোক তাঁদের পরিবার গ্রামদেশে পাঠিয়ে দেবার কথা ভাবছে বলে আমার কানে এসেছে। এর কোন মানে হয়?’
কেউ উত্তর দেয় না।
‘না, সে অনুমতি আমি দিতে পারি না। আমরা এস-এস অফিসার; আমাদের দৃষ্টান্ত হতে হবে। লোক সরানোর সার্বিক হুকুম যতক্ষণ না দেয়া হচ্ছে, তার আগে আমরা নিজেদের বাড়ির লোকদের যদি শহরের বাইরে পাঠিয়ে দিই তাহলে সেটার অপব্যাখ্যা হওয়া সম্ভব। আতঙ্ক ছড়ানেওয়ালা লোকগুলো সঙ্গে সঙ্গে হৈচৈ জুড়ে দেবে। সেজন্য আশা করি আমার অজান্তে এরকম কিছু ঘটবে না।’
চমৎকার করে বানানো ইউনিফর্ম পরে ও একদৃষ্টে চেয়ে আছে। ছিপছিপে আর লম্বা দেখাচ্ছে ওকে। গ্রুপের প্রত্যেককে দৃঢ়প্রতিজ্ঞ অথচ নিরীহ দেখাচ্ছে। প্রায় প্রত্যেকেই ভেবেছে পরিবারের লোকজনকে দূরে পাঠিয়ে দেবে; কিন্তু কেউই কিছু প্রকাশ করছে না। চোখের দৃষ্টিতেও না। প্রত্যেকে ভাবছে একই কথা শহরে তার কেউ থাকে না। ও এসেছে স্যাক্সনি থেকে। ওর একমাত্র আকাঙক্ষা হল সৈন্যদের সামনে ওকে যেন অফিসারের মতো দেখায়। সেটা খুবই সোজা। যাতে ব্যক্তিগত কোন ক্ষতি হওয়ার নেই সে কাজ মানুষ সাহসের সঙ্গেই করতে পারে।
‘ভদ্রমহোদয়গণ, এটুকুই শুধু আমার কথা, ’ডিৎস বলে। ‘আবার মনে করিয়ে দিই, আমাদের আধুনিক গোপন অস্ত্রগুলি এখন ব্যাপক হারে তৈরি হচ্ছে। ভি. আই. যত কাজেরই হোক, এগুলির তুলনায় কিছুই না। লণ্ডন পুড়ে ছাই হয়ে গেছে। ইংল্যাণ্ডের উপর সবসময়েই বোমা ফেলা হচ্ছে। নিউ ইয়র্কের গগনচুম্বী অট্টালিকাগুলি ধ্বংসস্তূপে পরিণত। ফ্রান্সের বড় বড় বন্দর আমাদের দখলে। নতুন সৈন্য সমাবেশের ফলে আক্রমণকারীরা প্রবল অসুবিধার সম্মুখীন। পাল্টা আক্রমণে শত্রুদের ঝেঁটিয়ে সমুদ্রে ফেলা হবে। তার ব্যাপক প্রস্তুতি চলছে। শক্তিশালী রিজার্ভ বাহিনী গড়ে তুলেছি আমরা। আর আমাদের নতুন অস্ত্রশস্ত্র সম্বন্ধে বেশি কিছু বলার অধিকার আমার নেই; তবে সর্বোস্ত কর্তৃপক্ষের কাছ থেকে শুনেছি, তিন মাসের মধ্যে আমরা বিজয়গৌরব অর্জন করব। ততদিন আমাদের চালিয়ে যেতেই হবে।’ হাতটা উপর দিকে ছড়িয়ে দিল সে, ‘কাজে ফিরে যাও। হাইল হিটলার!’
‘হাইল হিটলার!’ গর্জন করে ওঠে গ্রুপটা।
টাউন হল থেকে বেরিয়ে এল নয়েবাউয়ের। রাশিয়া সম্বন্ধে ও কিছু বলল না, সে ভাবতে থাকে। রাইন অঞ্চল সম্বন্ধেও নয়। ভাঙ্গা পশ্চিম সীমান্ত সম্বন্ধে ও সবথেকে কম বলল। ‘চালিয়ে যাও’ ওর পক্ষে বলা সোজা। ওর তো নিজের কিছুই নেই। ও একটা উন্মাদ। রেলস্টেশনের কাছে ওর অফিস নেই। মেলার্ন সংবাদপত্রের শেয়ারের মালিক ও নয়। এমন কি বাড়ি করার জমিও ওর নেই। আমার সব কিছু আছে। সেসব যদি বাতাসে মিলিয়ে যায় তাহলে, কেউ কি আমায় এক পয়সা দেবে?
হঠাৎ রাস্তায় লোকজনের ভিড় জমে যায়। টাউন হলের সামনের স্কোয়ারটা লোকে ভরতি। সিঁড়ির উপর একটা মাইক টাঙানো হচ্ছে। ডিৎস বক্তৃতা দেবে। তোরণ থেকে শার্লমেন আর সিংহের হাসি হাসি পাথরের অবিচল মুখগুলো নিচের দিকে চেয়ে আছে। নয়েবাউয়ের গিয়ে মার্সিডিজে চড়ল। ‘হেরমান গোয়েরিঙ সড়কে চল, আলফ্রেড।’
হেরমান গোয়েরিঙ সড়ক আর ফ্রিডরিশ গলির মোড়ে নয়েবাউয়ের অফিস-বাড়ি। বাড়িটা বিরাট, নিচের তলায় একটা বিলাস সামগ্রীর দোকান। উপরের তলাদুটোয় অফিস।
নয়েবাউয়ের গাড়ি থামিয়ে বাড়িটার চারপাশ দিয়ে ঘুরে ঘুরে বেড়ায়। দুটো শো’কেসের কাচ ফেটে গেছে, এছাড়া কিছু হয়নি। স্টেশন থেকে ভেসে-আসা ধোঁয়ার কুণ্ডলীতে উপরের অফিসগুলো ঢাকা পড়ে গেছে। কিন্তু আগুন লাগেনি কিছুতে।
একটুখানি দাঁড়িয়ে থাকে ও। দু লক্ষ মার্ক, ও ভাবে। অন্তত এই দামই হবে, তার কম নয়। ওটার জন্য পাঁচ হাজার খরচ করেছে ও। ১৯৩৩-এ ওটা ছিল ইহুদি ম্যাক্স ব্লাঙ্কের। সে এক লক্ষ চেয়েছিল। খুব গোলমাল করেছিল, ওর লোকসান হয়ে যাচ্ছে বলে নালিশও করেছিল- তার কমে ও বিক্রি করবে না। কনসেনট্রেশন ক্যাম্পে দু’সপ্তাহ কাটানোর পর পাঁচ হাজারেই বিক্রি করেছিল। আমি তো ভালো ব্যবহারই করেছি, নয়েবাউয়ের ভাবতে থাকে। বিনা পয়সাতেই ওটা পেতে পারতাম। এস-এসরা ওকে নিয়ে মজা করার পর ব্লাঙ্ক নিজেই এটা আমাকে উপহার দিতে চেয়েছিল। আমি তো পাঁচ হাজার মার্ক দিয়েছি। নগদ টাকা। অবশ্য সবটা একসঙ্গে দিইনি; তখন অত টাকাও আমার ছিল না। প্রথম মাসের ভাড়া পাওয়ার পর থেকে ওকে দাম দিতে থাকি। তাতে ব্লাঙ্কও খুশি হয়েছিল। আইনমাফিক কেনাবেচা। স্বেচ্ছায় রেজিস্ট্রি করেছিল ও। ম্যাক্স ব্লাঙ্ক যে ক্যাম্পে দুর্ঘটনায় পড়ে যায়? একটা চোখ হারিয়ে, একটা হাত ভেঙ্গে এবং অন্যান্যভাবে নিজেকে জখম করে ফেলে? এটা একটা দুঃখজনক ঘটনা। থ্যাবড়া-পাওয়ালা লোকেরা সহজেই পড়ে যায়। নয়েবাউয়ের নিজে ওসব দেখেনি। এমন কি সে নিজে হাজিরও ছিল না। কোন হুকুমও সে দেয়নি। সে শুধু ওকে যাতে নিরাপত্তামূলক আশ্রয়ে রাখা হয়? সেইটুকু ব্যবস্থা করেছিল; যাতে অত্যুৎসাহী ঝটিকাবাহিনীর লোকেরা ওর কোন ক্ষতি করতে না পারে। তারপর যা কিছু ঘটেছিল সেটা হ্বেবারের ব্যাপার।
ও ঘুরে দাঁড়ায়। হঠাৎ ওই পুরোনো কথাটা ভাবছে কেন? কি হল তার? অনেক দিন আগেই এসব কথা সে ভুলে গেছে। বাঁচতে হবে তো! ও যদি বাড়িটা না কিনত? তাহলে পার্টির অন্য কেউ সেটা কিনে নিত। আরও কম দামে; বিনামূল্যেই। সে তো আইনমাফিক কাজই করেছে। ফ্যুরের নিজেই বলেছেন তাঁর বিশ্বস্ত শিষ্যদের পুরস্কার দেয়া উচিত। আর বড় বড় হোমরা-চোমরারা যা পাচ্ছেন তার তুলনায় সে, ব্রুনো নয়েবাউয়ের, কতটুকু পেয়েছে? গোয়েরিঙ বা প্রিংগারের কথাই ধরা যাক না? ঘোড়ামুখো প্রিংগার তো হোটেলের কুলি থেকে কোটিপতি হয়েছে। নয়েবাউয়ের তো চুরি করেনি কিছু। সে শুধু সস্তায় কিনেছে। রসিদ দিয়ে।
রেলস্টেশন থেকে আগুনের একটা শিখা জেগে উঠল। তারপরেই ঘটল বিস্ফোরণ। খুব সম্ভব গোলাবারুদের ওয়াগন। বাতিটার গা থেকে যেন হঠাৎ রক্ত বেরুলো ঘেমে। হাস্যকর! নয়েবাউয়ের ভাবে, সত্যিই দেখি নার্ভাস হয়ে পড়েছি। যে সব ইহুদি আইনজীবীদের সেই সময় ওপরের ওখান থেকে টেনে বার করে আনা হয়েছিল? সেসব নাম অনেক দিন আগেই ভুলে যাওয়া হয়েছে। গাড়িতে ফিরে যায় ও। স্টেশনের কাছটা- ব্যবসার পক্ষে খুব ভালো, কিন্তু বোমা পড়ার সময় নিদারুন বিপজ্জনক জায়গা। লোকে যে নার্ভাস হবে এ তো স্বাভাবিক।
‘গ্রসস্ট্রাস, আলফ্রেড।’
মেলার্ন সংবাদপত্রের বাড়িটার কোন ক্ষতি হয়নি। খবরটা টেলিফোনে আগেই শুনেছে নয়েবাউয়ের। একটা অতিরিক্ত সংস্করণ এখনই বার করছে ওরা। বিক্রেতাদের হাত থেকে কাগজ ছিনিয়ে নিচ্ছে লোকেরা। সাদা কাগজের পাঁজাগুলো নিমেষেই উধাও হয়ে যাচ্ছে। প্রতিটি কাগজের এক ফেনিস৪ ওর। নতুন কাগজের পাঁজা নিয়ে নতুন বিক্রেতারা আসছে। সাইকেলে চড়ে ওরা ছুটছে। অতিরিক্ত সংস্করণ মানে বাড়তি পয়সা। নয়েবাউয়ের গুনেছে সতেরো জন। প্রত্যেক বিক্রেতার কাছে অন্তত দুশো কাগজ। তার মানে চৌত্রিশ মার্ক বাড়তি রোজগার। অন্তত কিছু ভালো তো এ থেকে হচ্ছে। ফাটা জানালার কয়েকটার দাম দিতে পারবে তো! দূর ছাই, কি বাজে চিন্তা; ওগুলো তো ইনসিওর করা আছে। অর্থাৎ, ইনসিওরেন্স কোম্পানী যদি যাবতীয় ক্ষতিপূরণের টাকাটা দেয় ওরা দেবেই। অন্তত ওকে। চৌত্রিশটা মার্ক নিট রোজগার।
একটা অতিরিক্ত সংস্করণও কিনল। ডিৎসের একটা সংক্ষিপ্ত আবেদন এরই মধ্যে ওতে এসে গেছে। দারুণ কাজ। তার সঙ্গে রয়েছে একটা রিপোর্ট? শহরের উপর দুটি বিমানকে গুলি করে নামানো হয়েছে, বাকিগুলোর অর্ধেক নামানো হয়েছে সিনডেন, ওসনাব্রুয়েক আর হ্যানোভারের। শান্তিপূর্ণ জার্মান শহরগুলির উপর বোমাবর্ষণের অমানুষিক বর্বরতা সম্বন্ধে গোয়েবলসের একটা নিবন্ধও আছে। ফুয়েরার অল্প কয়েকটি চোখা চোখা কথা। যেসব বৈমানিক প্যারাশুট করে নেমেছে তাদের খুঁজে বেড়াচ্ছে হিটলারের যুববাহিনী, তার আরেকটা রিপোর্ট। কাগজটা ছুঁড়ে ফেলে দিয়ে মোড়ের চুরুটের দোকানটায় ঢোকে নয়েবাউয়ের। ‘থ্রি জার্মান সোল্জার্স’ সে হুকুম দেয়।
বিক্রেতা চুরুটের বাক্সটা এগিয়ে দেয়। নিস্পৃহভাবে চুরুট বাছতে থাকে নয়েবাউয়ের। চুরুটগুলো বাজে। নির্ভেজাল বীচপাতা। বাড়িতে আরও ভালো জিনিস আছে তার; প্যারিস আর হল্যাণ্ডের মাল। জার্মান ফৌজীর অর্ডার দিয়েছে শুধু দোকানটা নিজের বলে। অভ্যুত্থানের আগে দোকানটা ছিল লেসের ও সাক্টদ্রের ইহুদি কোম্পানী। তারপর স্টর্ম-লীডার ফ্রাইবার্গ ওটা হাতিয়েছিল। ১৯৩৬ পর্যন্ত সে-ই ছিল মালিক। বলতে গেলে সোনার খনি। একটা জার্মান ফৌজীর কোনা চিবিয়ে কাটে ও। ফ্রাইবার্গ যদি কফি খেতে খেতে ফ্যুরের সম্বন্ধে কোন বিদ্রোহাত্মক উক্তি করে থাকে? তাতে নয়েবাউয়েরের কি করার আছে ? একজন সৎ পার্টি-সভ্য হিসেবে ওর কর্তব্য হল কর্তৃপক্ষকে সে-কথা জানানো। ক’দিন পরেই ফ্রাইবার্গ নিখোঁজ হয়ে গেল, আর তার বিধবার কাছ থেকে নয়েবাউয়ের দোকানটা কিনে নিল। দোকানটা তাড়াতাড়ি বিক্রি করে দেয়ার উপদেশও সে-ই তাকে দিয়েছিল। ফ্রাইবার্গের সম্পত্তি বাজেয়াপ্ত হয়ে যাবে বলে খবর পেয়েছে- এই কথাটুকু শুধু ও তাকে জানিয়েছে। মহিলাটি কৃতার্থ হয়ে দোকানটা বিক্রি করে দেয়। সিকি দামে। নয়েবাউয়ের অবশ্য বলেছিল যে সে অবস্থাপন্ন নয়, আর ব্যাপারটাও তাড়াতাড়ির। বিধবা ঝুঝতে পেরেছিল। বাজেয়াপ্ত অবশ্য কখনও হয়নি। কিন্তু সত্যি সত্যিই বাজেয়াপ্ত হতে পারত। তাছাড়া বিধবা ওটা চালাতেও পারত না। আরও কম টাকায় কেউ ওটা বাগিয়ে নিত।
মুখ থেকে চুরুটটা বার করে নেয় নয়েবাউয়ের। ধোঁয়া আসছে না। বাজে মাল। কিন্তু লোকে কেনে। ধোঁয়া টানার মতো যা হোক কিছু হলেই হল। লোকে তারই জন্য পাগল। কি আফসোস, তাও আবার রেশন। নাহলে বিক্রিটা দশগুণ হত। আবার একবার ও দোকানটার দিকে তাকাল। দারুন বরাত। হঠাৎ মুখটা বিস্বাদ হয়ে যায় ওর। নিশ্চয়ই চুরুটটা বাজে। তাছাড়া আর কি হতে পারে? যাই হোক, শেষ পর্যন্ত কিছু হয়নি, স্নায়ুর ব্যাপার? হঠাৎ ওইসব পুরোনো কথাগুলো ও ভাবছে কেন? সেই অনেক আগেকার পুরোনো কাজটা। আবার গাড়িতে ওঠার সময় চুরুটটা ও ফেলে দিল, আর বাকি দুটো দিল ড্রাইভারকে। ‘ধর আলফ্রেড। আজ রাতের জন্য বিশেষ করে। চল, এবার যাওয়া যাক বাগানে।’
বাগানটা নয়েবাউয়ের গর্বের জিনিস। শহরের বাইরের দিকে বেশ বড় একটা জমি। বেশির ভাগটাতেই শাক-সবজি আর ফলের চাষ। বাগিচাও আছে, আর আছে পোষা পশু। ক্যাম্প থেকে আনা গোটাকতক রুশ ক্রীতদাস সব-কিছু দেখাশোনা করে। পয়সা লাগে না, বরং ওদেরই উচিত নয়েবাউয়েরকে পয়সা দেয়া। তামা গালানোর কারখানায় বারো থেকে পনেরো ঘণ্টা কঠোর পরিশ্রম করার বদলে এই কাজ তো হালকা; খোলা বাতাসও পাওয়া যায়!
