Deshiboi’s Blog

Just another WordPress.com weblog

ব্রাজিল যাত্রা, মূল: গোলাম মোস্তাকীম

ব্রাজিল যাত্রা

গোলাম মোস্তাকীম
http://www.DeshiBoi.com

প্রায় এক মাস আগে ব্রাজিল যাত্রার সুযোগটি আমাদের মন্ত্রণালয়ে এসেছিল। পাঠিয়েছিলেন ঈঋঈ (ঈড়সসড়হ ভঁহফ ভড়ৎ পড়সসড়ফরঃরবং)-এর ব্যবস্থাপনা পরিচালক অঁধন অষর গপযঁসড়. আমাদের মন্ত্রণালয়ের সিনিয়র সহকারী সচিব মোঃ দেলোয়ার হোসেন আমাকে বললেন, ‘আগে মন্ত্রণালয়ের অতিরিক্ত সচিব এই প্রোগ্রাম-এ গিয়েছিলেন। কাজেই আপনি ব্রাজিল যাবেন।’ আমি মনে মনে পুলকিত বোধ করলেও ঠিক উৎসাহিত বোধ করতে পারিনি। কারণ এ পর্যন্ত আমার বিদেশযাত্রা ভাগ্য তেমন ভাল নয়। তারপরেও আশা থেকে যায় মনের ভেতরে। সংশ্লিষ্ট নথির উপ-সচিব অমিতাভ চক্রবর্তী কানাডায় আছেন।
Brazil_01

সিনিয়র সহকারি সচিব নথিতে সাধারণভাবে বিষয়টি উল্লেখ করে আমার কাছে পেশ করলেন। আমি স্বাক্ষর করে সচিব বরাবর পাঠিয়ে দিলাম। মনে আশা ছিল সচিব মহোদয় আমাকে মনোনয়ন দেবেন। পরদিন নথিটি আমার কাছে ফেরত আসল। আলোচনা প্রয়োজন। পরদিন নথিটি নিয়ে আমি সচিব মহোদয়ের কাছে গেলাম এবং বললাম আগে অতিরিক্ত সচিব এই প্রোগ্রামে গিয়েছেন। তার সঙ্গে আলাপ সেরে আমি সিনিয়র সহকারি সচিবকে ডাকলাম এবং সচিবের মনোনয়ন উল্লেখ করে সারসংক্ষেপ দিতে বললাম।
Brazil_02
দুই-তিন দিন পর অমিতাভ চক্রবর্তী আমার কাছে এসে বললেন, ‘স্যার, সচিব স্যার ব্রাজিল যাচ্ছেন না। তিনি ব্রসেলস যাচ্ছেন। আপনি ব্রাজিল যাচ্ছেন। আপনি অমত করবেন না। আমি বললাম, গত চার বছরে আমি মাত্র একবার বিদেশ গিয়েছি। না করার প্রশ্নই আসে না।’

তারপর শুরু হলো আমার ব্রাজিল যাত্রার পালা। প্রথমে ভিসার জন্য আমার পাসপোর্ট দিল্লীতে পাঠালাম আমার বন্ধু ওয়াসী আহমেদের কাছে। আমার ভিসা দিল্লী থেকে নিতে হবে।

সোমবার আমি ফোন করে জানতে পারলাম যে, ওয়াসী আমার পাসপোর্ট পেয়ে গেছে এবং মঙ্গলবার সকাল ১১টায় ওয়াসী আমাকে ফোন করে জানিয়ে দিল যে, নতুন দিল্লীর ব্রাজিল দূতাবাস দু’ঘণ্টার মধ্যে আমার ভিসা দিয়ে দিয়েছে। বুধবার সকাল ১১টার মধ্যে আমি পাসপোর্ট পেয়ে গেলাম। বৃহস্পতিবার আমার থাই ভিসা হয়ে গেল। তারপর ঝামেলায় পড়লাম।

২৯ এপ্রিল আমি জর্মন দূতাবাসে ভিসার জন্য আমার পাসপোর্ট জমা দিলাম। ৩০ এপ্রিল সকালে আমি জর্মন দূতাবাসের ভিসা অফিসারের সঙ্গে তিন বার ফোনে কথা বললাম, ফ্যাক্স করে ৪টি কাগজ পাঠালাম। ফল শূন্য। আমাকে শুধু বিমানবন্দর ব্যবহার করার ভিসা দেয়া হয়েছে।

২ মে ছিল বৌদ্ধ পূর্ণিমা, সরকারি ছুটির দিন। ৩ মে আমি পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ে গেলাম শুধুমাত্র এই কথাটি বলার জন্য আমাকে শুধুমাত্র ধরৎঢ়ড়ৎঃ ঃৎধহংরঃ দেয়া হয়েছে। আমি একজন মহাপরিচালক (ইউরোপ)-এর কাছে গেলাম। তিনি একটি সভায় যাবেন বলে আমাকে সংশ্লিষ্ট পরিচালকের কাছে পাঠিয়ে দিলেন। আমি তাকে বললাম, ‘আগামীকাল আমি ব্রাজিল যাচ্ছি। আমার ভিসার ংঃধঃঁং পযধহমব হবে না আমি জানি, সময়ও নেই। তবে জর্মন দূতাবাসের জানা উচিত তারা আমার সঙ্গে অনুচিত আচরণ করেছেন।’

পরিচালক মহোদয় জর্মন দূতাবাসের মহিলা ভিসা অফিসারকে যা বললেন এবং যেভাবে বললেন তাতে আমি সন্তুষ্ট। আমার কাজ না হলেও আমার কাজ হয়েছে বলে আমার মনে হলো।

৪-০৫-২০০৭

আজ সকালেই আমার ঘুম ভেঙ্গে গেল। গত বছর ফেব্রুয়ারি মাসের ১২ তারিখ আমি ইরান গিয়েছিলাম। তারপর আজ ব্রাজিলের উদ্দেশ্যে রওয়ানা হচ্ছি। ভাল লাগছে এই ভেবে যে, ফিরে আসার পর আমার হাতে হয়তো প্রায় পঞ্চাশ হাজারের মত টাকা থাকবে। মোট ৪টি দেশ দেখা হবে। সংযুক্ত আরব আমীরশাহী, জর্মনী, ফ্রান্স হয়ে আমাকে ব্রাজিলিয়া, ব্রাজিল যেতে হবে। জর্মনী ও ফ্রান্সে আমি বিমানবন্দরের বাইরে যেতে পারব না। তারপরও আমার কাছে অনেক কিছু।

সকাল সাতটার মধ্যে আমাদের প্রটোাকল অফিসার এসে গেলেন। আমার ড্রাইভার জনাব মোঃ বেলায়েত এবং জীবনবীমা কর্পোরেশনের ড্রাইভার মোঃ খোরশেদ আলমকে দেখলাম। প্রটোকল অফিসার সকাল ৭:২০ মিনিটে আমার পাসপোর্ট ও টিকেট নিয়ে চলে গেলেন। আমি, কাঁকন, ধ্রুব আর অভ্র সকাল পৌনে আটটায় রওয়ানা দিলাম বিমানবন্দরের দিকে। সকাল সাড়ে আটটার মধ্যে ভিআইপি লাউঞ্জে পৌঁছে সকাল ৯:২৫ মিনিটে বিমানে উঠলাম।

৯:৫৫ মিনিটে বিমান চলতে শুরু করল। জানালার পাশে আমি সিট পেয়েছিলাম। তাই বিমান উঠা-নামার সময় নিচের অনেক দৃশ্য দেখতে পেলাম।

দুপুর সাড়ে বারটার সময় আমি আবুধাবী বিমান বন্দরে নামলাম। কিছুদূর হাঁটার পর দেখা গেল ইতিহাদ বিমান-এর এক মহিলা কর্মী আমার নামের একটি প্লাকার্ড ধরে দাঁড়িয়ে আছেন। সামনে গিয়ে নিজের পরিচয় দিলাম। এমন সময় এক বাঙালি ভদ্রলোক এসে তার পরিচয় দিলেন। তিনি আবুধাবীতে বাংলাদেশ দূতাবাসের প্রটোকল অফিসার। ভদ্রলোক আমাকে নিয়ে ঘন্টাখানেকের মধ্যে জবমবহপু হোটেলে পৌঁছলেন এবং আমার কাছ থেকে বিদায় নিয়ে চলে গেলেন। তার নাম দেওয়ান রানা। বাড়ি মৌলভীবাজার।

বিকেল তিনটায় দুবাই থেকে আমাদের কমার্শিয়াল কাউন্সেলর জনাব মাহমুদুর রহমান আমাকে ফোন করে জানালেন যে, তিনি শহীদ বখতিয়ার আলমকে নিয়ে বিকেল পাঁচটায় আমার হোটেলে আসবেন। আমার রুম নম্বর ১২১২।

পৌনে ছটার দিকে বখতিয়ার সাহেব ও মাহমুদ সাহেব আসলেন। আমরা দুবাই-এর দিকে যাত্রা শুরু করলাম। দূরত্ব ১৫০ কিলোমিটার। পথে ইবনে বতুতার সফর নিয়ে যে যাদুঘরের মত করা হয়েছে তা দেখলাম। যাদুঘরের চারদিকে অনেক দোকান। তারপর দেখলাম জুমাইয়া সমুদ্র সৈকত। বালুর ওপর চাদর বিছিয়ে অনেকে শুয়ে আছেন।

রাত এগারটার সময় মাহমুদ সাহেবের বাসায় পরিচয় হলো তার স্ত্রী এবং কন্যা অদ্রিকার সঙ্গে। তারপর খাওয়া-দাওয়া। বিরাট আয়োজন। আমি বখতিয়ারকে বলেছিলাম- হোটেলেই খাব। কাউকে কষ্ট দেয়ার পক্ষপাতী ছিলাম না। কিন্তু বখতিয়ার যেভাবে বলল তারপর আর না করতে পারলাম না। রান্না ছিল চমৎকার। কিন্তু ক্লান্তির কারণে খেতে পারলাম না।

বখতিয়ার এবং মাহমুদ দু’জনেই তাদের কিছু পেশাগত অসুবিধার কথা আমাকে বললেন। বখতিয়ার জানাল, আগামী ১ জুলাই থেকে বাংলাদেশের বৈদেশিক মিশনের কর্মকর্তারা ২০% বেশি বেতন পাবেন।

রাত দুটোর সময় হোটেলে ফিরে এলাম। আমাদের সঙ্গে আমজাদ বলে এক ভদ্রলোক এসেছিলেন।

৫-০৫-২০০৭

সকালেই ঘুম থেকে উঠে পড়ি। ইত্তেহাদের সৌজন্যে জবমবহপু হোটেলে থাকা-খাওয়া ফ্রি। সকাল নটার মধ্যে ১৫ তলা থেকে নাস্তা করে আসলাম। তারপর সোয়া দশটায় আমি নিচে নেমে এসে চাবি জমা দিয়ে আমার পাসপোর্ট নিলাম। সকাল এগারটার সময় গাড়িতে করে আবুধাবী বিমানবন্দরের দিকে যাত্রা শুরু হলো। সকাল থেকে কেউ আমার কাছে আসেননি বা কেউ আমাকে ফোনও করেননি। আমি আসতে নিষেধ করেছিলাম। কিন্তু কেউ কেন ফোন করলেন না তা বুঝতে পারলাম না।

দুপুর একটায় আমার প্লেন ছেড়ে দিল- এবারো ইতিহাদের বিমান। বিকেল পৌনে পাঁচটার সময় আমরা ফ্রাঙ্কফুর্ট বিমানবন্দরে নামলাম। একঘন্টা লাইনে দাঁড়িয়ে থাকার পর জানতে পারলাম যে, আমার এই চধংংঢ়ড়ৎঃ পড়হঃৎড়ষ -এ কিছু করার নেই। আমি নেমেছিলাম ২ নম্বর টার্মিনাল-এ। আমাকে ১ নম্বর টার্মিনালে যেতে হবে। প্রথমে কোন কিছু ঠিক পেলাম না। ঠঅজওএ অরৎষরহবং -এর খবর কেউ জানে না। তারপর একজন আমাকে পথ বাতলে দিলেন। আমি ঝযঁঃষব ঃৎধরহ ১ নম্বর টার্মিনালে গেলাম। সেখানে কয়েকজনকে জিজ্ঞাসা করে কোন সদুত্তর পেলাম না। তারপর একজন মহিলা জানিয়ে দিলেন আমাকে ৪৪নং গেটে যেতে হবে। তখন মাত্র ছটা বাজে। আমার প্লেন সাও পওলোর উদ্দেশে ছাড়বে রাত দশটায়। এখনও চার ঘন্টা আছে হাতে।