অন্ধকার ঘনিয়ে এসেছে বাগানে। এদিকটায় আকাশটা পরিষ্কার। আপেল গাছগুলোর উপর চাঁদ ঝুলছে। সদ্য কোপানো মাটির গন্ধে ভুরভুর বাতাস। চষা মাটির খাঁজে মাথা তুলছে নতুন সবজি, ফলগাছে ফুটন্ত কুঁড়ি। সারা শীত কাঁচঘরে থেকে এখন সাদা ও গোলাপী রঙে ভরে গেছে ছোট জাপানী রেরিগাছ- মঞ্জুরী উঁকি দিতে শুরু করেছে লাজুক ডগায়।
জমিটার উল্টা দিকের অংশে রুশগুলো কাজ করছে। ওদের ঝুঁকে-পড়া অন্ধকার পিঠ আর রাইফেল হাতে প্রহরীর কালো ছায়ামূর্তিটা নয়েবাউয়ের দেখতে পায়। বন্দুক আঁটা বেয়নেটগুলো যেন আকাশ ফুঁড়ে দেবে। প্রহরীরা আছে শুধু নিয়মরক্ষার জন্য। রুশরা পালায় না। গায়ে জেল-আবাস, ভাষা বোঝে না, যাবেই বা কোথায়? ওদের সঙ্গে আছে একটা বড় কাগজের জাগ, ক্রিমেটারিয় ম থেকে পাওয়া ছাইয়ে ভরতি। খাঁজকাটা জমি-বরাবর ওরা সেই ছাই ছড়াচ্ছে। ঐ কাগজের ব্যাগগুলোয় রয়েছে ষাট জন মানুষের ছাই, তার মধ্যে বারোটা শিশু।
গোধুলির অপরিষ্কার আলোয় বাসন্তীফুল আর নার্সিসাসগুলো চিকচিক করছে। দক্ষিণের দেয়াল-বরাবর লাগানো। একটা জানালা খুলে নয়েবাউয়ের ঝুঁকে পড়ে। নার্সিসাসগুলোয় এখনও গন্ধ আসেনি। তার বদলে ভায়োলেটের গন্ধ, গোধুলিতে অদৃশ্য ভায়োলেট।
বুক ভরা নিশ্বাস নেয় ও। এই বাগান তার। নিজে এর জন্য দাম দিয়েছে, আর ঠিকমতো। সাবেক কালের মতো আর সৎভাবে। পুরো দাম। কারও কাছ থেকে এটা ও ছিনিয়ে নেয়নি। এই জায়গাটা তার। পিতৃভূমির জন্য কঠোর সেবা আর সংসারের জন্য ভাবনার পর যে-জায়গায় সে এসে মানুষ আবার মানুষ হয়ে ওঠে। পরম তৃপ্তিতে ও চারদিকে তাকায়। লতাবিতানটার দিকে তাকায় ও, হনিসাক্ল আর লতানে গোলাপে ছেয়ে গেছে; চোখে পড়ে বাক্সে তৈরি করা কাঁটাগাছ, ঝামা পাথরের নকল গুহা, লাইল্যাক ঝোপ। ঝাঁঝালো বাতাসের গন্ধ পায়, ইতোমধ্যেই তাতে বসন্তের ছোঁয়া লেগেছে। বাগানের জাফরি-দেওয়ালের গায়ে পি আর ন্যাসপাতি গাছের বিচুলি ঢাকা গুঁড়িগুলোর আদর করে ও হাত বুলায়, তারপর ছাউনিতে যাওয়ার দরজাটা খোলে।
মুরগিগুলোর দিকে ও গেল না। কাঠের উপর বুড়িদের মতো ওরা থেবড়ে বসে আছে। গোয়ালে যে বাচ্চা শুয়োরদুটো ঘুমোচ্ছে তাদের দিকেও গেল না?ও গেল খরগোশগুলোর দিকে।
সাদা আর ধূসর আঙ্গোরা খরগোশ, গায়ে লম্বা লম্বা রেশমের মতো লোম। ও যখন আলোটা জ্বালাল তখন সেগুলো ঘুমোচ্ছে। তার তারা আস্তে আস্তে নড়তে শুরু করল। তারের জালের ভিতর দিয়ে একটা আঙ্গুল ঢুকিয়ে ওদের লোমে সে হাত বুলোতে থাকে। কি নরম! এর থেকে নমর কিছু ওর জানা নেই। একটা ঝুড়ি থেকে বাঁধাকপির পাতা আর শালগমের টুকরো নিয়ে খাঁচার মধ্যে ঢুকিয়ে ঢুকিয়ে দেয়। খরগোশগুলো এগিয়ে এসে আস্তে আস্তে ধীরে ধীরে গোলাপী মুখ দিয়ে কুপকুপ করে খেতে শুরু করে। ‘পুঁচকি, পুঁচকি, এদিকে এদিকে, ও সুর করে ডাকে।
একটা বড় সাদা রঙের মদ্দা খরগোশ নমর নরম ঠোঁটে করে ওর হাত থেকে পাতা নেয়। লাল চোখদুটো উজ্জ্বল চুনির মতো ঝকঝম করে। নয়েবাউয়ের তার ঘাড়ে আদর করে চাপড় দেয়। ঝুঁকে পড়ার সময় ওর জুতোটা মচমচ করে ওঠে। সেলমা কি যেন বলেছিল? নিরাপদ? ওখানে ক্যাম্পে তুমি নিরাপদ আছ? কে নিরাপদে আছে বল তো? কোনদিন সত্যিই কি সে নিরাপদে থাকতে পেরেছে?
তারের জালের ভিতর দিয়ে আরও বাঁধাকপির পাতা ও ঢুকিয়ে দেয়। ওর মনে পড়ে বার বছর হয়ে গেল। বার বছরে আগে। বিপ্লবের আগে আমি ছিলাম পোস্ট-অফিসের কেরানি, মাসে বড় জোর দুশ মার্ক বেতন। তাতে বাঁচাও যায় না, মরাও যায় না। এখন যা-হোক কিছু হয়েছে। সেসব আমি হারাতে চাই না আবার।
মদ্দা খরগোশটার লাল চোখদুটোর ভিতর ও তাকায়। আজ সব কিছুই বেশ ভালো হয়েছে। ভালোই চলবে। বোমাটা বোধ হয় ভুল করেই ফেলা হয়েছে। নতুন গড়া বাহিনীতে ওইরকম ঘটেই থাকে। শহরটার গুরুত্ব নেই কিছু; তাহলে তো আগেই ওরা এটাকে ধ্বংস করার চেষ্টা করত। মেজাজটা ঠাণ্ডা হচ্ছে নয়েবাউয়ের বুঝতে পারে। ‘পুঁচকি!’ ও ডাকে, তারপর ভাবতে থাকে। নিরাপদ? অবশ্যই নিরাপদ! শেষ মুহূর্তে কে চায় হুড়মুড়িয়ে ভেঙ্গে পড়তে?
৫.
‘শালা, শুয়োরের বাচ্চা! আবার গান!’
নাম-ডাকার মাঠে নিয়ম অনুযায়ী কড়া সমাবেশ। ব্লক হিসেবে দশ জনের এক একটা কলাম করে বড় ক্যাম্পের মজুর-গ্যাঙগুলো দাঁড়িয়ে। এর মধ্যেই অন্ধকার হয়ে গেছে। ডোরাকাটা পোশাক-পরা কয়েদিগুলোকে পরিশ্রান্ত জেব্রার বড় বড় পালের মতো দেখাচ্ছে।
এক ঘণ্টার উপর নাম-ডাকা হয়ে গেছে, কিন্তু হিসাব মিলছে না। তামা-গালানোর কারখানায় যে মজুর গ্যাঙগুলো কাজ করে তাদের ক্ষয়ক্ষতি হয়েছে। তাদের ডিভিশনে বোমা পড়েছিল একটা; অনেক হতাহত। তার উপর প্রথম ধাক্কাটা পার হতেই যে-সব কয়েদি আড়ালে আশ্রয় নিয়েছিল, তাদের উপর খবরদারি করা ঝটিকাবাহিনীর লোকেরা গুলি চালাতে শুরু করেছিল। ওরা পালাতে পারে বলে ভয় ছিল। ফলে আরও জনাচারেক খতম হয়ে গিয়েছে।
বোমা পড়ার পর ওরা ইট কাঠ আর ধ্বংস্তূপের নিচে থেকে তাদের মৃত সঙ্গীদের দেহগুলো টেনে-হিঁচড়ে বার করেছে? বা তাদের দেহের অবশিষ্টাংশগুলো। নামডাকার সময় সেটারও দরকার। কয়েদিদের জীবনের কোন দাম নেই, তার উপর এস-এসরাও ভ্রƒক্ষেপহীন; নাম-ডাকার সময় জীবিতই হোক বা মৃতই হোক, সংখ্যাটা মেলা চাই। আমলাতন্ত্রের হাত থেকে মড়ারও রেহাই নেই।
মজুর গ্যাঙগুলো যা কিছু হাতের কাছে পেয়েছে- যতœ করে সঙ্গে নিয়েছে; কেউ নিয়েছে একটা হাত, কেউ নিয়েছে পা; কেউ আলাদা হয়ে-যাওয়া মুণ্ডু। যে কটা স্ট্রেচার কোনমতে বানাতে পেরেছিল তাতে তোলা হয়েছে সে-সব আহতদের যাদের হাত-পা উড়ে গেছে বা পেট ফেটে নাড়িভুঁড়ি বেরিয়ে গেছে। অন্য আহতদের যতটা সম্ভব নিজেদের উপর ভর রেখে টানতে টানতে নিয়ে এসেছে। অল্প কজনকেই ব্যাণ্ডেজ বাঁধা সম্ভব হয়েছে; ব্যাণ্ডেজ বাঁধার মতো বিশেষ কিছু পাওয়া যায়নি বলেই। রক্তস্রাবে যারা মরতে বসেছে- তার দিয়ে তাড়াতাড়ি তাদের বাঁধন দেয়া হয়েছে। পেটে যাদের আঘাত লেগেছে তাদের নিজেদের হাতেই নিজেদের নাড়িভুঁড়ি ধরে রাখতে হয়েছে স্ট্রেচারে শোয়া অবস্থায়।
পাহাড় বেয়ে কষ্টেসৃষ্টে মিছিলটাকে উঠতে হয়েছে। পথে মারা গেছে আরও দুজন।
Bangla Book By Humayun Ahmed
Humayun Ahmed (Bangla: হুমায়ূন আহমেদ) (born 1948) is arguably the most popular Bengali writer of fiction and drama, and had a “meteoric rise in Bangla literature” since the publication of his first novel, Nondito Noroke.[1] A prolific writer, he has been publising since the early 1970s. Formerly a professor of Applied Chemistry at the University of Dhaka, Bangladesh, he is now a full-time author and movie-maker.
All Books By Humayun Ahmed is Available in Online Bangla Library
* Lilaboti (2006)
* Kobi (Poet)
* Nondito Noroke (In A Blissful Hell)
* Shongkhoneel Karagar
* Mondroshoptok
* Durey Kothay (Far Away)
* Sourav (Fragrance)
* Nee
* Phera(Return)
* Krishno Paksha (Dark Moon)
* Saajghar(Dressing Room)
* Bashor
* Gouripur Junction (Gouripur Junction)
* Nripoti (Emperor)(Drama)
* Omanush (Inhuman)(Adaptation of Man on Fire (novel) by A. J. Quinnell)
* Bohubrihi
* Eishob Din Ratri (These days and nights)
* Ashabori
* Daruchini Dwip(Daruchini Island)
* Shuvro
* Nokhkhotrer Raat (Starry Night)
* Nishithini
* Amar Achhey Jol (I Have Tears)
* Kothao Kew Nei (No One No where)
* Aguner Parashmony (Philosopher stone of fire)
* Srabon Megher Din
* Akash Jora Megh
* Mohapurush (Great Man)
* Rupali Dwip(Silver Island)
* Kalo Manus (Black man)
* Ke Kotha Koy (Who’s Talking)
* Maddhanya (2007) (Noon)
* Maddhanya 2 (2008) (Noon)
* Eshtishon(Station)
* The Exorcist (Adaptation of The Exorcist by William Peter Blatty, published from Sheba Prokashoni)
* Moddhanya Akhanda (2008)
* Tithir nil tualey (Tithi’s blue towel)
* Mrinmoyee
* Mrinmoyeer mon valo nei
* Noboni
* Kuhurani
* Aj chitrar biye (Today is Chita’s marriage ceremony)
* Tumi amay dekechile chutir nimontrone (When u invited me in the vacation)
* Shedin choitromash (That was the month of choitro)
* Prothom prohor
* Opekkha (The waiting)
* Oporanno (Afternoon)
* Aj ami kuthao jabona (I will not go anywhere today)
* Ondhokarer gan (Song of the dark)
* Jokhon dube jabe purnimar chad
* Chader aloy koyekjon jubok (Some young people in the moonlight)
* Tetul bone juchona
* Jodio shondha
* Ai! Shuvro, Ai!
* Onnodin
* Tumake (To you)
* Ononto ombore
* Pakhi amar akla pakhi
* Nil oporajita (Blue flower)
* Dui duari
* Brishti bilash
* Nil manush (Blue man)
* Jonom jonom
* Jolpoddo
* Jol juchona (Watery moonlight)
* Shomudro bilash
* Chaya shongi (Shade mate)
* Megher chaya (Shade of clouds)
* Priyotomeshu (Dear)
* akjon mayaboti
* Mirar gramer bari (Village of Mira)
* Choitrer ditio dibosh (Second day of choitro)
* Amar chelebela (My childhood days)
* Kichu shoishob (Some childhood days)
* Dekha odekha (Seen unseen)
* Cheleta (That boy)
* Lilua batash
* Asmanira tin bun
* Pencil a aka pori (A fairy drawn by pencil)
* Uralponkhi
Books on liberation war
* 1971
* Aguner Parashmoni
* Shyamal Chhaya
* Anil Bagchir Ekdin
* Jostnya O Jononeer Golpo (tr. The story of Mother and moonlit night)
Misir Ali books
Misir Ali, the character of Humayun Ahmed, a very intelligent lonely professor of Psychology at the University of Dhaka unveils secrets.