যখন বিমান ফ্রাঙ্কফুর্ট বিমানবন্দরে নামছিল আমি জানালা দিয়ে বাইরের দিকে তাকিয়েছিলাম। ঘর-বাড়ি দেখলাম। নদী দেখলাম এবং দেখলাম ঘন বন। মনে হলো গভীর বন কেটে এই বিমানবন্দর তৈরি করা হয়েছে।

আমার হাতে অনেক সময়। কিন্তু বাইরে যাওয়ার উপায় নেই। কাজেই আমি ভেতরে ঘুরাঘুরি শুরু করলাম। কত কথা

মনে হচ্ছিল। যতদূর মনে পড়ে জর্মনীর কথা প্রথম শুনি হ্যামিলনের বংশীবাদক নামক গল্পটি পড়ে। তারপর সৈয়দ মুজতবা আলীর বই পড়ে জর্মনী সম্পর্কে নিজের মনের ভেতর একটি গভীর আগ্রহের সৃষ্টি হলো। ১৯৬৭ সালে বৃত্তির টাকা দিয়ে আমি কিছু বই কিনেছিলাম। তার মধ্যে একটি বই ছিলঃ ঞযব জরহব ধহফ ঋধষষ ড়ভ ঃযব ঞযরৎফ জবরপয লেখক উইলিয়াম শাইয়ার। তারপর গ্যাটে এবং শিলারের কথা বলতে পারি।

চারঘন্টা কাটাতে বেশ কষ্ট হচ্ছিল। আমি দোতলায় ৪৪ নম্বর গেট বের করে ফেললাম। উঁঃু ঋৎবব ংযড়ঢ় গুলোতে হাঁটাহাঁটি শুরু করলাম। চকোলেট কিনব বলে ঠিক করলাম। কিন্তু এক বয়স্কা মহিলার আচরণে সেই আশা ত্যাগ করলাম। ভাবলাম ফেরার পথে প্যারিসের বিমানবন্দর থেকে এসব কিনব।

রাত আটটার পর আমি বোর্ডিং পাস নিলাম। রাত সোয়া ন’টায় বোর্ডিং পাস নিয়ে ৪৪নম্বর গেটের ভেতরে বসলাম। একে একে যাত্রীরা আসতে শুরু করলেন। ব্রাজিলীয়দের বেশ মজার এবং আমুদে লোক মনে হলো। বেশ ঠাট্টা-মস্করা-গল্প-গুজব চলল। রাত দশটায় আমাদের বিমান চলতে শুরু করল। যাত্রার সময় ১৩ ঘন্টা। রাতের খাবার খেয়ে ঘুমিয়ে পড়লাম।

৬-০৫-২০০৭

ভোর সাড়ে পাঁচটায় আমাদের বিমান সাও পওলো বিমানবন্দরে নামলো। তখন ভোরের আলো দেখা দেয়নি। চধংংঢ়ড়ৎঃ পড়হঃৎড়ষ -এর কাজ সেরে আমি হেঁটে এক নম্বর টার্মিনালে চলে আসলাম।

সকাল ন’টায় আমার যাবার বিমান ব্রাজিলিয়ার উদ্দেশ্যে যাত্রা শুরু করল। বিমান দু’জায়গায় অবতরণ করে দুপুর দু’টায় ব্রাজিলিয়ায় পৌঁছল। মাঝখানের শহর দু’টির নাম মনে পড়ছে না।

বিমানে এক যুবকের সঙ্গে পরিচয় হলো। সে মোটামুটি ইংরেজি বলতে পারে। কাজের জন্য কিছু দিন মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে ছিল। আমাদের দেশের খাবার পছন্দ।

ব্রাজিলিয়া বিমানবন্দর থেকে বাইরে এসে দেখলাম আমার জন্য দু’জন যুবক-যুবতী দাঁড়িয়ে আছে। দশ মিনিট অপেক্ষা করে তারা একটি মাইক্রোবাসে তুলে দিল। প্রায় আধঘন্টা পর আমরা পৌছালাম। হোটেলের আনুষ্ঠানিকতা সেরে রুমে চলে আসলাম। রুম নম্বর ২০১২। হাতমুখ ধুয়ে ঘুমিয়ে পড়লাম। সুন্দর শহর। তবে আমাদের হোটেল শহরের বাইরে। রাত ন’টায় আমি ঘুম থেকে জেগে উঠি।

০৭-০৫-২০০৭

সকালেই আমার ঘুম ভেঙ্গে গেল। সুন্দর সকাল। আনুষ্ঠানিক কাজ সেরে হোটেলের খাবার ঘরে যাই নাস্তার জন্য। নাস্তা সেরে পৌনে ন’টার মধ্যে কনফারেন্স হলে চলে আসি। দুনিয়ার প্রায় ১০০টি দেশ থেকে প্রতিনিধিরা এসেছে। তবে এর মধ্যে আফ্রিকার প্রতিনিধির সংখ্যা আমার কাছে বেশি মনে হল।

সকাল সাড়ে ন’টার দিকে সম্মেলন শুরু হলো। অনেক কথাবার্তা হলো। ঊসনহধঢ়ধ বলে একটি কৃষি গবেষণা প্রতিষ্ঠান নিয়ে বেশি কথাবার্তা হলো। ব্রাজিলীয় অর্থনীতিতে কৃষির অবদান ও প্রভাব নিয়ে অনেক বক্তৃতা হলো।

দুপুর পৌনে একটার পর আমাদেরকে ঊসনহধঢ়ধ -র প্রধান কার্যালয়ে নিয়ে যাওয়া হলো। বিস্তৃত প্রান্তর। সব দালানকোঠা একতলা। আমাদের জয়দেবপুরের কৃষি গবেষণা সংক্রান্ত বহুতল ভবনের কথা মনে হলো। পরে ভাবলাম ব্রাজিলে জমির অভাব নেই বলে একতলা ভবন করা হয়েছে।

বাংলাদেশের এক ভদ্রলোকের সঙ্গে পরিচয় হলো। নাম ড. শহীদুর রশীদ। বাড়ি চট্টগ্রাম। তিনি ওহঃবৎহধঃরড়হধষ ঋড়ড়ফ জবংবধৎপয ওহংঃরঃঁঃব -এ গবেষণা কর্মকর্তা হিসেবে কাজ করেন। তার বর্তমান কর্মস্থল ইথিওপিয়া।

আমরা সন্ধ্যা ছ’টার পর হোটেলে ফিরে এলাম। ঘএঙ ও ঈরারষ ংড়পরবঃু -এর কর্মকর্তাদের সঙ্গে এক মতবিনিময় সভা ছিল। কিন্তু ক্লান্তির কারণে যোগদান করা থেকে বিরত থাকলাম। পরে সন্ধ্যা সাড়ে সাতটায় সংবর্ধনায় যোগদান করলাম। রাতে হালকা কিছু খেয়ে ঘুমিয়ে পড়লাম।

০৮-০৫-২০০৭

আজ বাইরে কোন কর্মসূচি ছিল না। সারাদিন বক্তৃতা শুনতে হলো। দু’জন ভারতীয় ডায়াসে বসলেন। একজন কমল মালহোত্রা, পাঞ্জাবের অধিবাসী। অন্যজন লক্ষ্মীপুরী। তার বাড়ি ভারতের কোথায় তা আমার জানা হয়নি। বক্তারা একের পর এক বক্তৃতা দিয়ে চললেন। অধিকাংশ বক্তৃতা ইংরেজিতে হলো। ফরাসী বা পর্তুগীজে বক্তৃতা হলে তার ইংরেজি অনুবাদ শুনলাম। আজ প্রায় সন্ধ্যা ছটা পর্যন্ত সভা চলল। বেশ ক্লান্তই মনে হচ্ছিল নিজেকে। কিন্তু একটা ব্যাপার ভেবে ভাল লাগছিল যে, অতিরিক্ত সচিব হিসেবে আমার প্রথম বিদেশ যাত্রা একটি আন্তর্জাতিক সম্মেলনে হলো এবং ঘটনাস্থল ব্রাজিল। অনেক পথ পেরিয়ে আমাকে ব্রাজিলে আসতে হয়েছে। আমি সব সময়ই ভেবেছি যে, সরকারি কাজে আমি প্রায় ৫০/৬০টি দেশে যাব। মনে হচ্ছে আমি ঠিকই ভাবতাম। বিদেশে আসলে প্রথম সুবিধা হলো নতুন দেশ দেখা যায়। অনেক কিছু শেখা যায়। অনেক নতুন মানুষের সঙ্গে পরিচয় হয়। অভাবনীয় প্রাকৃতিক দৃশ্য দেখা যায়। আর নিজেকে আন্তর্জাতিক প্রেক্ষিতে রেখে তুলনা করা যায়।

আজ সন্ধ্যা সাতটায় সংবর্ধনা ছিল। ঢালাও মদ্যপানের ব্যবস্থা ছিল। কাঁকন, ধ্রুব আর অভ্রর কথা ভেবে আমি শুধুমাত্র নির্মল পানীয় খেলাম। মাঝে মাঝে কিছু খাবারের ব্যবস্থা ছিল। তবে তা প্রয়োজনের তুলনায় খুবই অপ্রতুল। আমার বা পাশে জিম্বাবুয়ের এক মহিলা বসেছেন এবং ডানপাশে নেপালের এক ভদ্রলোক। তিনি যুগ্মসচিব। টঘউচ র সঙ্গেও তার যোগাযোগ আছে। বা পাশের মহিলা সমানে ঘাড় গুঁজে নোট নিয়ে যাচ্ছেন। আমার বিশ্ববিদ্যালয় জীবনের কথা খুব মনে পড়ছে। তখনও দেখতাম অনেকে ঘাড় গুঁজে নোট করে যাচ্ছে।

দু’জন থাই ভদ্রলোক সমানে মদ্যপান করে যাচ্ছেন। এক ভদ্রলোক আমাকে ফৎরহশং ড়ভভবৎ করলেন। আমি সবিনয়ে প্রত্যাখ্যান করলাম। রাত ন’টার পর আমি আমার রুমে চলে আসলাম।

গত ৪ তারিখে বিমানে উঠার পর থেকেই কাঁকন, ধ্রুব আর অভ্রর কথা খুব মনে হচ্ছিল। যখনই ভাল কিছু খাই তখনই তাদের কথা মনে পড়ে। ভাল দৃশ্য মনে হলেই তাদের কথা মনে হয়। তাছাড়া এখন পর্যন্ত আমি ঢাকার সঙ্গে কোন যোগাযোগ করতে পারিনি। একদিন চলে গেলেই মনে হয় আমি তো এখন দেশে ফেরার দিকে এগিয়ে যাচ্ছি। আমি জানি না।

৯-০৫-২০০৭

আজ দুপুরে ঢাকায় ই-মেইল করলাম। এক থাই ভদ্রলোকের ই-মেইল ব্যবহার করে আমি ঢাকায় ই-মেইল করলাম। মনে একটু শান্তি পাচ্ছি। দেখি মুন্না কত তাড়াতাড়ি আমার ই-মেইলের উত্তর দেয়।

টাকা-পয়সা সব পেয়ে গেলাম। ফিলিপিনো মহিলাটি যে এত অদক্ষ তা আমি ভাবতে পারিনি। আমার মনে হয় সে ইংরেজি কিছুই বুঝে না। তাকে আমি বেশ ভাল করে বুঝিয়েছিলাম যে, টিকিট বাবদ আমার পাওনা ৪,৯৩০ ডলার।

সে আমার জন্য মাত্র ৪,৫৭৫ ডলারের চেক তৈরি করে রেখেছে। সঙ্গের ভদ্রলোককে আমি বুঝাতে সক্ষম হলাম যে, আমার আরো পাঁচশত ডলারের মত পাওনা আছে। তারা আমাকে বাকি টাকা দিয়ে দিল। চেকের বাইরে সব অর্থ দেয়া হলো ব্রাজিলিয়ান রিয়ালে। এসব আবার আমাকে ডলারে পরিণত করতে হবে।

আজ সারাদিন বক্তৃতা শুনে কাটাতে হলো। মনে হলো সেই বিশ্ববিদ্যালয় জীবনে ফিরে গেছি। অনেক কথাই আমার মনে হচ্ছে। তবে বিশেষ করে কাঁকন, ধ্রুব আর অভ্রর কথা মনে হচ্ছে। সব সময় বাড়ির কথা, ঢাকার কথা মনে হয়। মনে হয় আমি বুড়ো হয়ে গেছি।