* Debi
* Nishithini
* Nishad
* Onish
* Brihonnola
* Bipod
* Misir Alir Omimangshito Rohoshso
* Ami Ebong Amra
* Tandra Bilash
* Ami e Misir Ali
* Kohen Kobi Kalidash
* Voy (Story collection)
* Bagh-Bondi Misir Ali
* Misir Ali’r Choshma (2008)
* Misir Ali! Apni Kothai?(2009)
Himu Series
* Moyurakkhi-(1990)
* Darojar Opashe-(1992)
* Himu-(1993)
* Parapar-(1993)
* Ebong Himu-(1995)
* Himur Hatay Koyekti Nill Poddo-(1996)
* Himur Ditiyo Prohor-(1997)
* Himur Rupali Ratri-(1998)
* Ekjon Himu Koekti Jhijhi Poka-(1999)
* Tomader Ei Nogore-(2000)
* Chole Jay Bosonter Din-(2002)
* Shey Ashe Dhire-(2003)
* Himu Mama-(2004)
* Angool Kata Joglu-(2005)
* Halud Himu Kalo RAB-(2006)
* Aj Himur Biye-(2007)
* Himu Rimande-(2008)
* Himur Moddhodupur-(2009)
Comedy
* Tara tin jon
* Abaro tin jon
Science Fiction
* Tomader Jonno Valobasa (Love For You All)
* Anonto Nakhatrobithi
* Fiha Sameekaran (Equation Fiha)
* Erina
* Kuhok (Enchantment)
* Ema
* Omega Point
* Shunyo (Zero)
* Onno Bhuban (The Other World)
* Ditio Manob
* Ahok (Collection)
* Manobi
Supernatural
* Advut Sob Golpo
* Kalo Jadukar
* Pipli Begum
* Kani Daini
* Kutu Miah
* Poka (Insect)
* Parul o tinti kukur
* Nil hati
* Bhoot bhutong bhutou
* Mojar bhoot
Satire
* Elebele (1990)
* Elebele 2 (1990)
Scientific writings
* Quantum Rosayon
Poems
* Grehothagi Josna (Kakoli Prokasoni)
টক, মিষ্টি, ঝালে ভালবাসা- রিমা জুলফিকার
ভ্যালেন্টাইন চকোলেট

উপকরণ
গুঁড়োদুধ ১২৫ গ্রাম, ঘি ৫০ গ্রাম, ওভালটিন ৫০ গ্রাম, মালটোভা ৫০ গ্রাম, পামঅয়েল সামান্য, ঘি ২৫ গ্রাম, ডিম ১টি, চিনি ২ কাপ।
প্রণালী
চিনি ঘন সিরা করুন। ঘি ভালো করে মিশিয়ে গুঁড়োদুধ দিয়ে মিলিয়ে নিন। ওভালটিন, মালটোভা ডিম দিয়ে নাড়তে থাকুন। অন্যপাত্রে ঘি ব্রাশ করে ওই পাত্রের লেয়ারে ঢেলে ঠান্ডা হলে পিস পিস করে কাটুন।
আমেরিকান চপস্কায়ে

উপকরণ
নুডলস ১ প্যাকেট, চিকেন আধা কাপ, চিংড়ি আধা কাপ, পেঁয়াজ ৪/৫টি, গাজর ১টি, কাঁচামরিচ ৪/৫টি, ডিম ১টি সেদ্ধ, সয়াসস ১ চা-চামচ, চিকেন স্টক ২/৩ কাপ, টমেটো চিলি সস ৬ টেবিল চামচ, গোলমরিচ গুঁড়ো আধা চা-চামচ, রসুন বাটা আধা চা-চামচ, টেস্টি সল্ট ১ চা-চামচ, চিজ গ্রেট আধা কাপ, তেল ৬ টেবিল চামচ, চিনি ২ চা-চামচ, লবণ স্বাদমতো।
প্রণালী
নুডলস সেদ্ধ করে নিন। প্যানে তেল দিয়ে পেঁয়াজ কুচি, কাঁচামরিচ, মসলা, চিংড়ি, চিকেন, টমেটো সস ও চিকেন স্টক দিন। এরূপ কর্নফ্লাওয়ার ও গোলমরিচ গুঁড়ো দিন। এবার নুডলস পাত্রে ঢেলে ওপরে সেদ্ধ ডিম সুন্দর করে কেটে, শসা, টমেটো দিন। চিজ কেটে দিয়ে পরিবেশন করুন।
ফ্রায়েড ওয়ালটন

উপকরণ
হাড়ছাড়া মুরগি ২০০ গ্রাম, ছাড়ানো চিংড়ি ৫০ গ্রাম, সয়াসস ২ চামচ, শেরি ১ টেবিল চামচ, পেঁয়াজ-শাক কুচি ৫/৬ টেবিল চামচ, ময়দা ৫০০ গ্রাম, ডিম ২টি।
সুইট অ্যান্ড সাওয়ার সস : তেল ১ টেবিল চামচ, ভিনিগার ২ টেবিল চামচ, সয়াসস ১ টেবিল চামচ, টমেটোর রস ২ টেবিল চামচ, কর্নফ্লাওয়ার ২ চামচ, চিনি ১ টেবিল চামচ, পানি ২ চামচ।
প্রণালী
সস তৈরির জন্য তেল গরম করে তাতে টমেটোর রস, ভিনিগার, চিনি ও সয়াসস দিন। এতেই কর্নফ্লাওয়ার পানিতে গুলে ঢেলে দিন। ঘন হলে নামান। ওয়ালটন তৈরির জন্য মুরগি সরু সরু করে কেটে নিন। পেঁয়াজ-শাক, চিংড়ি, সয়াসস, চিনি, শেরি, মাংস একসঙ্গে মিশিয়ে আধা ঘণ্টা রাখুন। ময়দায় পানি ও প্রয়োজনমতো লবণ দিয়ে মেখে ছোট ছোট লেচি কেটে বেলে নিন। মাঝখানে মাংসের একটু করে পুর দিয়ে মুড়ে দুদিকে আটকে দিন। এভাবে সবগুলো তৈরি করে ফেলুন। তেল গরম করে তাতে দু’তিনটে ওয়ালটন দিয়ে ভেজে নিন। গরম গরম সুইট অ্যান্ড সাওয়ার সস দিয়ে পরিবেশন করুন।
ভ্যালেন্টাইন কেক

উপকরণ
ডিম ৪টি, ময়দা আধা কাপ, গুঁড়োদুধ এক টেবিল চামচ, বেকিং পাউডার আধা চা-চামচ, চিনি আধা কাপ, ভেনিলা এসেন্স আধা চা-চামচ, বাটার অয়েল এক টেবিল চামচ, সফট ক্রিম ও সিরাপ পরিমাণমতো।
ক্রিমের জন্য : বাটার ২০০ গ্রাম, আইসিং সুগার ১০০ গ্রাম।
সিরাপের জন্য : পানি ২০০ গ্রাম, চিনি ২ টেবিল চামচ, ভেনিলা এসেন্স আধা চা-চামচ, বাটার অয়েল ১ টেবিল চামচ।
প্রণালী
ক্রিম তৈরির জন্য ক্রিমের সব উপকরণ একসঙ্গে নিয়ে ১০-১৫ মিনিট বিট করুন। সিরাপ তৈরির জন্য সিরাপের সব উপকরণ একসঙ্গে নিয়ে জ্বাল দিন। ময়দা, বেকিং পাউডার, গুঁড়োদুধ একসঙ্গে চালুন। ডিমের সাদা অংশ ফেটিয়ে চিনি দিন। ডিমের কুসুম ও ভেনিলা দিয়ে আরও কিছুক্ষণ ফেটান। এবার ময়দা করে মেশান। এর মধ্যে বাটার অয়েল মিশিয়ে বেক করে নিন।
¤ বৈশাখী মিষ্টি খাবার
নিমকির পায়েস

উপকরণ
কুচো নিমকি, দুধ ২ লিটার, পেস্তাবাদাম ১ টেবিল চামচ, কেওড়া জল ১ টেবিল চামচ, চিনি স্বাদমতো।
প্রণালী
দুধ জ্বাল দিয়ে ঘন করে নিমকি কুচি, চিনি, কেওড়া জল দিয়ে নাড়তে থাকুন। নামানোর আগে পেসত্মাবাদাম এবং গোলাপ পাপড়ি দিয়ে পরিবেশন করুন।
লাউ পায়েস

উপকরণ
লাউ ৫০০ গ্রাম, দুধ ১ লিটার, চিনি ২০০ গ্রাম, ঘি পরিমাণমতো, কিশমিশ ৫০ গ্রাম, এলাচ ২টা, কাজুবাদাম ৫০ গ্রাম।
প্রণালী
লাউ কুচি কুচি করে কেটে হালকা ভাপ দিয়ে ঘিয়ে ভেজে নিন। এবার ভাজা লাউ, দুধ, চিনি ও তেজপাতা কম তাপে ফোটাতে থাকুন। কিছু সময় পর কাজুবাদাম, কিশমিশ দিয়ে আরও ঘন করুন। ঠান্ডা হলে কাজুবাদাম দিয়ে পরিবেশন করুন।
কুলফি

উপকরণ
অ্যারারুট ২ টেবিল চামচ, দুধ ১ লিটার, চিনি ২০০ গ্রাম, কেওড়া জল পৌনে এক গ্রাম, পেস্তা এবং বাদাম ২০ গ্রাম, মালাই পরিমাণমতো।
প্রণালী
কুলফি তৈরি করার ছাঁচ ভালো করে গরম পানি ও সাবান দিয়ে ধুয়েমুছে নিন। পাত্রে দুধ ফুটিয়ে ক্ষীরের মতো ঘন করুন। তারপর চিনি দিয়ে আরও কিছু সময় নেড়ে চুলা থেকে নামিয়ে ঠান্ডা করুন। এবার পেসত্মাবাদাম, কেওড়া জল এবং মালাই এক সঙ্গে মিশিয়ে নিন। এখন ছাঁচের মধ্যে কুলফি পুরে মুখ ভালো করে বন্ধ করে ডিপ ফ্রিজে রাখুন ৫ থেকে ৬ ঘণ্টা। নির্দিষ্ট সময় পর ছাঁচ থেকে বের করে নিন।
ছানার সন্দেশ

উপকরণ
ছানা ১ কেজি, চিনি ২৫০ গ্রাম।
প্রণালী
কড়াই গরম করে ছানা দিন। মৃদু আঁচে মিনিটখানেক রেখে চিনি দিয়ে নাড়তে থাকুন। চটচটে হয়ে এলে নামিয়ে ঠান্ডা হতে দিন। ভালো করে মাখুন। সন্দেশের ছাঁচে ফেলে সাজিয়ে নিন।
¤ নাকফুলে ফ্যাশন – ফ্যাশনে নাকফুল
- জাকিয়া আহমেদ

বাইবেলে লেখা আছে, ভূমধ্যসাগরীয় অঞ্চলে ছেলের বউ রেবেকাকে স্নেহ এবং ভালবাসার চিহ্নস্বরূপ নাকফুল উপহার দেন আব্রাহাম। এ ঘটনা প্রায় ৯ হাজার বছর আগের। কিছুদিন পর থেকেই বেদুইন এবং যাযাবরদের মাধ্যমে চারদিকে ছড়িয়ে পড়ে নাকে গয়না পরার রীতি। আর ষোড়শ শতকে ভারতীয় উপমহাদেশে মুঘলদের আগমনের পরই এ অঞ্চলে শুরু হয় মেয়েদের নাক ফোঁড়ানোর রেওয়াজ।
আমাদের দেশে প্রচলিত ধারণা হলো- নাকফুল কেবল বিবাহিত নারীর জন্যই। অর্থাৎ শুধু তারাই নাকফুল পরবেন, যাদের বিয়ে হয়েছে। কিন্তু সময়ের পরিবর্তনে এ ধারণা আজ দূর হতে চলেছে।
হালে কিশোরী থেকে তরুণী শাড়ি তো বটেই, সালোয়ার-কামিজ, স্কার্ট-টপস, এমনকি জিন্স-ফতুয়ার সঙ্গে নাকে ঝিলিক দেওয়া একটা পাথর নিয়ে দেদার ঘুরে বেড়াচ্ছে। বিবাহিত নারীর চিহ্ন- এই কুসংস্কার থেকে বেরিয়ে নাকফুলের ফ্যাশনটাই এখন সবার কাছে বড় হয়ে উঠেছে।
আমাদের দেশে প্রচলিত রীতি অনুযায়ী সবাই নাকফুল পরে বাঁ নাকে। তবে এর ব্যতিক্রমও আছে। জনপ্রিয় অভিনেত্রী ববিতা প্রচলিত সেই রীতির বাইরে গিয়ে ডান নাকে নাকফুল পরার ফ্যাশন চালু করেছিলেন। ববিতাকে অনুসরণ করে অনেকেই তখন ডান নাকে নাকফুল পরতেন।
ববিতার যুগ থেকে চলে আসি হাল আমলে। এ সময়ের জনপ্রিয় অভিনেত্রী এবং মডেল নোভা। সব সময় নাকে পরেন একটি হীরার নাকফুল। নোভা বলেন, পুরো মুখের মাঝখানে ঝলমল করে যদি একটি পাথর জ্বলতে থাকে তাহলে তো আমার মনে হয় পুরো মুখের সৌন্দর্যে এক আলাদা দ্যুতি খেলা করে।
ফ্যাশন হাউস কে ক্র্যাফটের নির্বাহী পরিচালক এবং ফ্যাশনডিজাইনার শাহনাজ খান নাকফুলের ফ্যাশন সম্পর্কে বলেন, নাকফুল এখন ফ্যাশনের এক অন্যতম উপাদান। সব বয়সের নারীরাই এখন নাকফুল পরছে। নাকফুল পরার ব্যাপারে শাহনাজ খানের পরামর্শ হলো, যেকোনও রঙের নাকফুলই আলাদা সৌন্দর্য প্রকাশ করে। আবার পোশাকের রঙের সঙ্গে মিলিয়ে নাকফুল পরলেও আকর্ষণীয় লাগে। তিনি আরও বলেন, তবে সালোয়ার-কামিজ, জিন্স-ফতুয়ার সঙ্গে ভালো লাগে ছোট্ট এক পাথরের নাকফুল কিংবা নথ। অন্যদিকে শাড়ির সঙ্গে ভালো মানায় বড় নাকফুল। নাকে ঝিকিমিকি করা পাথর ফ্যাশন হলেও নাক ফোঁড়ানোর সময় বিশেষ সতর্কতা অবলম্বন করা উচিত- বলছিলেন বিউটি এক্সপার্ট শারমীন কচি। তিনি বলেন, আমরা অনেকে বাড়িতেই মা-চাচিদের হাতে নাক ফোঁড়াই। এটা খুব বিপজ্জনক। নাক ফোঁড়ানোর নির্দিষ্ট একটি স্থান থাকে। সেটি অনেক সময়ই আমরা ঠিকভাবে বুঝতে পারি না। ওপর-নিচ হয়ে যায়। এতে সৌন্দর্যের হানি হয়। তাই দক্ষ হাতে পার্লারে গিয়ে নাক ফোঁড়ানোই বুদ্ধিমানের কাজ। নাক ফোঁড়ানোর পর অনেকেরই অ্যালার্জির সমস্যার কারণে অনেক সমস্যা দেখা দেয়। তাই যাদের অ্যালার্জির সমস্যা আছে তারা এ সময় টক জাতীয় খাবার, বেগুন, গরুর মাংস- এসব খাবার এড়িয়ে গেলে এ জাতীয় সমস্যার হাত থেকে রক্ষা পাবেন। আর ঘা শুকানোর জন্য ভিটামিন-সি জাতীয় খাবার বেশি পরিমাণে খেলে ঘা তাড়াতাড়ি শুকিয়ে
যাবে।
¤ ছাল-ছাড়ান বাঘ – আষাঢ়ে গল্প
- ত্রৈলোক্য নাথ মুখোপাধ্যায়
এইরূপে চারিদিকে আমি দেখিয়া বেড়াইলাম। বলা বাহুল্য যে, আমাকে কেহ দেখিতে পাইল না সূক্ষ্ম শরীর অতি ক্ষুদ্র, হাওয়া দিয়া গঠিত সূক্ষ্ম শরীর কেহ দেখিতে পায় না। একে যমদূতের ভয়, তাহার উপর আবার এই সমুদয় হৃদয়-বিদারক দৃশ্য। সে স্থানে আমি অধিকক্ষণ তিষ্ঠিতে পারিলাম না। আমি ভাবিলাম,-‘দূর কর! বনে গিয়া বসিয়া থাকি। সুন্দরবনে মনুষ্যের অধিক বাস নাই, যমদূতদিগের সেদিকে বড় যাতায়াত নাই, সেই সুন্দরবনে গিয়া বসিয়া থাকি।’