আমাদের সকল প্রতিনিধিদের তিন ভাগ করে দেয়া হলো। প্রথম দল ঝঁঢ়ঢ়ষু ংরফব সম্পর্কে সুপারিশ করবে। দ্বিতীয় দল সুপারিশ করবে ঠধষঁব পযধরহ সম্পর্কে। আমি তৃতীয় দলে ছিলাম। আমাদের কাজে ছিল অর্থায়ন সম্পর্কে মন্তব্য করা। আমি আমার মন্তব্যে আমাদের দেশের কৃষকরা কেন ন্যায্য মূল্য পায় না তা বললাম। আমি বললাম মধ্যস্বত্বভোগীদের হটিয়ে দিতে হবে। কারণ পণ্যের লাভের অধিকাংশ তারাই খেয়ে ফেলে।

আজ বিকেল সাড়ে চারটার মধ্যে আমাদের কাজ শেষ হয়ে গেল। আমি হোটেলে চলে আসি। শুয়ে-বসে সন্ধ্যা পার করে দেই। এখানে টিভি দেখা ছাড়া অন্যকোন কাজ নেই। শহর থেকে ২০ কিলোমিটার দূরে এই হোটেল। হোটেলের পাশে কৃত্রিম লেক। তবে দেখতে লাগে ছোটখাটো নদীর মত। আমার হোটেলের বারান্দা থেকে ব্রাজিলের প্রেসিডেন্ট সিলভা ডি লুসার সরকারি বাসভবন দেখা যায়। এ সংবাদ প্রথমদিনই হোটেলের এক পোর্টার আমাকে দিয়েছিল। আমি কোন উৎসাহবোধ করিনি।

১০-০৫-২০০৭

আজ আমাদের সম্মেলন আনুষ্ঠানিকভাবে শেষ হলো। আগামীকাল ভোর সাড়ে পাঁচটায় আমরা তিনশো মাইল দূরে একটি কারখানা দেখতে যাব যেখানে আগ থেকে চিনি আর ইথানল তৈরি করা হয়। ফিরতে রাত এগারটা হয়ে যাবে।

আজ সকাল সাড়ে ন’টায় সম্মেলন শুরু হলো। ডায়াসে ৭/৮ জন বসলো। ভারতের দু’জন আছেন এবং বাংলাদেশের কেউ নেই। বিষয়টি ভেবে আমার বেশ খারাপই লাগছিল। ভারতীয় দু’জনের একজন ভদ্রলোক, অন্যজন ভদ্রমহিলা। আমার দু’জনকেই গবফরড়পধৎব মনে হলো। গতকাল অপরাহ্ণে আমরা যে আলাপ-আলোচনা এবং সুপারিশ করেছিলাম তার উপর ভিত্তি করেই আলোচনা চূড়ান্ত করা হলো। এর মধ্যে দু’-একজন নতুন কিছু বললেন। কেউ কেউ বললেন যা আলোচনা এবং সুপারিশ হয়েছিল তা প্রতিবেদনে প্রতিফলিত হয়নি। সম্মেলনের চেয়ার অঁধন অষর গপযঁসড় সবকিছু প্রতিবেদনে প্রতিফলিত করার প্রতিশ্রুতি দিলেন। তিনি যে বক্তব্য রাখলেন তা আমার মনপুত হলো। তাকে আমার সহনশীল এবং প্রাজ্ঞ মনে হলো। যখন আমার বলার পালা এলো, আমি বললাম, আমরা যারা উন্নয়নশীল দেশে বসবাস করি তাদের দুর্ভাগ্য হলোঃ আমরা যা উৎপাদন করি তার তেমন কোন মূল্য নেই আন্তর্জাতিক বাজারে। দেশের ভেতরে অনেক সমস্যা রয়েছে। যারা উৎপাদন করে অর্থাৎ কৃষকদের কোন সামাজিক মর্যাদা নেই। আমরা যে জাতি হিসেবে কত অকৃতজ্ঞ তা প্রকাশ করি একটি গালির মাধ্যমেঃ ‘চাষার বাচ্চা’। যারা আমাদের জন্য লজ্জা নিবারণের কাপড় তৈরি করে তাদেরও আমরা গালি দেই ‘জোলার বাচ্চা’ বলে। আন্তর্জাতিক ক্ষেত্রে আমাদের পণ্য বিপণনের জন্য আমরা যে সব বাঁধার সম্মুখীন হই তার বিস্তারিত আলোচনা অনেকেই করেছেন। কাজেই দেশের ভেতরে এবং বাইরে আমাদের প্রয়োজনীয় ও প্রায়োগিক সংস্কার করতে হবে। আমার বক্তব্য শেষে প্রচুর হাততালি পেলাম। আমার ভাল লাগল।

১১-০৫-২০০৭

ভোর চারটায় হোটেলের পোর্টার আমাকে ঘুম থেকে জাগালেন। আমরা ভোর পাঁচটায় রওয়ানা দেব সেই দূরের শহরের কারখানা দেখতে যেখানে আখ থেকে চিনি আর ইথানল তৈরি করা হয়। আমাদের বাস ঠিক সময়ে চলতে শুরু করল। ২০ মিনিটেই আমরা শহরের বাইরে চলে গেলাম। রাস্তার দু’পাশে দিগন্ত বিস্তৃত প্রাকৃতিক দৃশ্যাবলী দেখতে দেখতে গেলাম। আমার পাশে বসেছিলেন এক ব্রাজিলীয় ভদ্রলোক। তিনি ঊসনহধঢ়ধ য় কাজ করেন। অনেক চটপটে এবং খোলা মনের মানুষ। তার সঙ্গে ব্রাজিলের বিভিন্ন বিষয় এবং আন্তর্জাতিক অনেক ব্যাপার নিয়ে আলাপ-আলোচনা হলো। তিনি তার জীবনের নানা অভিজ্ঞতার কথা আমাকে বললেন। তার জীবনের শুরুতে তিনি কিভাবে গবেষণার কাজে উৎসাহিত হলেন, কিভাবে তিনি গবেষণায় সফলতা লাভ করলেন সবকিছুই আমাকে বিস্তারিত বললেন। এক সময় তিনি আমার অনুমতি নিয়ে অন্য এক যাত্রীর কাছে চলে গেলেন। আমি জানালা দিয়ে বাইরের দৃশ্যের প্রতি মনোযোগ দিলাম। আমাদের বাস মাইলের পর মাইল চলে যাচ্ছে। কিন্তু কোন ঘর-বাড়ি দেখা যাচ্ছে না। মাঝে মাঝে ৪০/৫০ পর দু’টো একটা খামার বাড়ি দেখা যায়। বিশাল বিশাল গোচারণ ভূমিতে গবাদিপশু চড়ে বেড়াচ্ছে। কিন্তু কোন লোকজন নেই। আমার মনে হলো কেউ হয়তো সকালের দিকে ওইসব গবাদিপশু রেখে গিয়েছে এবং সন্ধ্যার আগে হয়তোবা গোশালায় নিয়ে যাবে।

মাঝে মাঝে আমাদের বাস গভীর বনের ভেতর দিয়ে যাচ্ছে। রাস্তার দু’পাশে গভীর বন। নাম নাজানা কত রকমের গাছ যে দেখছি তার কোন ইয়ত্তা নেই। বন এত গভীর যে, সেখানে সূর্যের আলো প্রবেশ করতে পারে না। দু’টো একটা গাড়ি মাঝে মাঝে আমাদের পাশ দিয়ে উল্টোদিকে চলে যাচ্ছে। অনেকক্ষণ পর দেখলাম একটি উপশহর। সেখানে দেখলাম ছোট ছোট দোকান-পাট। সবচেয়ে অবাক হলাম কোন শিশুকে দেখা যায় না। তাহলে এই বিশাল দেশে কি অদূর ভবিষ্যতে বিদেশ থেকে কর্মঠ কর্মীবাহিনী আনতে হবে। স্বাভাবিকভাবেই আমার নিজের দেশের কথা মনে হলো। আমরা যদি আমাদের দেশের দক্ষ শ্রমিকদের পর্তুগীজ ভাষা শিখিয়ে এদেশে পাঠাতে পারি তাহলে সেটা একটা কাজের কাজ হবে। আমি যখনই বিদেশে গিয়েছি তখনই সেখানে আমাদের দেশের দক্ষ-অদক্ষ শ্রমিক পাঠানোর বিষয়টি ভেবেছি।

আমাদের বাস সামনে এগিয়ে চলেছে। দু’পাশে নয়নাভিরাম দৃশ্য। এসব দেখছি আর দেশের কথা ভাবছি। সৈয়দ মুজতবা আলীর কথা আমার খুব মনে হচ্ছে। সৈয়দ মুজতবা আলী সম্পর্কে একবার এক বিদেশী বলেছিলেন, এই ভদ্রলোক দেশ-বিদেশ ঘুরে বেড়ান সব সময় নিজের দেশকে হৃদয়ে রেখে। পুরীর সমুদ্র সৈকত দেখার সঙ্গে সঙ্গেই আমাদের দেশের কক্সবাজারের কথা মনে হয় এবং এই ভেবে আনন্দিত এবং পুলকিত হই যে, আমাদের কক্সবাজার সমুদ্র সৈকত সত্যিই তুলনাহীন। সকাল ১১টার দিকে আমরা আমাদের গন্তব্যস্থলে পৌঁছলাম। সেখানে সকলকে উষ্ণ সংবর্ধনা দেয়া হলো। আমরা সবাই একটা করে কোম্পানীর মনোগ্রাম অংকিত ক্যাপ পেলাম। আমরা সবাই আনন্দিত ও সম্মানিত বোধ করলাম। তারপর শুরু হলো বক্তৃতার পালা এবং সঙ্গে সঙ্গে আমাদের হালকা পানীয় দিয়ে আপ্যায়ন করা হলো। কয়েকজন বক্তা ব্রাজিলের বর্তমান এবং আগের অর্থনৈতিক অবস্থা তুলনা করে বক্তব্য পেশ করলেন। আখ থেকে কিভাবে চিনি এবং ইথানল তৈরি করা হয় তা আমাদের সামনে বিশদভাবে বর্ণনা করা হলো। ব্রাজিল যে একটা বিশ্ব অর্থনৈতিক শক্তিতে পরিণত হচ্ছে তার উপর বিশেষ জোর দেয়া হলো। তারপর আমাদের কারখানা দেখানো হলো। আমরা বিশেষ পোশাক পরলাম। সবকিছু ঘুরে ঘুরে দেখলাম। কোম্পানি হতে গাইডের ব্যবস্থা করা হয়েছিল। আমরা সবকিছুই উপভোগ করলাম। সর্বশেষ দেখলাম নিয়ন্ত্রণ কক্ষ। কম্পিউটারের মাধ্যমে সবকিছু নিয়ন্ত্রণ করা হচ্ছে।

দুপুরে আমাদের জন্য খাবারের আয়োজন ছিল। একটা বিষয় আমার মনোযোগ আকর্ষন করল। কারখানার ভিতর কর্মকর্তা-কর্মচারীদের আবাসনের ব্যবস্থা করা হয়েছে। কর্মকর্তা-কর্মচারীদের জন্য বিনোদন এবং তাঁদের সন্তানদের শিক্ষা, চিকিৎসা ও বিনোদনের বিশেষ ব্যবস্থা করা হয়েছে। কারণ লোকালয় থেকে বেশ দূরে এই কারখানা অবস্থিত।

বিকেল তিনটার সময় আমাদের বিদায়ের সময় এসে গেল। আমরা সবাই আমাদের বাসে করে আখ খেতে চলে গেলাম। সেখানে ট্রাক্টরের মাধ্যমে কিভাবে আখ কাটা হচ্ছে এবং তা কারখানায় পাঠানোর জন্য কি কি করা হচ্ছে তা আমরা দেখলাম। সবই যন্ত্রের মাধ্যমে করা হচ্ছে। খেতের কাজ দেখে আমরা ব্রাজিলিয়ার দিকে যাত্রা শুরু করলাম।

এবার আমার পাশে বসেছিলেন এক ব্রাজিলীয় যুবক। তাঁর বয়স ৩২। তিনি কাছেই উপশহরে যাচ্ছেন। সেখানে তিনি পরিবারের সংগে বসবাস করেন। কথায় কথায় তিনি জানালেন যে, তাঁর এক বান্ধবী ছিল। পাঁচ বছর তাঁরা বেশ ঘনিষ্ঠ ছিলেন। কিন্তু সম্প্রতি তাঁদের মধ্যে আর কোন সম্পর্ক নেই। সময় কাটে না বলে ভদ্রলোক সন্ধ্যায় এমবিএ পড়া শুরু করেছেন।

রাত এগারটায় আমাদের বাস হোটেলে পৌঁছল। ব্রাজিলিয়াতে আমাদের শেষ রাত। আগামীকাল সাও পাওলো হয়ে আমি প্যারিস চলে যাব। সেখান থেকে আবু ধাবী হয়ে বাংলাদেশ।