বায়ুবেগে সুন্দরবনের দিকে চলিলাম। প্রথম আমি আমার আবাদে গিয়া উপস্থিত হইলাম। সে স্থানে আমার কোন কর্মচারীকে দেখিতে পাইলাম না। কেহ মাছ, কেহ ঘৃত, কেহ মধু, কেহ পাঁঠা লইয়া তাহারা ‘আমার’ বিবাহে নিমন্ত্রণে গিয়াছিল। সে স্থান হইতে আমি গভীর বনে প্রবেশ করিলাম। দেখিলাম যে, এক গাঙের ধারে একখানি নৌকা লাগিয়া আছে, উপরে পাঁচ ছয়জন কাঠুরিয়া কাঠ কাটিতেছে। তাহাদের সঙ্গে মুগুর হাতে একজন ফকীর আছে। মন্ত্র পড়িয়া ফকীর বাঘদিগের মুখ বন্ধ করিয়া দিয়াছে। নির্ভয়ে কাঠুরিয়াগণ কাঠ কাটিতেছে। সেই স্থানে গিয়া আমি একটি শুষ্ক কাঠের উপর উপবেশন করিলাম। বলা বাহুল্য যে, তাহারা আমাকে দেখিতে পাইল না।
এই স্থানে বসিয়া মনের বেদনায় আমি কাঁদিতে লাগিলাম। অশ্রুজলে আমার বক্ষস্থল ভাসিয়া গেল। না এদিক, না ওদিক, না মরা না বাঁচা, আমার অবস্থা ভাবিয়া আমি আকুল হইলাম। আজ ‘আমি’ সাজিয়া সন্ন্যাসী আমার কন্যাকে বিবাহ করিবে, বাসরঘরে সন্ন্যাসী গান করিবে, তাহার পর ফুলশয্যা হইবে,-ওঃ! আমার প্রাণে সয় না। হায় হায়! আমার সব গেল। হঠাৎ এই সময় মা দুর্গাকে আমার স্মরণ হইল। প্রাণ ভরিয়া মাকে আমি ডাকিতে লাগিলাম। আমি বলিলাম, -‘মা’! তুমি জগতের মা! তোমার এই অভাগা পুত্রের প্রতি তুমি কৃপা কর। মহিষাসুরের হাত হইতে দেবতাদিগকে তুমি পরিত্রাণ করিয়াছিলে, সন্ন্যাসীর হাত হইতে তুমি আমাকে নিস্তার কর। মনসা লক্ষ্মীর কখনও পূজা করি নাই, ঘেঁটু পূজাও করি নাই, কোন দেবতার পূজা করি নাই। কিন্তু এখন হইতে, মা প্রতি বৎসর তোমার পূজা করিব। অকালে তোমার পূজা করিয়া রামচন্দ্র বিপদ হইতে উদ্ধার হইয়াছিলেন। আমিও মা! সেইরূপ অকালে তোমার পূজা করিব। তুমি আমাকে বিপদ হইতে উদ্ধার কর।’ ব্রজের নন্দ ঘোষের স্বজাতি কলিকাতার হরিভক্ত গোয়ালা মহাপ্রভুরা কসাইকে যখন নব প্রসূত গোবৎস বিক্রয় করম্নন, কসাই যখন শিশু বৎসে গলায় দড়ি দিয়া হিঁচড়াইয়া লইয়া যায় তখন সেই দুধের বাছুরটি নিদারম্নণ কাতরকণ্ঠে যেরূপ মা মা বলিয়া ডাকিতে থাকে, সেইরূপ কাতর স্বরে আমিও মা দুর্গাকে ডাকিতে লাগিলাম।
জগদম্বার মহিমা কে জানে! প্রাণ ভরিয়া তাঁহাকে ডাকিলে তিনি কৃপা করেন। জগদম্বা আমায় কৃপা করিলেন। বন হইতে হঠাৎ এক বাঘ আসিয়া কাঠুরিয়াদিগের মাঝখানে পড়িল।
সুন্দরবনের মানুষখেকো প্রকান্ড ব্যাঘ্র! শরীরটি হরিদ্রবর্ণের লোমে আচ্ছাদিত, তাহার উপর কাল কাল ডোরা। এ তোমার চিতে বাঘ নয়, গুল বাঘ নয়, এ বাবা, টাইগার! ইংরাজিতে যাহাকে রয়াল টাইগার বলে, এ সেই আসল রয়াল টাইগার।
এক চাপড়ে একজন কাঠুরিয়াকে বাঘ ভূতলশায়ী করিল, ফকীরের মন্ত্রে তাহার মুখ বন্ধ ছিল, মুখে করিয়া তাহাকে সে ধরিতে পারিল না। সেই স্থানে শুইয়া থাপা দিয়া মানুষটাকে পিঠে তুলিতে চেষ্টা করিল। না মোটা না সরম্ন নিকটে একটা গাছ ছিল। বাঘেরী দীর্ণ লাঙ্গুলটি সেই গাছের পাশে পড়িয়াছিল। একজন কাঠুরিয়ার একবার উপসি’ত বুদ্ধি দেখ! বাঘের লাঙ্গুলটি লইয়া সে সেই গাছে এক পাক দিয়া দিল তাহার পর লেজের আগাটি সে টানিয়া ধরিল।
বাঘের ভয় হইল। বাঘ মনে করিল-মানুষ ধরিয়া মানুষ খাইয়া বুড়া হইলাম, আমার লেজ লইয়া কখন কেহ টানাটানি করে নাই। আজ বাপধন! তোমাদের একি নূতন কা-! পলায়ন করিতে বাঘ চেষ্টা করিল। একবার, দুইবার, তিনবার বিষম বল প্রকাশ করিয়া বাঘ পালাইতে চেষ্টা করিল। কিন’ গাছে লেজের পাক, বাঘ পলাইতে পারিল না। অসুরের মত বাঘ যেরূপ বল প্রকাশ করিতেছিল, তাহাতে আমার মনে হইল যে, বাঃ! লেজটি বা ছিঁড়িয়া যায়। কিন’ দৈবের ঘটনা ঘটিল। প্রাণের দায়ে ঘোরতর বলে বাঘ শেষকালে যেমন এক হ্যাঁচকা টান মারিল, আর চামড়া হইতে তাহার আস্ত শরীরটা বাহির হইয়া পড়িল। অস্থি মাংসের দগদগে গোটা শরীর, কিন্তু উপরে চর্ম নাই! পাকা আমের নীচের দিকটা সবলে টিপিয়া ধরিলে যেরূপ আঁটিটা হড়াৎ করিয়া বাহির হইয়া পড়ে, বাঘের ছাল হইতে শরীরটা সেইরূপ বাহির হইয়া পড়িল, কলিকাতার হিন্দু কসাই মহাশয়েরা জীবন্ত পাঁঠার ছাল ছাড়াইলে চর্মবিহীন পাঁঠার শরীর যেরূপ হয়, বাঘের শরীরও সেইরূপ হইল। মাংস বাঘ রম্নদ্ধশ্বাসে বনে পলায়ন করিল। ফকীর ও কাঠুরিয়াগণ ঘোরতর বিস্মিত হইয়া এক দৃষ্টে হাঁ করিয়া সেই দিকে চাহিয়া রহিল। বাঘের লাঙ্গুল লইয়া গাছে যে পাক দিয়াছিল, লেজ ফেলিয়া দিয়া সেও সেই দিকে হাঁ করিয়া চাহিয়া রহিল। বাঘশূন্য ব্যাঘ্রচর্ম সেই স্থানে পড়িয়া রহিল। আমার কি মতি হইল, গরম গরম সেই বাঘ ছালের ভিতর আমি প্রবেশ করিলাম। ব্যাঘ্র চর্মের ভিতর আমার সূক্ষ্ম শরীর প্রবিষ্ট হইবামাত্র ছালটা সজীব হইল। গা-ঝাড়া দিয়া আমি উঠিয়া দাঁড়াইলাম। গাছ হইতে লাঙ্গুলটি সরাইয়া লইলাম। পাছে ফের পাক দেয়। তাহার পর দুই একবার আস্ফালন করিলাম। পূর্বে তো অবাক হইয়াছিলাম, তাহা অপেক্ষা এখন দশগুণ অবাক হইয়া ফকীর ও কাঠুরিয়াগণ দৌড়িয়া নৌকায় গিয়া উঠিল। তাড়াতাড়ি নৌকা নদীর মাঝখানে লইয়া দ্রম্নতবেগে ভাটার স্রোতে তাহারা পলায়ন করিল।
এখন এই নূতন শরীরের প্রতি একবার আমি চাহিয়া দেখিলাম। এখন আমি সুন্দরবনের কেঁদো বাঘ হইয়াছি- সেই যারে বলে রয়াল টাইগার- ভাবিলাম যে,-এ মন্দ নয়, এখন যাই, এই শরীরে বিবাহ-আসরে গিয়া উপস্থিত হই। এখন দেখি সন্ন্যাসী বেটা কেমন করিয়া আমার কন্যাকে বিবাহ করে। এইরূপ স্থির করিয়া আমি দৌড়িলাম। সাঁতার দিয়া অথবা লম্ফ দিয়া শত শত নদী-নালা পার হইলাম। যে গ্রামে কন্যার বাড়ী সন্ধ্যার সময় তাহার এক ক্রোশ দূরে গিয়া পৌঁছিলাম। দূর হইতে আলো দেখিয়া ও বাজনা-বাদ্যের শব্দ শুনিয়া বুঝিলাম যে, ঐ বর আসিতেছে। সেই দিকে দ্রম্নতবেগে ধাবিত হইলাম। আলুম করিয়া এক লাফ দিয়া প্রথম বাদ্যকরদিগের ভিতর পড়িলাম, কালো কালো বিলাতী সাহেবরা কোট-পেন্ট পিঁধে যাহারা বিলাতী বাজনা বাজাইতেছিল, তাহারা আমার সেই
মেঘগর্জনের ন্যায় আলুম শব্দ শুনিয়া আর আমার সেই রম্নদ্রমূর্তি দেখিয়া আপন আপন যন্ত্র ফেলিয়া যে যেদিকে পারিল পলায়ন করিল। ঢাকী ঢুলীদের তো কথাই নাই। তাহাদের কেহ পলাইল, কেহ কেহ সেই স্থানে মূর্চ্ছিত হইয়া পড়িল। যাহারা আলো প্রভৃতি লইয়া চলিয়াছিল, তাহারাও পলায়ন করিল। তাহার পর পুনরায় আলুম করিয়া আমি বরযাত্রদিগের গাড়ীর নিকট উপস্থিত হইলাম। টপ টপ করিয়া তাহারা গাড়ী হইতে লাফাইয়া পড়িল ও যে যেদিকে পারিল পলায়ন করিল।
লম্বোদর বলিলেন,-‘আমিও বরযাত্র গিয়াছিলাম। আমি একটি গাছে গিয়া উঠিয়াছিলাম।’
শঙ্কর ঘোষ বলিলেন,-‘গাড়ী হইতে লাফাইয়া পড়িতে আমার পা ভাঙ্গিয়া গিয়াছিল। শেষে কেলেহাঁড়ী মাথায় দিয়া সমসত্ম রাত্রি একটা পুষ্করিণীতে গা ডুবাইয়া বসিয়া রহিলাম।’
মশার মাংস
ডমরম্নধর বলিতে লাগিলেন,-আমরা দেখিলাম যে, সাঁইয়ের গায়ে দশ-বারোটি কালো জীব বসিয়াছে। যাতনায় সাঁই ছট্ফট্ করিতেছে। লাঠি দিয়া আমি সেই জীবগুলিকে তাড়াইতে চেষ্টা করিলাম। আমার লাঠির আঘাতে সাঁইয়ের দেহ হইতে তিনটি জীব উড্ডীয়মান হইল। তাহাদের একটি আমার গায়ে বসিতে আসিল। সবলে তাহার উপর আমি লাঠি মারিলাম। লাঠির আঘাতে জীবটি মৃত হইয়া মাটিতে পড়িয়া গেল। আমি তাহার মৃতদেহ তুলিয়া লইলাম। ইতিমধ্যে আর দুটি জীব একজন মাঝির গায়ে গিয়া বসিল। মাঝি চীৎকার করিয়া উঠিল। দশ-বারো হাত দৌড়িয়া গিয়া সেও মাটিতে পড়িয়া ছট্ফট্ করিতে লাগিল। আমি বুঝিলাম যে, এ জীব কেবল যে রক্তপান করে, তাহা নহে, ইহার ভয়ানক বিষও আছে। তখন অবশিষ্ট দুইজন মাঝির সহিত আমি দৌড়িয়া নৌকায় গিয়া উঠিলাম ও তৎক্ষণাৎ নৌকা ছাড়িয়া দিয়া সে স্থান হইতে পলায়ন করিলাম।
নৌকায় বসিয়া আমি ভাবিতে লাগিলাম। মনে করিলাম যে, মোহর বিক্রয়ের টাকাগুলি বুঝি জলাঞ্জলি দিলাম, পাপের ধন বুঝি প্রায়শ্চিত্তে গেল। এখন বুঝিতে পারিলাম যে, পাঁচ হাজার টাকার সম্পত্তি কেন সে লোক এক হাজার টাকায় বিক্রয় করিয়াছে। যে জীবটিকে লাঠি দিয়া মারিয়াছিলাম, যাহার মৃতদেহ আমি তুলিয়া লইয়াছিলাম, তাহা এখন পর্যন্ত আমার হাতেই ছিল। নৌকার উপর রাখিয়া সেইটিকে নিরীক্ষণ করিয়া দেখিতে লাগিলাম। কিছুক্ষণ উল্টাইয়া পাল্টাইয়া আমি ঘোরতর আশ্চর্য্যান্বিত হইলাম। দেখিলাম যে,-সে অন্য কোন জীব নহে, বৃহৎ মশা! চড়াই পাখীর ন্যায় বৃহৎ মশা! মশা যে এত বড় হয়, তাহা কখন শুনি নাই। শরীরটি চড়াই পাখীর ন্যায় বড়, শুঁড়টি বৃহৎ জোঁকের ন্যায়। ডাক্তারেরা যেরূপ ছুরি দিয়া ফোঁড়া কাটে শুঁড়ের আগায় সেইরূপ ধারালো পদার্থ আছে। জীব-জন্তু অথবা মানুষের গায়ে বসিয়া প্রথম সেই ছুরি দিয়া কতক চর্ম ও মাংস কাটিয়া লয়। তারপর সেইস্থানে শুঁড় বসাইয়া রক্তপান করে! কেবল যে রক্তপান করিয়া জীব-জন্তুর প্রাণ বিনষ্ট করে তাহা নহে, ইহাদের ভয়ানক বিষ আছে, সেই বিষে অপর প্রাণী ধড়ফড় করিয়া মরিয়া যায়।
লম্বোদর জিজ্ঞাসা করিলেন,-‘কি করিয়া জানিলে যে, যে জীব কোন নূতন পক্ষী নহে?’
ডমরম্নধর উত্তর করিলেন,-‘পক্ষীদের দুইটি পা থাকে, ইহার ছয়টি পা; পক্ষীদের ডানায় পালক ছিল না; পক্ষীদের ঠোঁট থাকে, ঠোঁটের স্থানে ইহার শুঁড় ছিল। পক্ষীদের শরীরে হাড় থাকে, ইহার শরীর কাদার ন্যায় নরম। সেইজন্য আমি স্থির করিলাম যে, ইহা পক্ষী নহে, মশা।’
লম্বোদর বলিলেন,-‘মশা যে এত বড় হয়, তাহা আমার বিশ্বাস হয় না।’
শঙ্কর ঘোষ বলিলেন,-‘কেন বিশ্বাস হইবে না? হস্তী বৃহৎ মশা ব্যতীত আর কিছুই নহে। মশার শুঁড় আছে, হস্তীরও শুঁড় আছে। তবে হস্তী যদি রক্তপান করিত তাহা হইলে পৃথিবীতে অপর কোন জীব থাকিত না। সেই জন্য হসত্মী গাছপালা খাইয়া প্রাণধারণ করে।’
ডমরম্নধর বলিলেন,-‘তাহা ভিন্ন আমি এ কথায় প্রমাণ রাখিয়াছি। যেমন সেই বাঘের ছালখানি ঘরে রাখিয়াছি, সেইরূপ এই মশার প্রমাণস্বরূপ আমি জোঁক রাখিয়াছি। আমাদের গ্রামের নিকট যে বিল আছে, মশার শুঁড়টি কাটিয়া আমি সেই বিলে ছাড়িয়া দিয়াছিলাম। সেই শুঁড় হইতে এখন অনেক বড় বড় জোঁক হইয়াছে। আমার কথায় তোমাদের প্রত্যয় না হয়, জলায় একবার নামিয়া দেখ। প্রমাণ ছাড়া আমি কথা বলি না।’
লম্বোদর বলিলেন,-‘মশার শুঁড় পরিচয়া জোঁক হইতে পারে না।’
শঙ্কর ঘোষ বলিলেন,-‘কেন হইবে না? স্বে হইতে স্বেদজ জীব হয়। বাদা বনের পাতা পচিয়া চিংড়ি মাছ হয়। কোন বি-এ অথবা এম-এ অথবা কি একটা পাশ করা লোক কৃষিকার্য সম্বন্ধে একখানা বাঙ্গালা স্কুলপাঠ্য পুসত্মক লিখিয়াছিলেন। পুদিনা গাছ সম্বন্ধে তাহাতে তিনি এরূপ লিখিয়াছিলেন,-একখন্ড দড়িতে গুড় মাখাইয়া বাহিরে বাঁধিয়া দিবে। গুড়ের লোভে তাহাতে মাছি বসিয়া মলত্যাগ করিবে। মাছির মল-মূত্রে দড়িটি যখন পূর্ণ হইবে, তখন সেই দড়ি রোপণ করিবে। তাহা হইতে পুদিনা গাছ উৎপন্ন হইবে। মক্ষিকার বিষ্ঠায় যদি পুদিনা গাছ হইতে পারে, তাহা হইলে মশার শুঁড় হইতে জোঁক হইবে না কেন?’