আজ বিকেলেই আমি ব্রাজিলিয়া ছেড়ে চলে যাবো। আমাকে ব্রাজিলিয়া বিমান বন্দর থেকে বিকেল পাঁচটার বিমান ধরতে হবে। সকালে আমি নাস্তা করতে খাবার ঘরে গেলাম। দেখলাম আমার পূর্ব পরিচিত রুশ ভদ্রলোককে। তিনি ১১টার বিমানে চলে যাবেন। তাঁর সঙ্গে একদিন আমি দীর্ঘ সময় নিয়ে রুশ সাহিত্য, বলশেভিক বিপ্লব এবং আরও অনেক বিষয় নিয়ে আলাপ করেছিলাম। রুশ লেখক পুশকিন, সেরমন্তফ, গোগল, টলস্টয়, ডষ্টয়েভস্কি, তুর্গেনভ, চেখভ, গোর্কি, আলেক্সেই টলস্টয়, মিখাইল শলোকভ এবং শের্গেই ইয়েসনিন নিয়ে আলাপ করেছিলাম। বাংলাদেশের একজন আমলার মুখে এইসব রুশ লেখকের নাম শুনে তিনি বোধহয় একটু অবাকই হয়েছিলেন। আমি তাঁকে বলেছিলাম যে, আমি কখনই রাশিয়ায় যাইনি। তবে ইয়ালটায় চেখভের বাড়ি এবং ইয়াসনায়া পলিয়ানায় টলস্টয়ের বাড়ি দেখার বাসনা আমার আছে। আমি তাঁকে বলেছিলাম, সমসাময়িক টলস্টয় এবং ডস্টয়েভস্কি একে অপরের সঙ্গে কখনই দেখা করেননি। তিনি আশা প্রকাশ করেছিলেন আমি হয়তোবা ভবিষ্যতে রাশিয়া ভ্রমণ করার সুযোগ পেতে পারি।

আমি হোটেলের বিল মিটিয়ে দিয়ে আমার রুমে চলে আসলাম। গোছগাছ করে আমি দুপুর একটায় হোটেলের বাসে ব্রাজিলিয়া বিমান বন্দরে চলে আসলাম। আমার কাছে শ’ পাঁচেক-এর মত ব্রাজিলিয় রিয়াল ছিল। তা আমি ডলারে ভাঙিয়ে নিলাম। তারপর আমি বিমান বন্দরে বিমানের জন্য লাউঞ্জে বসে অপেক্ষা করতে লাগলাম। আমার মত অনেকেই লাউঞ্জে বসে আছেন। কারও সঙ্গে আমার তেমন আলাপ হলো না। আমি চারদিক খেয়াল করছিলাম। আশেপাশে অনেক দোকানপাট দেখলাম। সবই মনোহারী দ্রব্যাদিতে পরিপূর্ণ। আমি একটি বইয়ের দোকানে দেখলাম এবং বইপত্র নাড়াচাড়া করলাম। অধিকাংশই পর্তুগীজ ভাষায় ছাপা। শুধুমাত্র লেখকের নাম বুঝতে পারলাম।

রাত ন’টার মধ্যে আমি সাও পাওলো বিমান বন্দরে পৌঁছে গেলাম। আমাকে ওখান থেকে প্যারিসের চার্লস দ্য গল বিমান বন্দরে যেতে হবে। বিমান ছাড়ার সময় রাত দশটা। হঠাৎ করে ঘোষণা দেয়া হলো যান্ত্রিক ত্রুটির কারণে বিমান ছাড়তে দেরি হবে। তবে তাঁরা কোন সময় উল্লেখ করলেন না। আমি প্রমাদ গুনলাম। কারণ আমার শেনজেন ভিসার মেয়াদ মাত্র একদিন আছে। অর্থাৎ আগামীকাল অর্থাৎ ১৩-০৫-২০০৭ তারিখের মধ্যে প্যারিস ছাড়তে হবে। আমি মনে মনে অস্বস্তিবোধ করছিলাম। আমার মতই অন্যান্য যাত্রীর মধ্যে উৎকক্তা ছড়িয়ে পড়ল। তবে দেখলাম কয়েকটি শিশু বেশ নির্বিকার। তারা দিব্যি হেসেখেলে ছুটোছুটি করে বেড়াচ্ছে।

রাত এগারটায় হঠাৎ করে ঘোষণা দেয়া হলো বিমান আজ রাতে প্যারিস যাচ্ছে না। আমাদের হোটেলে নিয়ে যাওয়া হবে। যাত্রীদের মধ্যে প্রথমে গুঞ্জন এবং পরে হৈ চৈ আর চিৎকার-চেঁচামেচি শুরু হলো। সবাই বিমান না ছাড়ার কারণ জানতে চান। বিমান বন্দর কর্তৃপক্ষ এবং বিমান কর্তৃপক্ষের কর্মকর্তাদের যাত্রীসাধারণ ঘিরে ধরলেন। অনেককেই মারমুখী মনে হলো। এখানে বেশিরভাগ লোকজনই পর্তুগীজ ভাষায় কথা বলেন এবং যাত্রীদের মধ্যে অধিকাংশই পর্তুগীজ বলতে পারেন না। সে এক এলাহি কাণ্ড।

রাত একটায় আমরা একটি পাঁচতারকায় পৌঁছলাম। হোটেলে রুম নেয়ার জন্য আমরা সবাই কাউন্টারের সামনে লাইন ধরে দাঁড়ালাম। আমার দেখে ভাল লাগল যে, এই মাঝরাতেও বেশ শৃঙ্খলার সাথে রুম বুকিংয়ের কাজ সারলেন। আমি আটতলায় রুম পেলাম। রাত আড়াইটায় আমরা রাতের খাবার খেলাম। হোটেল থেকে আমাদের জানানো হলো যে, আগামীকাল সকাল দশটায় প্যারিসে যাওয়ার জন্য বিমানের ব্যবস্থা করা হয়েছিল। পরে বুঝতে পারলাম এসবই ছিল মিথ্যা আশ্বাস। রাত তিনটার সময় আমি আমার রুমে পৌঁছে জানালার পর্দা সরিয়ে রাতের সাওপাত্তলোকে দেখার চেষ্টা করলাম। চতুর্দিক আলোয় আলোকময়। সব আকাশচুম্বী ভবন অথবা হোটেল। আমাদের হোটেলের সামনেই একটি জলাধার দেখলাম। উপর থেকে পানির রং কেমন যেন লাল মনে হলো।