ডমরম্নধর বলিতে লাগিলেন,-‘যাহা হউক, আমার বড়ই চিনত্মা হইল। এত কষ্টের টাকা সব বৃথায় গেল, তাহা ভাবিয়া আমার মন আকুল হইল। কিন্তু আমি সহজে কোন কাজে হতাশ হই না। গ্রামে আসিয়া অনেক ভাবিয়া চিনিত্ময়া বৃহৎ একটি মশারি প্রস’ত করিলাম। কাপড়ের মশারি নহে, নেটের মশারি নহে, জেলেরা যে জাল দিয়া মাছ ধরে সেই জালের মশারি। তাহার পর পাঁচজন সাঁওতালকে চাকর রাখিলাম। একখানি নৌকা ভাড়া করিয়া সেই পাঁচজন সাঁওতালের সঙ্গে পুনরায় আবাদে গমন করিলাম। ধীরে ধীরে আমরা নৌকা হইতে নামিলাম। চারি কোণে চারিটি বাঁশ দিয়া চারিজন মাঝি ভিতর হইতে মশারি উচ্চ করিয়া ধরিল। তীর-ধনু হাতে লইয়া চারিপার্শ্বে চারিজন সাঁওতাল দাঁড়াইল। একজন সাঁওতালের সহিত আমি মশারির মাঝখানে রহিলাম। মশারির ভিতর থাকিয়া আমরা দশজন আবাদের অভ্যন্তরে অগ্রসর হইতে লাগিলাম। অধিক দূর যাইতে হয় নাই। বৃহৎ মশকগণ বোধ হয় অনেক দিন উপবাসী ছিল। মানুষের গন্ধ পাইয়া পালে পালে তাহারা মশারির গায়ে আসিয়া বসিল। কিন্তু মশারির ভিতর প্রবেশ করিতে পারিল না। সাঁওতাল পাঁচজন ক্রমাগত তাহাদিগকে তীর দিয়া বধ করিতে লাগিল। সেদিন আমরা আড়াই হাজার মশা মারিয়াছিলাম। সন্ধ্যাবেলা কাজ বন্ধ করিয়া পুনরায় নৌকায় ফিরিয়া আসিলাম। সাঁওতালগণ এক ঝুড়ি মৃত মশা সঙ্গে আনিয়াছিল। শুঁড়, ডানা ও পা ফেলিয়া দিয়া সাঁওতালরা মশা পোড়াইয়া ভক্ষণ করিল। তাহারা বলিল যে, ইহার মাংস অতি উপাদেয়, ঠিক বাদুড়ের মাংসের মত। আমাকে একটু চাখিয়া দেখিতে বলিল, কিন’ আমার রম্নচি হইল না।
পরদিন আমরা দুই হাজার মশা বধ করিলাম, তাহার পরদিন ষোলশত, তাহার পরদিন বারশত, এইরূপ প্রতিদিন মশার সংখ্যা কম হইতে লাগিল। পঁয়ত্রিশ দিনে মশা একেবারে নিঃশেষ হইয়া গেল। হয় আমরা সমুদয় মশা মারিয়া ফেলিলাম, আর না হয় অবশিষ্ট মশা নিবিড় বনে পলায়ন করিল। সেই অবধি আমাদের আবাদে এ বৃহৎ জাতীয় মশার উপদ্রব হয় নাই। মশার হাত হইতে অর্থাৎ শুঁড় হইতে পরিত্রাণ পাইয়া আমি আবাদের চারিদিকে পুনরায় ভেড়ি বাঁধাইলাম। বন কাটিয়া ও পুষ্করিণীর সংস্কার করিয়া কয়েক ঘর প্রজা বসাইলাম। এই সমুদয় কাজ করিতে আমার আটশত টাকা খরচ হইয়া গেল। তখন দেখিলাম যে, আরও হাজার টাকা খরচ না করিলে কিছুই হইবে না। সে হাজার টাকা কোথায় পাই।’
কুম্ভীর-বিভ্রাট
শঙ্কর ঘোষ জিজ্ঞাসা করিলেন,-‘শুনিয়াছি যে সুন্দরবনে নদী-নালায় অনেক কুমীর আছে। তোমার আবাদে কুমীর কিরূপ?’
ডমরম্নধর বলিলেন,-কুমীর! আমার আবাদের কাছে যে নদী আছে, কুমীরে তাহা পরিপূর্ণ। খেজুর গাছের মত নদীতে তাহারা ভাসিয়া বেড়ায়, অথবা কিনারায় উঠিয়া পালে পালে তাহারা রৌদ্র পোহায়। গরম্নটা, মানুষটা, ভেড়াটা, ছাগলটা বাগে পাইলেই লইয়া যায়। কিন’ এ সব কুমীরকে আমরা গ্রাহ্য করি না। একবার আমার আবাদের নিকট এক বিষম কুমীরের আবির্ভাব হইয়াছিল। গন্ধমাদন পর্বতে কালনেমির পুকুরে যে কুম্ভীর হনুমানকে ধরিয়াছিল, ইহা তাহা অপেক্ষাও ভয়ানক, গঙ্গাদেবী যে মকরের পীঠে বসিয়া বায়ু সেবন করেন, সে মকরকে এ কুমীর একগালে খাইতে পারে। পর্বত প্রমাণ যে গজ সেকালে বহুকাল ধরিয়া কচ্ছপের সহিত যুদ্ধ করিয়াছিল, সে-কচ্ছপকে এ কুমীর নস্য করিতে পারে। ইহার দেহ বৃহৎ, তালগাছের ন্যায় বড়, ইহার উদর এই দালানটির মত। অন্যান্য কুমীর জীবজন’কে ছিঁড়িয়া ভক্ষণ করে। কিন’ এ কুমীরটা আস্ত গরম্ন, আস্ত মহিষ গিলিয়া ফেলিত। রাত্রিতে সে লোকের ঘরে ও গোয়ালে সিঁদ দিয়া মানুষ ও গরম্ন-বাছুর লইয়া যাইত। লাঙ্গুলে জল আনিয়া দেওয়াল ভিজাইয়া গর্ত্ত করিত। ইহার জ্বালায় নিকটস’ আবাদের লোক অস্থির হইয়া পড়িল। প্রজাগণ পাছে আবাদ ছাড়িয়া পলায়ন করে, আমাদের সেই ভয় হইল, তাহার পর লাঙ্গুলের আঘাতে নৌকা ডুবাইয়া আরোহীদিগকে ভক্ষণ করিতে লাগিল। সে নিমিত্ত এ পথ দিয়া নৌকার যাতায়াত অনেক পরিমাণে বন্ধ হইয়া গেল।
এই ভয়ানক কুম্ভীরের হাত হইতে কিরূপে নিষ্কৃতি পাই এইরূপ ভাবিতেছি, এমন সময় আমার আবাদের নিকট একখানি নৌকা ডুবাইয়া তাহার আরোহীদিগকে একে একে আমাদের সমক্ষে সে গিলিয়া ফেলিল। এই নৌকায় এক ভদ্রলোক কলিকাতা হইতে সপরিবারে পূর্বদেশে যাইতেছিলেন। নদীর তীরে দাঁড়াইয়া আমরা দেখিলাম যে, তাঁহার গৃহিণী সর্বাঙ্গ বহুমূল্য অলঙ্কারে ভূষিত ছিল। তোমরা জান যে, কুমীরের পেটে মাংস হজম হয়, গহনা পরিপাক হয় না। কুমীর যখন সেই স্ত্রীলোককে গিলিয়া ফেলিল, তখন আমার মনে এই চিন্তা উদয় হইল,-চিরকাল আমি কপালে পুরম্নষ; যদি এই কুমীরটাকে আমি মারিতে পারি, তাহা হইলে ইহার পেট চিরিয়া এই গহনাগুলি বাহির করিব, অন্ততঃ পাঁচ-ছয় হাজার টাকা আমার লাভ হইবে।
এইরূপ চিন্তা করিয়া আমি কলিকাতায় গমন করিলাম। বড় একটি জাহাজের নঙ্গর কিনিয়া উকো ঘষিয়া তাহাতে ধার করিলাম, তাহার পর যে কাছিতে মানোয়ারি জাহাজ বাঁধা থাকে সেইরূপ এক কাছি ক্রয় করিলাম। এইরূপ আয়োজন করিয়া আমি আবাদে ফিরিয়া আসিলাম। আবাদে আসিয়া শুনিলাম যে, কুমীর আর একটা মানুষ খাইয়াছে। চারিদিন পূর্বে এক সাঁতালনী এককুড়ি বেগুন মাথায় লইয়া হাটে বেচিতে যাইতেছিল। সে যেই নদীর ধারে গিয়াছে, আর কুমীর তাহাকে ধরিয়া বেগুনের ঝুড়ি সহিত আসত্ম গিলিয়া ফেলিয়াছে, তাহাতে সাঁওতাল প্রজাগণ ক্ষেপিয়া উঠিয়াছে; বলিতেছে যে, আবাদ ছাড়িয়া তাহারা দেশে চলিয়া যাইবে।
আবাদে আসিয়া নঙ্গরটিকে আমি বঁড়শী করিলাম তাহাতে জাহাজের কাছি বাঁধিয়া দিলাম, মাছ ধরিবার জন্য লোকে যে হাতসূতা ব্যবহার করে, বৃহৎ পরিমাণে এও সেইরূপ হাত-সূতার ন্যায় হইল। নঙ্গরের তীক্ষ্ণ অগ্রভাগে এক মহিষের বাছুর গাঁথিয়া নদীর জলের নিকট বাঁধিয়া দিলাম। কাছির অন্যদিকে একগাছে পাক দিয়া রাখিলাম, তাহার পর পঞ্চাশ জন সবল লোককে নিকটে লুক্কায়িত রাখিলাম। বেলা তিনটার সময় আমাদের এই সমুদয় আয়োজন সমাপ্ত হইল।
বঁড়শীতে মহিষের বাছুরকে বিঁধিয়া দিয়াছিলাম সত্য, কিন’ তাহার প্রাণ আমরা একেবারে বধ করি নাই। নদীর ধারে দাঁড়াইয়া সে গাঁ গাঁ শব্দে ডাকিতে লাগিল, তাহার ডাক শুনিয়া সন্ধ্যার ঠিক পূর্বে সেই প্রকা- কুমীর আসিয়া উপস্থিত হইল। তাহার লেজের ঝাপটে পর্বতপ্রমাণ এক ঢেউ উঠিল, সেই ঢেউয়ে বাছুরটি ডুবিয়া গেল, তখন আর আমরা কিছুই দেখিতে পাইলাম না, পরক্ষণেই কাছিতে টান পড়িল। তখন আমরা বুঝিলাম যে, নঙ্গরবিদ্ধ বাছুরকে কুমীর গিলিয়াছে, বঁড়শীর ন্যায় নঙ্গর কুমীরের মুখে বিঁধিয়া গিয়াছে। তাড়াতাড়ি সেই পঞ্চাশ জন লোক আসিয়া দড়ি ধরিয়া টানিতে লাগিল। ভাগ্যে গাছে পাক দিয়া রাখিয়াছিলাম, তা না হইলে কুমীরের বলে এই পঞ্চাশ জন লোককে নদীতে গিয়া পড়িতে হইত। আমরা সেই রাক্ষস কুমীরকে বঁড়শীতে গাঁথিয়াছি ঐ কথা শুনিয়া চারিদিকের আবাদ হইতে অনেক লোক দৌড়িয়া আসিল। প্রায় পাঁচশত লোক সেই রশি ধরিয়া টানিতে লাগিল। দারম্নণ আসুরিক বলে কুমীর সেই পাঁচশত লোকের সহিত ঘোর সংগ্রাম করিতে লাগিল। কখন আমাদের ভয় হইল যে, তাহার বিপুল বলে নঙ্গর ভাঙ্গিয়া যায়, কখন ভয় হইল যে, তাহার জাহাজের দড়া বা ছিঁড়িয়া যায়। কখন ভয় হইল, গাছ উৎপাটিত হইয়া নদীতে গিয়া পড়ে। নিশ্চয় একটি বিভ্রাট ঘটিত, যদি না সাঁওতালগণ কুমীরের মস্তকে ক্রমাগত তীরবর্ষণ করিত, যদি না নিকটস’ দুইটি আবাদের লোক বন্দুক আনিয়া কুমীরের মাথায় গুলী মারিত। তীর ও গুলী খাইয়া কুমীর মাঝে মাঝে জলমগ্ন হইতে লাগিল। কিন’ নিঃশ্বাস লইবার জন্য পুনরায় তাহাকে ভাসিয়া উঠিতে হইল। সেই সময় লোক তীর ও গুলীবর্ষণ করিতে লাগিল। কুমীরের রক্তে নদীর জল বহুদূর পর্যনত্ম লোহিত বর্ণে রঞ্জিত হইয়া গেল। সমস্ত রাত্রি কুমীরের সহিত আমাদের এইরূপ যুদ্ধ চলিল। প্রাতঃকালে কুম্ভীর হীনবল হইয়া পড়িল। বেলা নয়টার সময় তাহার মৃতদেহ জলে ডুবিয়া গেল। তখন অতি কষ্টে তাহাকে আমরা টানিয়া উপরে তুলিলাম।
বড় বড় ছোরা বড় বড় কাস্তে আনিয়া তাহার পেট চিরিতে চেষ্টা করিলাম। কিন’ সে রাক্ষস কুমীরের পেট অতি কঠিন ছিল। আমাদের সমুদয় অস্ত্র ভাঙ্গিয়া গেল। অবশেষে করাত আনাইয়া করাতের দ্বারা তাহার উদর কাটাইলাম। কিন্তু পেট চিরিয়া তাহার পেটের ভিতর যাহা দেখিলাম, তাহা দেখিয়াই আমার চড়্গুস্থির।
লম্বোদর জিজ্ঞাসা করিল,-‘কি দেখিলে?’
শঙ্কর ঘোষ জিজ্ঞাসা করিলেন,-‘কি দেখিলে?’
অন্যান্য শ্রোতৃগণ জিজ্ঞাসা করিলেন,-‘কি দেখিলে?’
ডমরম্নধর বলিলেন,-‘বলিব কি ভাই, আর দুঃখের কথা, কুমীরের পেটের ভিতর দেখি না যে সেই সাঁওতাল মাগী, চারিদিন পূর্বে কুমীর যাহাকে আস্ত ভড়্গণ করিয়াছিল, সেই মাগী পূর্বদেশীয় সেই ভদ্রমহিলার সমুদয় গহনাগুলি আপনার সর্বাঙ্গে পরিয়াছে, তাহার পর নিজের বেগুনের ঝুড়িটি সে উপুড় করিয়াছে, সেই বেগুনগুলি সম্মুখে ডাঁই করিয়া রাখিয়াছে। ঝুড়ির উপর বসিয়া মাগী বেগুন বেচিতেছে।’
শঙ্কর ঘোষ বিস্মিত হইয়া জিজ্ঞাসা করিলেন,-‘কুমীরের পেটের ভিতর ঝুড়ির উপর বসিয়া সে বেগুন বেচিতেছিল?’
ডমরম্নধর বলিলেন,-‘হাঁ ভাই! কুমীরের পেটের ভিতর সেই ঝুড়ির উপর বসিয়া মাগী বেগুন বেচিতেছিল।’
লম্বোদর জিজ্ঞাসা করিলেন,-‘কাহাকে সে বেগুন বেচিতেছিল? কুমীরের পেটের ভিতর সে খরিদ্দার পাইল কোথা?’
রিবক্ত হইয়া ডমরম্নধর বলিলেন,-‘তোমার এক কথা! কাহাকে সে বেগুন বেচিতেছিল, সে খোঁজ করিবার আমার সময় ছিল না। সমুদয় গহনাগুলি সে নিজের গায়ে পরিয়াছিল, তাহা দেখিয়াই আমার হাড় জ্বলিয়া গেল। আমি বলিলাম,-‘মাগী! ও গহনা আমার। অনেক টাকা খরচ করিয়া আমি কুমীর ধরিয়াছি, ও গহনা খুলিয়া দে।’ কেঁউ মেউ করিয়া মাগী আমার সহিত ঝগড়া করিতে লাগিল। তাহার পর তাহার পুত্রগণ ও তাহার জাতি ভাইগণ কাঁড়বাঁশ ও লাঠিসোঁটা লইয়া আমাকে মারিতে দৌড়িল। আমার প্রজাগণ কেহই আমার পড়্গ হইল না। সুতরাং আমাকে চুপ করিয়া থাকিতে হইল। সাঁওতালগণ সে মাগীকে ঘরে লইয়া গেল। দিনকয়েক শূকর মারিয়া ও মদ খাইয়া তাহারা আমোদ-প্রমোদ করিল। পূর্বদেশীয় সে ভদ্রমহিলার একখানি গহনাও আমি পাইলাম না। মনে মনে ভাবিলাম যে, কপালে পুরম্নষের ভাগ্য সকল সময় প্রসন্ন হয় না।’
লম্বোদর বলিলেন,-‘এত আজগুবি গল্প তুমি কোথায় পাও বল দেখি?’
ডমরম্নধর বলিলেন,-‘এতক্ষণ হাঁ করিয়া এক মনে এক ধ্যানে গল্পটি শুনিতেছিলে। যেই হইয়া গেল, তাই এখন বলিতেছ যে, আজগুবি গল্প। কলির ধর্ম বটে!’
শঙ্কর ঘোষ জিজ্ঞাসা করিলেন,-‘এ কুমীরের গল্প যে সত্য, তাহার প্রমাণ আছে?’
ডমরম্নধর উত্তর করিলেন,-‘প্রমাণ? নিশ্চয় প্রমাণ আছে। কোমরের ব্যথার জন্য এই দেখ সেই কুমীরের দাঁত আমি পরিয়া আছি।’
লম্বোদর জিজ্ঞাসা করিলেন,-‘সে কুমীর যদি তালগাছ অপেক্ষা বৃহৎ ছিল, তবে তাঁহার দাঁত এত ছোট কেন? ঠিক অন্য কুমীরের দাঁতের মত কেন?’
ডমরুধর উত্তর করিলেন,-‘অনেক মানুষ খাইয়া সে কুমীরের দাঁত ক্ষয় হইয়া গিয়াছিল।’
(ডমরু-চরিত্রের কয়েকটি খন্ড)
¤ বেঁচে থাকো সর্দিকাশি – প্রেমের গল্প
- সৈয়দ মুজতবা আলী
ভয়ঙ্কর সর্দি হয়েছে। নাক দিয়ে যা জল বেরম্নচ্ছে তা সামলানো রম্নমালের কর্ম নয়। ডবল সাইজ বিছানার চাদর নিয়ে আগুনের কাছে বসেছি। হাঁচছি আর নাক ঝাড়ছি, নাক ঝাড়ছি আর হাঁচছি। বিছানার চাদরের অর্ধেকখানা হয়ে এসেছে, এখন বেছে বেছে শুকনো জায়গা বের করতে হচ্ছে। শীতের দেশ, দোর জানালা বন্ধ, কিচ্ছু খোলার উপায় নেই। জানলা খুললে মনে হয় গৌরীশঙ্করের চূড়োটি যেন হিমালয় ত্যাগ করে আমার ঘরে নাক গলাবার তালে আছেন।
জানি, একই রম্নমালে বারবার নাক ঝাড়লে সর্দি বেড়েই চলে, কিন’ উপায় কি? দেশে হলে রকে বসে বাইরে গলা বাড়িয়ে দিয়ে সশব্দে নাক ঝাড়তুম, এ নোংরামির হাত থেকে রক্ষা তো পেতুমই, নাকটাও কাপড়ের ঘষায় ছড়ে যেতো না।
হঠাৎ মনে পড়ল পরশু দিন এক ডাক্তারের সঙ্গে অপেরাতে আলাপ হয়েছে। ডাকসাঁইটে ডাক্তার- ম্যুনিক শহরে নাম করতে পারাটা চাট্টিখানি কথা নয়। যদিও জানি ডাক্তার করবে কচু, কারণ জর্মন ভাষাতেই প্রবাদ আছে ওষুধ খেলে সর্দি সারে সাত দিনে, না খেলে এক সপ্তায়।
তবু গেলুম তাঁর বাড়ী। আমার চেহারা দেখেই তিনি বুঝতে পারলেন ব্যাপারটা কি। আমি শুধালাম, সর্দির ওষুধ আছে? আপনার প্রথম এবং খুব সম্ভব শেষ ভারতীয় রোগীর একটা ব্যবস্থা করে দিন। আমার এক নাক দিয়ে বেরম্নচ্ছে রাইন, অন্য নাক দিয়ে ওডার।
ডাক্তার যদিও জর্মন তবু হাত দু’খানি আকাশের দিকে তুলে ধরলেন ফরাসিস্ কায়দায়। বললেন, ‘অবাক করলেন, স্যার! সর্দির ওষুধ নেই? কত চান? সর্দির ওষুধ হয় হাজারো রকমের।’
বলে আমাকে পাশের ঘরে নিয়ে গিয়ে খুললেন লাল কেল্লার সদর দরজা পরিমাণ এক আলমারি। চৌকো, গোল, কোমর-মোটা, পেট-ভারী বাহান্ন রকমের বোতল-শিশিতে ভর্তি। নানা রঙের লেবেল আর সেগুলোর উপর লেখা রয়েছে বিকট বিকট সব লাতিন নাম।
এবারে খানদানী ভিয়েনীজ কায়দায় কোমরে দু’ভাঁজ হয়ে বাও করে বাঁ হাতটা পেটের ওপর রেখে ডান হাত দিয়ে তলোয়ার চালানোর কায়দায় দেরাজের এক প্রান্ত থেকে আরেক প্রান্ত অবধি দেখিয়ে বললেন, ‘বেছে নিন, মহারাজ (কথাটা জর্মন ভাষায় চালু আছে) সব সর্দির দাওয়াই।’
আমি সন্দিগ্ধ নয়নে তাঁর দিকে তাকালুম। ডাক্তার মুখব্যাদন করে পরিতোষের ঈষৎ হাস্য দিয়ে গালের দুটি টোল খোলতাই করে দিয়েছেন- হা’ টা লেগে দিয়েছে দু’কানের ডগায়।
একটা ওষুধের কটমটে লাতিন নাম অতি কষ্টে উচ্চারণ করে বললুম, ‘এর মানে তো জানিনে।’
সদয় হাসি হেসে বললেন, ‘আমিও জানিনে, তবে এটুকু জানি, ঠাকুরমা মার্কা কচু-ঘেঁচু মেশানো দিশী দাওয়াই মাত্রেরই লম্বা লম্বা লাতিন নাম হয়।’
আমি শুধালাম, ‘খেলে সর্দি সারে?’
বললেন, ‘গলায় একটু আরাম বোধ হয়, নাকের সুড়সুড়িটা হয়ত একটু আধটু কমে। আমি কখনো পরখ করে দেখিনি। সব পেটেন্ট ওষুধ-নমুনা হিসাবে বিনা পয়সায় পাওয়া। তবে সর্দি সারে না, এ কথা জানি।’
আমি শুধালুম, ‘তবে যে বললেন সর্দির ওষুধ আছে?’
বললেন, ‘এখনো বলছি আছে কিন্তু সর্দি সারে সে কথা বলিনি।’
বুঝলুম, জর্মনি কান্ট হেগেলের দেশ। বললুম, ‘অ’।
ফিসফিস করে ডাক্তার বললেন, ‘আরেকটা তত্ত্বকথা এই বেলা শিখে নিন। যে ব্যামোর দেখবেন সাতান্ন রকমের ওষুধ, বুঝে নেবেন, সে ব্যামো ওষুধে সারে না।’
ততক্ষণে আবার আমি হাঁচ্ছো হাঁচ্ছো আরম্ভ করে দিয়েছি। নাক-চোখ দিয়ে এবার রাইন-ওড়ার না এবারে পদ্মা-মেঘনা। ডাক্তার ডজন দুই কাগজের রম্নমাল আর একটা ওয়েস্ট-পেপার বাক্সেট আমার দিকে এগিয়ে দিলেন।
ধাক্কাটা সামলে ওঠে প্রাণভরে জর্মন সর্দিকে অভিসম্পাত দিলুম।
দেখি, ডাক্তার আমার দিকে তাকিয়ে মিটমিটিয়ে হাসছেন।
আমার মুখে হয়ত একটু বিরক্তি ফুটে উঠেছিল। বললেন, ‘সর্দি-কাশির গুণও আছে।’
আমি বললুম, ‘কচু, হাতী, ঘণ্টা!’
বললেন, ‘তর্জমা করে বলুন।’
আমি বললুম, ‘কচুর’ লাতিন নাম জানিনে; ‘হাতী’ হল ‘এলেফান্ট’ আর ‘ঘণ্টা’ মানে ‘গস্নকে’।
‘মানে! আর বুঝে দরকার নেই; এগুলো কটুবাক্য।’
আকাশ পানে হানি যুগলভুরম্ন বললেন, ‘অদ্ভুত ভাষা! হাতি আর ঘণ্টা গালাগালি হয় কি করে! একটা গল্প শুনবেন? সঙ্গে গরম ব্রান্ডি?’
আমি বললুম, ‘প্রথমটাই চলুক। মিক্স্ করা ভালো নয়।’
ডাক্তার বললেন, আমি ডাক্তারি শিখেছি বার্লিনে। বছর তিনেক প্র্যাকটিস করার পর একদিন গিয়েছি স্টেশনে, বন্ধুকে বিদেয় দিতে। ফেরার সময় স্টেশন-রেস্তোরাঁয় ঢুকেছি একটা ব্রান্ডি খাব বলে!
ঢুকেই থমকে দাঁড়ালুম। দেখি, এক কোণে এক অপরূপ সুন্দরী। অত্যন্ত সাদা সিদে বেশভূষা-গরীব বললেও চলে- আর তাই বোধ হয় সৌন্দর্যটা পেয়েছে তার চরম খোলতাই। নর্থসী দেখেছেন? তবে বুঝতেন হব-হব সন্ধ্যায় তার জল কি রকম নীল হয়-তারই মত সুন্দরীর চোখ। দক্ষিণ ইটালীতে কখনো গিয়েছেন? না? তবে বুঝতেন সেখানে সোনালি রোদে রূপালী প্রজাপতির কি রাগিণী। তাই মত তাঁর ব্লন্ড চুল। ডানয়ুব নদী দেখছেন? না? তা হলে আমার সব বর্ণনাই বৃথা।
আমি বললুম, ‘বলে যান, রসগ্রহণে আমার কণামাত্র অসুবিধে হচ্ছে না।’
‘না, থাক। ওরকম বেয়ারিং পোস্টের বর্ণনা দিতে আমার মন মানে না। আমরা ডাক্তার-বদ্যি মানুষ, ভাষা বাবদে মুখ্য-সুখ্যু। অনেক মেহনত করে যে একটি মাত্র বর্ণনা কব্জায় এনেছি সেইটেও যদি না বোঝেন তবে আমার শোকটা কোথায় রাখি বলুন তো।’
কাতর হয়ে বললুম, ‘নিরাশ করবেন না।’
‘তবে চলুক ত্রিলেগেড্ রেস। ডানয়ুব নদীর শান্ত-প্রশান্ত ভাবখানা তাঁর মুখের উপর। অথচ জানেন, ডানয়ুব অগভীর নদী নয়। আর ডানয়ুবের উৎপত্তিস’ল দেখেছেন। না। তাহলে বুঝতেন সেখানে তন্বঈ ডানয়ুব যে রকম লাজুক মেয়ের মত এঁকে বেঁকে আপন শরীর ঢাকতে ব্যস্ত, এ-মেয়ের মুখে তেমনি ছড়ানো রয়েছে লজ্জার কেমন যেন একটা আঁকুবাঁকু ভাব।
‘এই লজ্জা ভাবটার উপরই আমি বিশেষ করে জোর দিতে চাই। আপনি নিশ্চয়ই লক্ষ্য করেছেন, লজ্জা-শরম বলতে আমরা যা কিছু বুঝি সে সব মধ্যযুগের পুরম্ননো গল্প থেকে। বেয়াত্রিচে দানেত্মকে দেখে লাজুক হাসি হেসেছিলেন- আমরা তাই নিয়ে কল্পনার জাল বুনি। আজকের দিনে এসব তো আর বার্লিন শহরে পাওয়া যায় না। মধ্যযুগের নাইটদের শিভালরি গেছে আর যাবার সময় সঙ্গে নিয়ে গিয়েছে মেয়েদের মুখ থেকে সব লজ্জা সব ব্রীড়া।
‘কিন’ আপনাদের দেশে নিশ্চয়ই এখনো এই মধুর জিনিসটি দেখতে পাওয়া যায় আর তার চেয়েও নিশ্চয়, আপনাদের দেশের লোক এখানো অগ্রপশ্চাৎ বিবেচনা না করে প্রথম দর্শনেই প্রেমে পড়ে।
‘তাই আপনি বিশ্বাস করবেন, কিন’ আমি নিজে এখনো ঠিক করতে পারিনি, কি করে যে আমার তখন মনে হ’ল এ-মেয়েকে না পেলে আমার চলবে না।
‘হাসলেন না যে? তার থেকেই বুঝলুম, আপনি ওয়াকিবহাল, আপনি আমাকে বিশ্বাস করতে পেরেছেন; কিন’ জর্মনরা আমার এ-অবস্থার কথা শুনে হাসে। আর হাসবেই বা না কেন? চেনা নেই, শোনা নেই, বিদ্যাবুদ্ধিতে মেয়েটা হয়ত অফিসবয়ের চেয়েও আকাট, হয়ত মাতালদের আড্ডায় বিয়ার বিক্রি করে পয়সা কামায়, কিম্বা এও তো হতে পারে যে তার বিয়ে হয়ে গিয়েছে। এ সব কোনো কিছুর তত্ত্ব-তাবাশ না করে এক ঝটকায় মনস্থির করে ফেলা, এ-মেয়ে না হলে আমার চলবে না! আমি কি খামখেয়ালির চেঙ্গিসখান, না হাজারো প্রেমের ডন্ জুয়ান্?
‘ভাবছি আর মাথার চুল ছিঁড়ছি-কোন্ অজুহাতে কোন্ অছিলায় এঁর সঙ্গে আলাপ করা যায়।
‘কিছুতেই কোনো হদিশ পাচ্ছিনে, আমাদের মাঝখানে তিনখানা মাত্র ছোট্ট টেবিলের যে উত্তাল সমুদ্র সেটা পেরিয়ে ওঁর কাছে পৌঁছই কি প্রকারে। প্রবাদ আছে, প্রেমে পড়লে বোকা নাকি বুদ্ধিমান হয়ে যায়- প্রিয়াকে পাওয়ার জন্য তখন তার ফন্দি-ফিকির আর আবিষ্কার কৌশল দেখে পাঁচজনের তাক লেগে যায়, আর বুদ্ধিমান নাকি প্রেমে পড়লে হয়ে যায় একদম গবেট-এমন সব কা- তখন করে বসে যে দশজন তাজ্জব না মেনে যায়না, এ লোকটা এ-সব পাগলামি করছে কি করে!