রাত শেষ হলো আধো ঘুম আর আধো জাগরণে। সকাল সাড়ে আটটায় হোটেলের নিচতলায় খাবারের ঘরে গেলাম নাস্তা করতে। হরেক রকমের খাবার মজুদ আছে। কিন্তু আমার জন্য অধিকাংশ খাবারই উপযোগী নয়। খেতে খেতে গুনলাম আমার যাত্রার সময় পরিবর্তন হয়েছে এবং সময় দুপুর ১২টা। একজন যাত্রী মন্তব্য করলেন দুপুরের খাবার হতে বঞ্চিত করার জন্য এই সময় নির্ধারণ করা হয়েছে। আমি আমার ভিসার মেয়াদের কথাই ভাবছিলাম। আজ ১৩ মে রাত বারোটা পর্যন্ত আমার ভিসার মেয়াদ আছে। আমার কপালে যে কি লেখা আছে তা ভাবতে ভাবতে আমার রুমে আসলাম।

রুমে সাও পাওলোর উপর একটি সুন্দর বড় বাঁধাই করা বই দেখে তা দেখতে শুরু করলাম। বইটি পর্তুগীজ এবং ইংরেজি ভাষায় লেখা। সাও পাওলোর গত পাঁচশত বছরের ইতিহাস তুলে ধরা হয়েছে। বইতে অনেক ছবি আছে। আমি তাই মনোযোগ দিয়ে দেখতে শুরু করলাম। আর দেশের কথা ভাবছিলাম। কাঁকন, ধ্রুব আর অভ্রর কথা ভাবছিলাম। ছবিগুলোর মধ্যে দেখলাম সাও- পওলোর মেয়রের ছবিই বেশি। তারপর দেখলাম যে সাও পাওলোর মেয়রের কার্যালয় থেকে বইটি ছাপানো হয়েছে। আমার চট করে ইংরেজি প্রবাদ বাক্যটির কথা মনে পড়ে গেলঃ ঐব যিড় ঢ়ধুং ঃযব ঢ়রঢ়বৎ পধষংং ঃযব ঃঁহব.

দুপুরের খাবার না খেয়ে আমরা আবার সাও পাওলোর বিমান বন্দরের দিকে যাত্রা শুরু করলাম। বিমান বন্দরে আমি এবার সত্যিকার ঝামেলায় পড়লাম। আগেই লিখেছি যে আমার ভিসার মেয়াদ ছিল ১৩ মে পর্যন্ত। বিমানে উঠার আগে আমার পাসপোর্ট পরীক্ষা করে কর্তব্যরত কর্মকর্তা আমাকে বললেন, মহোদয়, আপনার ভিসা আছে আজ পর্যন্ত। আপনি আগামীকাল শার্ল দ্য গ্যল বিমান বন্দরে পৌঁছেন। ততক্ষণে আপনার ভিসার মেয়াদ শেষ হয়ে যাবে। আপনি কি করে যাবেন? আমি অত্যন্ত দৃঢ়তার সঙ্গে বললাম, ‘আমি তার জন্য মোটেই দায়ী নই। এরজন্য দায়ী আপনাদের ব্রাজিলীয় বিমান সংস্থা এবং আমাদের দেশের জর্মন দূতাবাস। আমাকে অবশ্যই যেতে দিতে হবে। তারপরেও আমাকে এক ঘন্টা বসিয়ে রাখা হলো। কর্মকর্তা প্যারিস বিমান বন্দর কর্তৃপক্ষের সঙ্গে টেলিফোনে কথা বলে আমাকে বিমানে উঠার অনুমতি দিলেন। আমি হাঁফ ছেড়ে বাঁচলাম।

আমাদের বিমান সন্ধ্যা ছ’টায় ছেড়ে দিল। ১১ ঘন্টার বিমান যাত্রা। আমি পরদিন অর্থাৎ ১৪ মে স্থানীয় সময় সকাল আটটায় প্যারিসের শার্ল দ্য প্যল বিমান বন্দরে অবতরণ করলাম। আমি এবার ইতিহাদ বিমান সংস্থার কর্মকর্তার সঙ্গে যোগাযোগ করে জানতে পারলাম নতুন সময়সূচি অনুযায়ী আমার বিমান ছাড়বে রাত দশটায়। তার মানে হলো আমাকে প্রায় ১৪ ঘন্টা বিমান বন্দরে বসে থাকতে হবে। বাইরে যাওয়ার কোন উপায় নেই।

বিমান বন্দরে এক মহিলা কর্মকর্তার সঙ্গে আমার পরিচয় হলো। তাঁর নাম সাব্রিনা। ফরাসী ভাষায় আমি তাঁর সঙ্গে আলাপ জুড়ে দিলাম। তিনি পাপুয়া নিউগিনি থেকে এসে ফ্রান্সে বসবাস শুরু করেছেন। তার স্বামীও এই বিমান বন্দরে কাজ করেন। তাদের দু’টি কন্যা রয়েছে। তারা ফরাসী স্কুলে পড়াশুনা করে। মহিলা আমাকে তার প্যারিস আগমনের সময় জীবনের বিস্তৃত কাহিনী বললেন। একজন নতুন আগন্তুক হিসেবে প্রাথমিকভাবে তিনি কী কী সমস্যার সম্মুখীন হয়েছিলেন তা আমাকে বললেন। সর্বত্রই নতুন অভিবাসীদের এই কাহিনী।

দুপুরে বিমান কর্তৃপক্ষ আমাকে ২০ ইউরোর একটি কুপন দিল। আমি তা দিয়ে দুপুরের খাবার সারলাম। শার্ল দ্য প্যল বিমান বন্দরটি ঘুরে ঘুরে দেখলাম। বিরাট বিমান বন্দর। সারা দুনিয়া থেকে যাত্রীরা এখানে আসছেন। জাপানী এবং চৈনিক পর্যটকের সংখ্যাই আমার কাছে বেশি মনে হলো।

প্যারিস থেকে আবুধাবীতে একরাত অবস্থান করে ঢাকায় পৌঁছলাম। কাঁকন, ধ্রুব এবং অভ্র ঢাকা বিমান বন্দরে আমার জন্য অপেক্ষা করছিল।তারিখটা ছিল ১৫ মে, ২০০৭ সাল।

http://www.DeshiBoi.com

জুলাই 8, 2009 - Posted by deshiboi | অলৌকিক গল্প | , , , , , , , , , , , , , , , , , , , , , , , , , , | No Comments Yet

কোন মন্তব্য নেই এখনও

মন্তব্য দিন