‘এ জীবনে সেই সেদিন আমি প্রথম আবিষ্কার করলুম যে আমি বুদ্ধিমান, কারণ পূর্ণ একঘণ্টা ধরে ভেবেও আমি সামান্যতম কৌশল আবিষ্কার করতে পারলুম না, আলাপ করি কোন্ কায়দায়। কিন’ এহেন হৃদয়াভিরাম তত্ত্ব আবিষ্কার করেও মন কিছুমাত্র উল্লাসিত হল না। তখন বরঞ্চ বোকা বনতে পারলেই হয়ত কোনো একটা কৌশল বেরিয়ে যেত।
‘ফ্রলাইন উঠে দাঁড়ালেন। কি আর করি। পিছু নিলুম। তিনি গিয়ে উঠলেন ম্যুনিকের গাড়িতে। আমিও ছুটে গিয়ে টিকিট কাটলুম ম্যুনিকের। কিন’ এসে দেখি সে কামরার আটটা সিটই ভর্তি হয়ে গিয়েছে। আরো প্রমাণ হয়ে গেল, আমি বুদ্ধিমান, কারণ এ কথা সবাই জানে, বুদ্ধিমানকে ভগবান সাহায্য করলে এ-পৃথিবীতে বোকাদের আর বাঁচতে হত না। আমি ভগবানের কাছ থেকে কোনো সাহায্য পেলুম না।’
আমি বললুম, ‘ভগবানকে দোষ দিচ্ছেন কেন? এতো কন্দর্প ঠাকুরের ডিপার্টমেন্ট।’
বললেন, ‘তাতেই বা কি লাভ? তিনি তো অন্ধ। মেয়েটাকে বানিয়ে দিয়েছেন তাঁরই মত অন্ধ। এই যে আমি একটা এত বড় অ্যাপলো, আমার দিকে একবারের তরে ফিরেও তাকালো না। ওঁকে ডেকে হবে-’
আমি বললুম, ‘কচু’, ‘হাতী’, ‘ঘণ্টা’।
এবার ডাক্তার বাঙলা কটুকাটব্যের কদর বুঝলেন। বললেন, ‘আহা-হা-হা।’ তারপর জর্মন উচ্চারণে বললেন, ‘কশু, হাটি, গণ্টা! খাসা গালাগাল।’
আমি বললুম, কোমরাতে আটজনের সিট ছিল তো রয়েই গেল। প্রবাসে নিয়ম নাসিত্ম। আপনি কোনো গতিকে ধাক্কা ধাক্কি করে-’
বললেন, ‘তাজ্জব করলেন। একি আপনার ইন্ডিয়ান ট্রেন, না সাইবেরিয়াগামী প্রিজনার-ভ্যান! চেকার পত্রপাঠ কামরা থেকে বের করে দেবে না?’
‘দাঁড়িয়ে রইলুম বাইরের করিডরে ঠায়। দেখি মেয়েটি যদি খানাকামরায় যায়। স্টেশনে তো খেয়েছে শুধু কফি। ঘণ্টার পর ঘণ্টা কাটল, কত লোক কত কামরা থেকে উঠলো নামলো কিন’ আমার স্বর্গপুরী থেকে কোনো- (কটুবাক্য)- নামলো না। সব ব্যাটা নিশ্চয়ই যাচ্ছে ম্যুনিক। আর কোথাও যেতে পারে না? ম্যুনিক কি পরীস্থান না ম্যুনিকের ফুটপথ সোনা দিয়ে গড়া? অবাক করলে এই ইডিয়টগুলো।
‘প্রেমে পড়লে নাকি ক্ষুধাতৃষ্ণা লোপপায়। একবেলার জন্য হয়ত পায়। আমি লাঞ্চ খাইনি, ওদিকে ডিনারের সময় হয়ে গিয়েছে- আমার পেটের ভিতর হুলুধ্বনি জেগে উঠেছে। এমন সময় মা মেরির করম্নণা হল। মেয়েটি চলল খানা-কামরার দিকে। আমি চললুম ঠিক পিছনে পিছনে। আহা, যদি একটা হোঁচট খেয়ে আমার ওপর পড়ে যায়। দুত্তোর, তারও উপায় নেই- উঁচু হিলের জুতো হলে গাড়ির কাঁপুনিতে পড়ে যাওয়ার সম্ভাবনা থাকে- এ পরেছে ক্রেপসোল্।
‘ঠিক পিছনে পিছনে গিয়ে খানা-কামরায় ঢুকলুম। ওয়েটারটা ভাবলে স্বামী-স্ত্রী। না হলে তরম্নণ তরম্নণী এ রকম মুখ গুমসো করে খানা-কামরায় ঢুকবে কেন? বসলো গিয়ে একই টেবিলে- মুখোমুখি। হে মা মেরী, নত্রদাম গির্জেয় তোমার জন্য আমি একশ’টা মোমবাতি মানত করলুম। দয়া করো, মা একটা কিছু ফিকির বাৎলাও আলাপ করবার।
‘বুদ্ধিমান, বুদ্ধিমান, কোনো সন্দেহ নেই আমি বুদ্ধিমান! কোনো ফিকিরই জুটলো না, অথচ মেয়েটি বসে আছে আমার থেকে দু’হাত দূরে এবং মুখোমুখি! দু’হাত না হয়ে দু’লক্ষ যোজনও হতে পারত- কোনো ফারাক হ’ত না।
‘জানালা দিয়ে এক ঝটকা কয়লার গুঁড়ো এসে টেবিলের উপর পড়ল। মেয়েটি ভুরম্ন কুচকে সেদিকে তাকাতেই আমি ঝটিতি জানালা বন্ধ করতে গিয়ে করে ফেললুম আরেক কান্ড। ঠাস করে জানালাটা বুড়ো আঙুলের উপর পড়ে সেটাকে দিল থেৎলে। ফিনকি দিয়ে রক্ত।
‘মা-মেরীর অসীম দয়া কান্ডটা যে ঘটলো। মেয়েটি তড়াক করে লাফ দিয়ে বসল, “দাঁড়ান আমি ব্যান্ডেজ নিয়ে আসছি।”
‘আমি নিজে ডাক্তার, বিবেচনা করম্নন অবস্থাটা। রম্নমাল দিয়ে চেপে ধরলুম আঙুলটাকে। মেয়েটি ছুটে নিয়ে এল কামরা থেকে ফার্স্ট এডের ব্যান্ডেজ। তারপর আঙুলটার তদারকি করল শাস্ত্রসম্মত ডাক্তারি পদ্ধতিতে। বুঝলুম মেডিকেল কলেজে পড়ে! ঝানু ডাক্তার ফার্স্ট এডের ব্যান্ডেজ বয়ে বেড়ায় না আর আনাড়ি লোক এরকম ব্যান্ডেজ বাঁধতে পারে না।
‘আমি তো, ‘না, না’ ‘আপনি কেন মিছে মিছে’, ‘ধন্যবাদ, ধন্যবাদ’, ‘উঃ, বড্ড লাগছে’, ‘এতেই হবে’, ‘ব্যস বাস’ করেই যাচ্ছি আর সেই লিলির মতো সাদা হাতের পরশ পাচ্ছি। সে কি রকম মখমলের হাত জানেন? বলছি, আপনি কখনো রাইল্যান্ডে গিয়েছেন? না? থাক, ভুলেই গিয়েছিলুম, প্রতিজ্ঞা করছি, আপনাকে কোনো বর্ণনা দেব না।
‘প্রথম পরশে সর্বাঙ্গে বিদ্যুৎ খেলে যায়, বলে না? বড় খাঁটি কথা। আমি ডাক্তার মানুষ, আমার হাতে কোনো প্রকারের স্পর্শ কাতরতা থাকার কথা নয় তবু আমার কী অবস্থাটা হয়েছিল আপনাকে সেটা বোঝাই কী করে? মেয়েটি বোধহয় টের পেয়েছিল, কারণ একবার চকিতের তরে ব্যান্ডেজ বাঁধা বন্ধ করে আমার দিকে মাথা তুলে তাকিয়েছিল।
তাতে ছিল বিস্ময়, প্রশ্ন এবং হয়ত বা একটুখানি, অতি সামান্য খুশীর ঝিলিমিলি। তবে কি আমার হাতের স্পর্শ-? কোন্ সাহসে এ বিশ্বাস মনের কোণে ঠাঁই দিই, বলুন।’
আমি গুন্ গুন্ করে বললুম,
“জয় করে তবু ভয় কেন তোর যায় না,
হায় ভীরম্নপ্রেম হায় রে।”
ডাক্তার বললেন, ‘খোশা মেলডি তো। মানেটাও বলুন।’
বললুম, ‘আফ্টার ইউ। আপনি গল্পটা শেষ করম্নন।’
বললেন, ‘গল্প নয়, স্যার, জীবনমরণের কথা হচ্ছে।’
আমি শুধালুম, ‘কেন, সেপ্টিকের ভয় ছিল নাকি?’
রাগের ভাব করে বললেন, ‘ইয়োরোপে এসে আপনার কি সব রসকস শুকিয়ে গিয়েছে? আমাকে হেনেছে প্রেমের বাণ আর আপনি বলছেন আন্টিসেপ্টিক্ আন।’
আমি বললুম, ‘অপরাধ নেবেন না।’
বললেন, তারপর আমি সুযোগ পেয়ে আরম্ভ করলুম নানা রকমের কথা কইতে। গোল গোল। আমি যে পরিচয় করার জন্য জান কবুল সেটা ঢেকে চেপে। সঙ্গে সঙ্গে কখনো নূনটা এগিয়ে দি, কখনো ক্রুয়েটটা সরিয়ে নি, কখনো বা বলি, ‘মাছটা খাসা ভেজেছে, আপনি একটা খান না’; ওহে খানসামা, এদিকে-, ইত্যাদি।
‘করে করে সুন্দরীর মনটা একটু মোলায়েম করতে পেরেছি বলে মনে একটু ক্ষীণ আশার সঞ্চার হল।
মেয়েটি লাজুক বটে কিন্তু ভারী ভদ্র! আমার ভ্যাজর ভ্যাজর কান পেতে শুনলো, দু’একবার বস্নাশ্ করলো, সে যা গোলাপি- আপনি কখনো, না থাক।
‘কিন’ খেল মাত্র একটি অমলেট আর দু’স্লাইট রম্নটি। নিশ্চয়ই গরীব। ক্ষীণ আশাটার গায়ে একটু গত্তি লাগল।’ এমন সময় ডাক্তারের অ্যাসিস্টান্ট এসে জানলো রম্নগী এসেছে। ডাক্তার বললেন, ‘এখখুনি আসছি।’
ফিরে এসে কোনো ভূমিকা না দিয়েই বললেন, ‘ম্যুনিকে নাবলুম এক বস্ত্রে। এমন ভান করে কেটে পড়লুম যাতে মেয়েটি মনে করে আমি ভ্যান থেকে মাল নামাতে গেলুম। যখন ‘গুড্ বাই’ বলে হাত বাড়ালুম তখন সে একবার আমার দিকে তাকিয়েছিল। প্রেমে পড়লে নাকি মানুষের পাখা গজায়- হবেও বা, কিন্তু এ কথা নিশ্চয় জানি মানুষ তখন চোখে মুখে এমন সব নতুন ভাষা পড়তে পারে যার জন্য কোনো শব্দরূপ মুখস্থ করতে হয় না। তবে সে পড়াতে ভুল থাকে বিস্তর, কাকতলীয় এনত্মার।
“আমি দেখলুম লেখা রয়েছে ‘বিষাদ’ কিন্তু পড়লুম, ‘এই কি শেষ?”
আমিও অবাক হয়ে শুধালুম, ‘বার্লিন থেকে ম্যুনিক অবধি হামলা করে স্টেশনে খেই ছেড়ে দিলেন?’
ডাক্তারদের বাঁকা হাসি হেসে বললেন, আদপেই না। কিন্তু কি আর দরকার পিছু নিয়ে? মেডিকেল কলেজে পড়ে, ওতেই ব্যস্।
সেদিনই গেলুম মেডিকেল কলেজের রেস্তোরাঁয়। লাঞ্চ খেতে নিশ্চয়ই আসবে। এবারে মেয়েটি আর লজ্জা দিয়ে মনের ভাবঢাকতে পারল না। আমাকে দেখা মাত্র আপন অজানাতে চেয়ার ছেড়ে উঠে দাঁড়িয়ে হাত বাড়ালো, সঙ্গে সঙ্গে সমস্ত মুখে যে খুশি ছড়িয়ে পড়ল তা দেখে আমার মনে আর কোনো সন্দেহ রইল না, ভগবান মাঝে মাঝে বুদ্ধিমানকেও সাহায্য করেন।
‘ততক্ষণে মেয়েটি তার আপন-হারা আচরণটাকে সামলে নিয়েছে- লজ্জা এসে আবার সমস্ত মুখ ঢেকে ফেলেছে।’
ডাক্তার খানিকক্ষণ ভেবে নিয়ে বললেন, এখানেই যদি শেষ করা যেত তবে মন্দ হত না কিন্তু সর্দি-কাশির তো তা হলে কোনো হিল্লে হয় না। তাই কমিয়েসমিয়ে তাড়াতাড়ি শেষ করে দি।’
আমি বললুম, ‘কমাবেন না! তালটা একটু দ্রম্নত করে দিন। আমাদের দেশের ওস্তাদরা প্রথম খানিকটে গান করেন বিলম্বিত একতালে, শেষ করেন দ্রম্নত তালে।’
ডাক্তার বললেন, ‘দুঃখিনী মেয়ে, বাপ-মা নেই! এক খান্ডার পিসির বাড়ীতে মানুষ হয়েছে। দু’মুঠো খেতে দেয় পরতে দেয়, ব্যস্। কলেজের ফিজটি পর্যন্ত বেচারী যোগাড় করে মাস্টারি করে।
‘তাতে আমার কিছু বলার নেই। কিন’ আমার ঘোরতর আপত্তি এভাবে বুড়ী এমনি নজরবন্দী করে রেখেছে যে, চকিতা হরিণীর মত সমস্তক্ষণ সে ডাইনে বাঁয়ে তাকায়, ঐ বুঝি পিসি দেখে ফেললে, সে পরপুরম্নষের সঙ্গে কথা কইছে। আমি তো বিদ্রোহ করে বললুম, ‘একি বুখারার হারেম, না তুর্কী পাশার জেনানা? এ অত্যাচার আমি কিছুতেই সইব না।’ এভা শুধু আমার হাত ধরে বলে, ‘পস্নীজ, প্লীজ, তুমি একটু বরদাস্ত করে নাও, আমি তোমাকে হারাতে চাইনে।’ এর বেশী সে কক্খনো কিছু বলেনি।
এই মোকামে পৌঁছতে আমার লেগেছিল ঝাড়া একটি মাস। বিবেচনা করম্নন। সাত দিন লেগেছিল প্রেম নিবেদন করতে। পনেরো দিন লেগেছিল হাতখানি ছুঁতে। তারো এক সপ্তাহ পরে সে আমায় বললে কেন সে এমন ভয়ে ভয়ে ডাইনে বাঁয়ে তাকায়।
‘থিয়েটার সিনেমা মাথায় থাকুক, আমার সঙ্গে রাস্তায় পর্যন্ত বেরতে রাজী হয় না- পাছে পিসি দেখে ফেলে। আমি একদিন থাকতে না পেরে বললুম তোমার পিসির কুইনটুপ্লেট আছে নাকি যে তারা ম্যুনিকের সব স্ট্র্যাটেজিক পয়েন্টে দাঁড়িয়ে তোমার উপর নজর রাখছে? উত্তরে শুধু কাতর স্বরে বলে, প্লীজ, প্লীজ।’
যা-কিছু আলাপ পরিচয়, ঘনিষ্ঠতা আত্মীয়তা সব ঐ কলেজ রেস্তোরাঁয় বসে। সেখানে সার্ডিন-টিনের ভিতর মাছের মত। চেয়ারে চেয়ারে ঠাসাঠাসি কিন’ তার হাতে যে হাতখানা রাখব তারও উপায় নেই। কেউ যদি দেখে ফেলে।’ আমি বললুম,
‘সমুখে রয়েছে সুধা পারাবার
নাগাল না পায় তবু আঁখি তার
কেমনে সরাব কুহেলিকার এই বাধা রে।’
ডাক্তার বললেন, ‘মানে বলুন।’
আমি বললুম, ‘আপ যাইয়ে, পরে বলবো।’
ডাক্তার বললেন, ‘সেই ভিড়ের মাঝখানে, কিম্বা করিডরে দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে আলাপচারি। করিডরে কথা কওয়া যায় প্রাণ খুলে, কিন’ তবু আমি রেস্তোরাঁর ভিড়ই পছন্দ করতুম বেশী, কারণ সেখানে দৈবাৎ, ক্বচিৎ কখনো এভা তার ছোট্ট জুতোটি দিয়ে আমার পায়ের উপর দিত চাপ।’
‘তার মাধুর্য আপনাকে কি করে বোঝাই? এভাকে পরে নিবিড়তর করে চিনেছি কিন’ সেই পায়ের চাপ যে আমাকে কত কথা বলেছে, কত আশ্বাস দিয়েছে সেটা কি করে বোঝাই?’
‘হয়ত তার চেনা কোনো এক ছোকরা স্টুডেন্ট এসে হাসিমুখে তাকে দুটি কথা বললে। অত্যন্ত হার্মলেস আমি কিন’ হিংসেয় জরজর। টেবিলের উপর রাখা আমার হাত দুটো কাঁপতে আরম্ভ করছে, আমি আর নিজেকে সামলাতে পারছিনে-
‘এমন সময় সেই পায়ের মৃদু চাপ।
সব সংশয়ের অবসান, সব দুঃখ অন্তর্ধান।’
ডাক্তার বললেন, ‘তাই আমার দুঃখ আর বেদনার অবধি রইল না। এই বিরাট ম্যুনিক শহরের লক্ষ লক্ষ নরনারী নিভৃতে মনের ভার নামাচ্ছে, নিষ্ঠুর সংসারে লড়বার শক্তি একে অন্যের সঙ্গসুখ স্পর্শসুখ থেকে আহরণ করে নিচ্ছে, আর আমি তারই মাঝখানে এমন কিছুই করে উঠতে পারছিনে যাতে করে এভাকে অন্তত একবারের মত কাছে টেনে আনতে পারি!
‘শেষটায় আর সইতে না পেরে একদিন এভাকে কিছু না বলে ফিরে গেলুম বার্লিন। সেখান থেকে লিখে জানলুম, ‘ওরকম কাছে থেকে না পাওয়ার দুঃখ আমার পক্ষে সহ্য করা অসম্ভব হয়ে উঠেছে- আমার নার্ভস একদম গেছে। তোমার কাছ থেকে বিদায় নিয়ে আসা আমার কিছুতেই হয়ে উঠত না- তোমার মুখের কাতর ছবি আমার চলে আসার সব শক্তি নষ্ট করে ফেলত।’
আমি বললুম, ‘আপনি তো দারম্নণ লোক মশাই। তবে, হ্যাঁ, আপনাদের নীচশেই বলেছেন, কড়া না হলে প্রেম মেলে না।’
ডাক্তার বললেন, ‘ঠিক উল্টো! কড়া হতে পারলে আমি ম্যুনিক থেকে পালাতুম না। পলায়ন জিনিসটা কি বীরের লক্ষণ? তা সে কথা থাক।
‘উত্তর পেলুম সঙ্গে সঙ্গেই। সে চিঠিটি আমি এতবার পড়েছি যে তার ফুলস্টপ কমা পর্যন্ত আমার মুখসত্ম হয়ে গিয়েছে। এবং তার চেয়েও বড় কথা, সে চিঠিটির বক্তব্য আমার কাছে সম্পূর্ণ অবিশ্বাস্য ঠেকলো।’
আপনাদের দেশে অবিশ্বাস্য বলে কোনো জিনিস নেই- ভিখিরিকে মাথায় তুলে নিয়ে আপনাদের দেশে হাতী হামেশাই রাজা বানায়। কিন’ জর্মনিতে তো সে রকম ঐতিহ্য নেই। চিঠিতে লেখা ছিল-
বেশী লিখব না- আমারও অসহ্য হয়ে উঠেছে। তাই স্থির করেছি, তোমার ইচ্ছামত তোমায় আমায় একবার নিভৃতে দেখা হবে। তারপর বিদায়। যত দিন পিসি আছেন ততদিন আমি আর কোনো পন্থা খুঁজে পাচ্ছিনে। তুমি আসছে বুধবার দিন আমাদের বাড়ীর সামনে ফুটপাতে অপেক্ষা করো। আমি তোমাকে আমার ঘরে নিয়ে আসব।”
ডাক্তার বললেন, ‘বিশ্বাস হয় আপনার! যে মেয়ে পিসির ভয়ে আমার সঙ্গে কলেজ রেসেত্মারাঁয় বাইরে পর্যন্ত যেতে রাজী হত না, সে আমাকে ডেকে নিয়ে যাচ্ছে আপন ঘরে?’
আমি বললুম, পীরিতী-সায়রে ডোবার পূর্বে যে রাধা সাপের ছবিমাত্র দেখেই অজ্ঞান হতেন সেই রাধাই অভিসারে যাওয়ার সময় আপন হাত দিয়ে পথের পাশের সাপের ফণা চেপে ধরেছেন পাছে সাপের মাথার মণির আলোকে কেউ কেউ তাঁকে দেখে ফেলে।’
ডাক্তার বললেন, ‘তাই বটে। তবে কি না আমি রাধার প্রেমকাহিনী কখনো পড়িনি। সে কথা থাক।
‘আমি ম্যুনিকে পৌঁছলুম বুধবার সন্ধ্যের দিকে। কয়লার গুঁড়োয় সর্বাঙ্গ ঢেকে গিয়েছিল বলে ঢুকলুম একটা পাবলিক বাথে স্নান করতে। টাবে বসে সর্বশরীর ডলাই-মলাই করে আর গরম জলে সেদ্ধ হয়ে চিংরিটার মত লাল হয়ে যখন বেরলুম তখন আর হাতে বেশী সময় নেই। অথচ টাব থেকে ওরকম হুট করে ঠান্ডায় বেরলে যে সঙ্গে সঙ্গে ঝপ্ করে সর্দি হয় সে কথাও জানি। চানটা না করলেও যে হত সে তত্ত্বটা বুঝতে পারলুম রাসত্মায় বেরিয়ে কিন’ তখন আর আফসোস করে কোনো ফায়দা নেই। সেই ডিসেম্বরের শীতে চললুম এভার বাড়ির দিকে- মা-মেরীর উপর ভরসা করে, যে এ যাত্রায় সর্দিটা নাও হতে পারে।
আমি বললুম, ‘আমরা বাঙলায় বলি, ‘দুর্গগা বলে ঝুলে পড়লুম’।’
ডাক্তার বললেন, ‘সাড়ে এগারোটার সময় গিয়ে দাঁড়ালুম এবার বাড়ির সামনের রাসত্মায়। টেম্পারেচার তখন শূন্যেরও নীচে- আপনাদের পাগলা ফারন্হাইটের হিসেবে বত্রিশের ঢের নীচে! রাস্তায় এক ফুট বরফ। আকাশ মেঘাচ্ছন্ন, আর আমার চতুর্দিকে যে হিম ঘনাতে লাগলো তার সঙ্গে তুলনা দিয়ে বলতে পারি আমাকে যেন কেউ একটা বিরাট ফ্রিজিডেরের ভিতর তালাবন্ধ করে রেখে দিল।
তিন মিনিট যেতে না যেতে নামল মুষলধারে…বৃষ্টি নয়-সর্দ্দি। সঙ্গে সঙ্গে ডাইনামাইট ফাটার হাঁচি-হাঁচ্চো, হাঁচ্চো, হাঁচ্চো। আপনার আজকের সর্দি তার তুলনায় নস্যি, অর্থাৎ নস্যির খোঁচায় নামানো আড়াই ফোঁটা জল। হাঁচি আর জল, জল আর হাঁচি।
‘কি করি, কি করি ভাবছি, এমন সময় এভা এসে নিঃশব্দে আমার হাত ধরলো- বরফের গুঁড়োর উপর পায়ের শব্দ শোনা যায় না। তার উপর সে পরেছে সেই ক্রেপসোলের জুতো- বেচারীর মাত্র ঐ এক জোড়াই সম্বল!
‘কোনো কথা না বলে আমাকে নিয়ে চলল তার সঙ্গে। ফ্ল্যাটের দরজা খুলে, করিডরের খানিকটে পেরিয়েই তার কামরা। নিঃশব্দে আমাকে সে ঢুকিয়ে দরজায় খিল দিয়ে মাথা নিচু করে আমার সামনে দাঁড়িয়ে রইল।
‘ওভার গোলাপি মুখ ডাচ্ পনিরের মত হলদে, টুকটুকে লাল ঠোঁট দুটি বলু ডানয়ুবের মত ঘন বেগুনি- নীল- ভয়ে, উত্তেজনায়।
‘আর সঙ্গে সঙ্গে শুরম্ন হল আবার আমার সেই ডাইনামাইট ফাটানো হ্যাঁচ্চো, হাঁচ্চো।
‘এভা আমাকে ধরে নিয়ে আমার মাথা গুঁজে দিল বিছানায়। মাথার উপর চাপালো বালিশ আর সব ক’খানা লেপ-কম্বল। বুঝতে পারলুম কেন, পাশের ঘরে পিসি যদি শুনতে পান তবেই হয়েছে। আমি প্রাণপণ হাঁচি চাপাবার চেষ্টা করছি আর লেপ-কম্বলের ভিতর বম্-শেল্ ফাটাচ্ছি।
‘কতক্ষণ এ রকম কেটেছিল বলতে পারব না। হাঁচির শব্দ কিছুতেই থামছে না। এভা শুধু কম্বল চাপাচ্ছে, আমার দম বন্ধ হবার উপক্রম কিন’ নিবিড় পুলকে বার বার আমার সর্বশরীর শিহরিত হচ্ছে- এভার হাতের চাপ পেয়ে।
‘এমন সময় দরজায় ধাক্কা আর নারীকণ্ঠের তীব্র চীৎকার, ‘দরজা খোল।’
‘পিসি!’
‘আর লুকিয়ে থেকে লাভ নেই। আমি লেপের ভিতর থেকে বেরলুম। এভা ভয়ে ভিরমি গিয়েছে, খাটের উপর নেতিয়ে পড়েছে।
‘আমি দরজা খুলে দিলুম। সাক্ষাৎ শকুনির মত বীভৎস এক বুড়ী ঘরে ঢুকে আমার দিকে না তাকিয়েই এভাকে বললো, ‘কাল সকালেই তুই এ-বাড়ি ছাড়বি’।
‘সঙ্গে সঙ্গে আর কি সব বকুনি দিয়েছিল, ঘেন্না, কেলেঙ্কারি, শোবার ঘরে পরপুরম্নষ’, ‘রাসত্মার মেয়ের ব্যাভার’, এই সব, সে আমার আর মনে নেই। বুড়ী আমার দিকে তাকায় না, গালের উপর গাল চড়ছে যেন ছ’ গজি পিয়ানোর এক প্রান্ত থেকে আরেক প্রান্ত অবধি কেউ আঙ্গুল চালাচ্ছে। ‘আমি থাকতে পারলুম না। বুড়ীর দুই বাহু দু’হাত দিয়ে চেপে ধরে বললুম, ‘আমার নাম পেটার সেল্বাখ। বার্লিনে ডাক্তারি করি। ভদ্রঘরের ছেলে। আপনার ভাইঝিকে বিয়ে করতে চাই’।’
ডাক্তার বললেন, মামেরী সাক্ষী আমি এভাকে বিয়ে করার প্রসত্মাব এতদিন করিনি পাছে সে ‘না’ বলে বসে। আমি অপেক্ষা করেছিলুম পরিচয়টা ঘনাবার জন্য। বিয়ের প্রসত্মাবটা আমার মুখ দিয়ে যে তখন কি করে বেরিয়ে গেল আমি আজও বুঝে উঠতে পারিনি।
‘পিসি আমার দিকে হাবার মতো তাকালো- এক বিঘৎ চওড়া হা করে। পাকা দু’মিনিট তার লেগেছিল ব্যাপারটা বুঝতে। তারপর ফুটে উঠল মুখের উপর খুশীর পয়লা ঝলক। সেটা দেখতে আরো বীভৎস! মুখের কুঁচকানো এবড়ো থেবড়ো গাল, ভাঙা-চোরা-নাক-মুখ-ঠোঁট যেন আরও বিকৃত হয়ে গেল।
‘আমাকে জড়িয়ে ধরে কি যেন বললে ঠিক বুঝতে পারলুম না। তারপর হঠাৎ আমাকে ছেড়ে দিয়ে ছুটল করিডরের দিকে। চীৎকার করে কাকে যেন ডাকছে।
‘এভা তখনো অচৈতন্য।’
‘বুড়ী ফিরে এল বুড়োকে নিয়ে। বুড়ো ব্যাপারটা বুঝে নিয়েছে চট করে। তার চেহারাটা খুশীর পিছনে দেখলুম সেই ভীত ভাব-এভার মুখে যেটা অষ্টপ্রহর লেপা থাকে। বুঝলুম, পিসির দাপটে এ বাড়ির সকলেরই কণ্ঠশ্বাস।
‘মনে হল বুড়ো খুশী হয়েছে, এভা যে এ বাড়ির অত্যাচার থেকে নিষ্কৃতি পেয়েছে তার জন্য। হায়, তার তো নিষ্কৃতি নেই।’
ডাক্তার বললেন, ‘সেই দুপুর রাতে ওয়াইন এল, শ্যাম্পেন এল। হোটেল থেকে সসেজ্ কট্লেট্ এল। হৈ হৈ রৈ রৈ। এভা সম্বিতে ফিরেছে। বুড়ো শ্যাম্পেন টানছে জলের মতো। বুড়ী এক গেলাসেই টং। আমাকে জড়িয়ে শুধু কাঁদে আর এভার বাপের কথা স্মরণ করে বলে, ভাই বেঁচে থাকলে আজ সে কী খুশীটাই না হত।
‘আর এভা? আমাকে একবার শুধু কানে কানে বলল, ‘জীবনে এই প্রথম শ্যাম্পেন খাচ্ছি। তুমি আমার উপর একটু নজর রেখো।’
ডাক্তার উৎসাহিত হয়ে আরো কি যেন বলতে যাচ্ছিলেন এমন সময় আস্তে আস্তে দরজা খুলে ঘরে ঢুকলেন এক সুন্দরী- হাঁ, সুন্দরী বটে।
এক লহমায় আমি নর্থ সীর ঘন নীল জল, দক্ষিণ ইটালির সোনালি রোদে রূপালি প্রজাপতি, ডানয়ুবের শান্ত-প্রশান্ত ছবি, সেই ডানয়ুবেরই লজ্জাশীল দেহচ্ছন্দ রাইল্যান্ডের শ্যামলিয়া মোহনীয়া ইন্দ্রজাল সব কিছুই দেখতে পেলুম। আর সে কী লাজুক হাসি হেসে আমার দিকে তিনি হাত বাড়ালেন।
আমি মাথা নীচু করে ফরাসিস কায়দায় তাঁর চম্পক করাঙ্গুলি-প্রান্তে ওষ্ঠ স্পর্শ করে মনে মনে বললুম,
‘বেঁচে থাকো সর্দি-কাশি
চিরজীবী হয়ে তুমি।’
-
সাম্প্রতিক
- অর্ধভাগীর ভাগাভাগি (রম্য); মূল: শায়ের খান
- ব্রাজিল যাত্রা, মূল: গোলাম মোস্তাকীম
- মাশুরির অলৌকিক দ্বীপ- লাংকাউই, মূল: বরেন চক্রবর্তী
- স্পার্ক অভ লাইফ; মূল: এরিক মারিয়া রেমার্ক; অনুবাদ: বুলবুল সরওয়ার
- Bangla Book By Humayun Ahmed
- টক, মিষ্টি, ঝালে ভালবাসা- রিমা জুলফিকার
- ¤ বৈশাখী মিষ্টি খাবার
- ¤ নাকফুলে ফ্যাশন – ফ্যাশনে নাকফুল
- ¤ ছাল-ছাড়ান বাঘ – আষাঢ়ে গল্প
- ¤ বেঁচে থাকো সর্দিকাশি – প্রেমের গল্প
- ¤ দক্ষিণ রায় – হাসির গল্প
- ¤ প্রোগ্রামার – বিজ্ঞান কল্পকাহিনী
-
Links
-
আর্কাইভ
- জুলাই 2009 (4)
- জুন 2009 (1)
- মে 2009 (23)
-
বিভাগ
-
RSS
Entries RSS
Comments RSS